শনিবার, ২৮ নভেম্বার ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

নিজস্ব প্রতিবেদক

Nov. 21, 2020, 11:20 p.m.

বাংলাদেশের দৌড় কত দূর?
বাংলাদেশের দৌড় কত দূর?
বরিশাল মুক্তিযোদ্ধা পার্ক। - ছবি: ভোরের আলো।

কানাডার মতো দেশ সিরিঞ্জ কেনা শুরু করেছে। কোনো দেশ আবার ভ্যাকসিন এনে বিতরণ পর্যন্ত সংরক্ষণের জন্য ল্যাব তৈরি করছে। কেউ মাঠ পর্যায়ে টিকা প্রয়োগের কর্মী বাছাই করে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা গত কয়েক মাসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে করোনার ভ্যাকসিন সংক্রান্ত কিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানালেও এমন দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব কম।

নভেল করোনাভাইরাসের টিকা পেতে বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অগ্রগতি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান সেরামের সঙ্গে চুক্তি। এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মাত্র তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিনের চুক্তি হয়েছে। সেরাম ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ভ্যাকসিনের ফর্মুলা ব্যবহার করবে। এই ভ্যাকসিনসহ আরও অন্তত দুটি ভ্যাকসিন তৃতীয় ধাপের মাঝামাঝি পর্যায়ের ট্রায়ালে ‘অত্যন্ত কার্যকর’ বলে প্রমাণিত হয়েছে।

সেরামের সিইও আদর পুনাওয়ালা ভারতীয় গণমাধ্যম ডেকান হেরাল্ডকে দুই সপ্তাহ আগে বলেন, ব্রিটেনের তৈরি ভ্যাকসিন তারা প্রস্তুতের পর প্রথম ধাপে নিজেরাই ব্যবহার করবে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে কোম্পানিটি যে ভ্যাকসিন দেবে তা সামনের বছর ‘ফিফটি-ফিফটি’ শর্তে পাঠানো হবে।

কিন্তু পুনাওয়ালা গত শুক্রবার যা বলেছেন, তাতে বোঝা গেছে ফেব্রুয়ারি-মার্চেও ভারত টিকা দেয়া শুরু করতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘অক্সফোর্ডের করোনা ভ্যাকসিন আগামী ফেব্রুয়ারিতে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বসাধারণের জন্য এই ভ্যাকসিন এপ্রিলে দেয়া হতে পারে।’

ভারত এপ্রিলে দিতে পারলে বাংলাদেশের দেয়া শুরু করতে আরও দেরি হবে। কারণ প্রথম লটের ভ্যাকসিন তারা নিজেরাই নেবে। তারপর অন্য দেশগুলোকে দেবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত নভেম্বরের শুরুতে চুক্তির কথা জানানোর সময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির দিকে আমরা পেতে পারি।’
সেরাম গত দুই মাসে ৪ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। তৈরির প্রক্রিয়ায় এখন আরও গতি বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রতি ডোজ টিকার দাম পড়বে ৫ ডলার (৪২৫ টাকা)।

প্রত্যেকের দুই ডোজ করে টিকা লাগবে। সে হিসাবে বাংলাদেশ তিন কোটি ডোজ টিকা আনলে দেড় কোটি মানুষকে তা দেওয়া যাবে। একটি ডোজের ২৮ দিন পর আরেকটি ডোজ দিতে হবে।

যারা ব্যক্তিগতভাবে সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে বেক্সিমকোর মাধ্যমে টিকা নেবেন, সেই দাম আলাদা হবে।

পুনাওয়ালা জানিয়েছেন, গোটা পৃথিবীতে নভেল করোনাভাইরাসের টিকা পৌঁছে দিতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। সংক্রমণ কমতে লাগবে আরও দুই বছর।
বাংলাদেশ কি শুরুতে আসলেই ভ্যাকসিন পাবে: চীন, ভারতের মতো দেশ ইতিমধ্যে জানিয়েছে, শুরুতে যেসব দেশকে ভ্যাকসিন দেয়া হবে, সেই তালিকায় বাংলাদেশ থাকবে। এখন পর্যন্ত যত অগ্রগতির কথা শোনা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে এপ্রিল-মে মাসে বাংলাদেশ কিছু ভ্যাকসিন পেতে পারে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য হবে। বেশি ভ্যাকসিন কিনতে দরকার বেশি টাকা।
ভয়েস অব আমেরিকার একটি প্রতিবেদনে শুক্রবার বলা হয়েছে, অর্থের ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ এখন বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর দিকে তাকিয়ে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ‘করোনা ভাইরাসের টিকা কিনতে বাংলাদেশ দাতা সংস্থাগুলোর কাছে ঋণ সহযোগিতা চেয়ে ইতিমধ্যে চিঠি পাঠিয়েছে। ১৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষের জন্য ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রয়োজন। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কোথা থেকে এত টাকার টিকা কিনবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।’

