রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

Dec. 6, 2020, 11:10 p.m.

অনন্য উদাহরণ ওবায়দুল কাদের
অনন্য উদাহরণ ওবায়দুল কাদের
খবর প্রতীকী। - ছবি: ভোরের আলো।

অনেকে বলেন ১/১১-এর ভুত। কেউ কেউ বলেন মঈনুদ্দিন-ফকরুদ্দিনের ভুত। আবার কেউ বলেন মাইনাস-২ ফর্মুলা। তবে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিল তত্তাবধায়ক সরকার। যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন ১/১১-এর সরকার রাজনীতির মাঠে এক ধরণের বুলডোজার চালিয়েছিল। সেই বুলডোজারের নীচে চাপা পরে অনেকের প্রাণ গেছে। যারা বেঁচে এখনো রাজনীতির মাঠে আছেন তারা জানেন কতটা দু:সময় অতিক্রম করতে হয়েছে। যদিও বেশিরভাগ নেতারা তা ভুলে গেছেন। তবে কেউ কেউ যে অন্তকরণ দিয়ে মনে রাখছেন তারও প্রমাণ আছে।

১/১১-এর সরকারের সবকিছু খারাপ ছিল তা বলা সঠিক হবে না। আবার সবকিছু একদম ভালো ছিল সেটাও বলা যাবে না। প্রথমদিকের কর্মকা- মানুষের মাঝে আস্থা জাগাতে পারলেও শেষ পর্যন্ত লোভের ঢেকুরে তারাও আস্থাহীনতার মধ্যে পরে। সেখান থেকে আর প্রগতির পথে হাঁটা সহজ হয়নি। তাঁদের অদূরদর্শী চিন্তা আমাদের পুরানো পথে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক পন্থার নতুন নতুন মোড়কে আমরা মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পালনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছে গেছি। টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকার নিয়ে উন্নত দেশের কাতারে অবস্থান করছি। তবে ১/১১-এর ইতিবাচক দিকগুলো মস্তিষ্কে নিয়ে সামনে চলতে পারলে আমরা আরো দ্রুত এগিয়ে চলতে পারতাম। তারপরও ১/১১ অনেক রাজনীতিকে পরিবর্তনের ছোঁয়া দিয়েছে। কিছুটা হলেও তারা সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে হাঁটছেন। তাদের প্রতি আমাদের একান্ত শ্রদ্ধা।

১/১১ দু:সময় হলেও সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলছেন প্রবীণ অনেক রাজনীতিক। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন আমাদের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। রাজনীতির মাঠে কথা ও কাজে কিছুটা হলেও আস্থার জায়গা অর্জন করেছেন তিনি। তিনি তাঁর বক্তব্যে সব সময় নেতা-কর্মীদের মাঝে পেছনের দু:সময়ের কথা বলে সতর্ক করে দেবার চেষ্টা করেন। নিজেও সতর্কতার সঙ্গে একটি সুন্দর রাজনীতির পথ নিনির্মাণে কাজ করে চলেছেন। তিনি দলের মধ্যে দল না করার কথা বলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দুর্নীতির উর্ধ্বে থেকে কাজ করার আহ্বান জানান পতিনিয়ত। দলের মধ্যে স্বজনপ্রীতি এবং হাব্রিডদের স্থান না দেওয়া কথা বলেন। বলেন তৃণমূলে নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করার কথা। আওয়ামী লীগের এই বর্ষিয়ান নেতা এবার আরও এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাঁকে দেওয়া সরকারি দুটি গাড়ি ফেরত দিয়েছেন। এর আগেও একটি সরকারি গাড়ি ফেরত দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মন্ত্রীর অনুকূলে পরিবহণ পুল থেকে বরাদ্দ করা গাড়ি এবং পদ্মাসেতু প্রকল্প থেকে দেওয়া দুটি সরকারি গাড়ি ফেরত দেন। দুটি গাড়ি পরিবহন পুলে ফেরত দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, মন্ত্রী হিসেবে ওবায়দুল কাদের পরিবহন পুল থেকে যে গাড়িটি পেয়েছেন সেটি তিনি ব্যবহার করেননি। অন্যদিকে পদ্মাসেতু প্রকল্পের অনুকূলে যে গাড়িটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেটা তিনি ব্যবহার করেছেন। করোনার আগে তিনি সপ্তাহে দুইদিন ওই গাড়িতে পদ্মাসেতু প্রকল্প পরিদর্শনে যেতেন। বর্তমানে বদ্মসেতুর ৯২ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে এবং করোনার কারণে প্রকল্প এলাকায় যেতে পারছেন না, তাই তিনি ওই গাড়িটিও ফেরত দিয়েছেন। এর আগে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে পাওয়া বিএমডব্লিউ গাড়িটিও ফেরত দেন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা আমাদের কাছে কেবল দৃষ্টান্তই নয়, এটা একটা মাইলফলক। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা দ্রুতই আমদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবো। নিশ্চয়ই এই উদাহরণ আমাদের অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। আমাদের জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী-আমলারাও এই পথে হাঁটবেন।

বর্তমান সংসদে সাড়ে ৩০০ প্রতিনিধি আইন প্রণয়নসহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষে কাজ করছেন। এদের প্রত্যেকের জন্য সরকারি এক বা একাধিক গাড়ি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। আছে আবাসনসহ নানা সুবিধা। কিছু সুবিধা না থাকলে তারা কাজ করবেন কিভাবে। তাই গাড়ি-বাড়ির প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকা বাঞ্ছনীয়। যে সুবিধা রাষ্ট্র দিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা আদায় করে নেওয়া হচ্ছে রাস্ট্রের বিভিন্ন দপ্তর থেকে। অনেকটা সরকারের জানার বাইরে থাকছে। তবে তদারকী থাকলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনেকাংেেশ নিশ্চিত হতে পারতো। 

একজন মন্ত্রী, সাংসদ গাড়ি বাড়ির সুবিধা পাবেন এটা কোন দোষের নয়। দোষের হচ্ছে এই সুযোগ যখন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এমনকি দূরের আত্মীয়দের দেওয়া হয় তখন। যেমন, জাতীয় সংসদের যতগুলো স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এবং সদস্য রয়েছেন তারা প্রত্যেকে ওইসব প্রতিষ্ঠানের গাড়ি, বাংলো নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরা ভয়ে কিংবা তোষামোদীর কারণে কিছু বলতে পারছে না। কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার কারণেও বলছেন না। এই না বলতে পারার সমস্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের। দপ্তরগুলোর নাম আর উল্লেখ করলাম না। অনেক দপ্তরের গাড়ি এসব মন্ত্রী, সাংসদ, স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান, সদস্যদের কাছের এবং দূরের স্বজনদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন ওইসব দপ্তর। এমন বাস্তবতায় ওবায়দুল কাদেরের সরকারি গাড়ি ফেরত দেওয়ার ঘটনা আমাদের মনে আশার সঞ্চর হয়েছে।

আমরা চাই, রাষ্ট্র এবং নাগরিকের প্রয়োজনে মন্ত্রী, সাংস, আমলাদের যেটুকু সুবিধা দেওয়া দরকার সেটুকু নিশ্চিত হোক। তবে সুযোগ দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকার একাধিক গাড়ি এবং বাড়ি না দেওয়া। মন্ত্রী, সাংসদ ছাড়াও সরকারি অনেক কর্মকর্তাদের একাধিক গাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, যা আমাদের দেশের জন্য অতিরিক্ত বিলাসিতা বলে মনে হয়। এখান থেকে উত্তোরণ ঘটাতে পারলে আমাদের জাতীয় উন্নয়নে ইতিবাচক সাড়া পরবে।

দেশের সাড়ে ৪০০ উপজেলা, ৬৪ জেলা, বিভাগ এবং মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য কত শত দামি গাড়ি ক্রয় করা হচ্ছে। জেলা শহরে অনেক সরকারি কর্মকর্তার জন্য কোটি টাকার একাধিক গাড়ি রয়েছে। যেখানে একটি গাড়ি হলেই তিনি সমস্ত কাজ সুন্দরভাবে করতে পারেন। এখানে সরকারি কর্মকর্তার কিছু বলার থাকে না। রাষ্ট্র যেহেতু এই ব্যবস্থা করে দিয়েছে, তাই তারা সেই সুবিধা ভোগ করেন। তবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মতো এরকম চিন্তা যদি সব মন্ত্রী, সাংসদ এবং আমলারা করেন তাহলে রাষ্ট্রের ব্যয় কমতে বাধ্য। এই ব্যয় দিয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব। ওবায়দুল কাদেরের ইতিবাচক উদাহারণ সবাই অনুসরণ করুক, সেই প্রত্যাশা করছি।