যেসব দেশের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সক্ষমতা নেই অথবা ক্রয় ক্ষমতাও যাদের সীমিত তাদের ক্ষেত্রে যাতে বৈষম্য তৈরি না হয়, ভ্যাকসিন শুধু অর্থ ক্ষমতার বিষয় হয়ে না দাঁড়ায় - সেজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৯০টি দেশের একটি তালিকা তৈরি করেছে।

যারা বিনা মূল্যে ভ্যাকসিন পাবে-বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও দেখা গেছে।

এ ক্ষেত্রে কোন দেশের মাথাপিছু আয় কত সেটি বিবেচনা করা হয়েছে এবং এই ভ্যাকসিন দেয়া হবে একটি দেশের চাহিদা অনুযায়ী।

ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও রোডম্যাপ: ভ্যাকসিন শুধু আনলেই হয় না, এটি সংরক্ষণের জন্য দরকার বিশেষ ল্যাব। দরকার নিখুঁত রোডম্যাপ।

বাংলাদেশের এ সংক্রান্ত কিছু অগ্রগতির কথা দেশ রূপান্তর জানতে পেরেছে। দেশে করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচির রোডম্যাপ তৈরি করবে ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম এবং হেরিয়ট-ওয়াট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। এই কাজে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গবেষকদের সহায়তা করবে বুয়েট এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।

বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, যাদের প্রয়োজন তারা যেন কভিড-১৯ ভ্যাকসিন পান সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে কাজ করবেন বিজ্ঞানীরা।

ব্রিটেনের দুই বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করবে ইউকে রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন (ইউকেআই)-এর সহযোগিতায়। বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের কোল্ড-চেইন ফ্রেমওয়ার্কের সক্ষমতা এবং প্রস্তুতি মূল্যায়ন করে কভিড-১৯ টিকাদানের একটি রোডম্যাপ এবং মডেল তৈরি করবেন।

বাংলাদেশে এমনিতে প্রতি বছর প্রচুর মানুষকে অন্য রোগের টিকা দেয়া হয়। এ কাজে সরকারকে সহায়তা করে থাকে সুইজারল্যান্ডের ‘গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স’ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কিন্তু করোনার মতো নতুন রোগ প্রতিরোধে যখন বড় কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, তখন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বর্তমানের কোল্ড-চেইন বা নির্দিষ্ট নিম্ন-তাপমাত্রা পরিসীমার সক্ষমতা মূল্যায়ন করবে বুয়েট। পাশাপাশি তারা একটি ডিজাইন এবং পদ্ধতি ঠিক করবে।

বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির কোল্ড ইকোনমির প্রফেসর এবং প্রজেক্ট ডেভেলপার টবি পিটারস বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তাদের মানুষদের সুরক্ষা দিতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এবং সঠিক ঠিকাদান কর্মসূচিই পারে এর সমাধান করতে।’

‘টেকসই কোল্ড-চেইন উন্নয়ন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহযোগিতা করবে। বিদ্যমান টিকাদান এবং কোল্ড-চেইন প্রোগ্রামের পাশাপাশি কভিড-১৯ ভ্যাকসিন সরবরাহে সাহায্য করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এই কাজ বিশ্বব্যাপী টিকা সরবরাহ করতে, নকশা এবং মডেল তৈরিতে সাহায্য করবে।’

এই প্রজেক্টের কো-ইনভেস্টিগেটর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ফারজানা মুন্সি। তিনি বলেছেন, ‘পলিসি মেকারদের নীতিমালা ঠিক রকতে এই প্রজেক্ট সহায়তা করবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক এবং জাতীয়ভাবে কভিড-১৯ রোগের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মহামারী প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।’

এই মহামারীতে দেশের জন্য কাজ করতে পেরে দারুণ উচ্ছ্বসিত বুয়েটের প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. ইজাজ হোসেন, ‘বুয়েট বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা এই প্রজেক্টে সহায়তা করতে পেরে গর্বিত। ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি)-এর মাধ্যমে বুয়েট সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে উন্নতমানের প্রযুক্তিগত এবং প্রকৌশল সহায়তা করে থাকে।’

এই প্রজেক্টের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন বিজ্ঞানীরা তা অন্য দেশের সঙ্গেও শেয়ার করা হবে, যাতে দেশগুলো স্বাস্থ্য খাতের জন্য সর্বোচ্চ মানের টেকসই তাপমাত্রা-নিয়ন্ত্রিত সাপ্লাই-চেইন তৈরি করতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।