বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮

সাইফুর রহমান মিরণ

Dec. 7, 2020, 11:35 p.m.

৮ ডিসেম্বর ১৯৭১, জয় বাংলা শ্লোগানে মুখরিত ছিল বরিশাল
৮ ডিসেম্বর ১৯৭১, জয় বাংলা শ্লোগানে মুখরিত ছিল বরিশাল
খবর প্রতীকী। - ছবি: ভোরের আলো।

আজ ৮ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে বরিশাল হানাদার মুক্ত হয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয়ের দিন। তার ৮ দিন আগে বরিশাল মুক্ত হয়েছিল। সেদিন বরিশালের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল হাজার হাজার মানুষের ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকেই বরিশালের মানুষ মুক্তি সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর অমিত কণ্ঠের ঘোষণায় ‘এবারের সংগ্রাম আমদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উজ্জীবীত হয় বরিশাল। কিন্তু বর্বর পাকিস্তানী বাহিনী মুক্তি সংগ্রামের আভাস পেয়ই ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট-এর মাধ্যমে গণহত্যা শুরু করে। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার তারবার্তা বরিশাল পুলিশ লাইনের ওয়ারলেসযোগে তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম মঞ্জুরের কাছে পৌঁছায়। এরপর বরিশালের মুক্তিযোদ্ধারা নূরুল ইসলাম মঞ্জুর এবং মেজর এম. এ. জলিলের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বরিশালে গড়ে তোলা হয় স্বাধীন বাংলা সরকারের সচিবালয়। বর্তমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ওই সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা বাংলাদেশে প্রথম সচিবালয়ের স্বীকৃতি পায়। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করা হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অন্তর্ভুক্তি ও ভারতের প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরণের ব্যবস্থা করা হতো এ সচিবালয় থেকে। পরবর্তী সময় মেহেরপুরের আ¤্রকাননে স্থানান্তর হয়।

বরিশালের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে বৃহত্তর বরিশালে বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে সংগঠিত হতে থাকে। মেজর এম. এ জলিলের নির্দেশে ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমরের নেতৃত্বে ৬ সেপ্টেম্বর উজিরপুরের বরাকোঠা দরগাহবাড়ী প্রাইমারি স্কুলে গড়ে তোলেন বরিশাল সাব সেক্টর হেড কোয়ার্টার। মূল সচিবালয় বরিশাল সদর এবং সাব সেক্টর বরাকোঠার নিয়ন্ত্রণে বরিশালের মুক্তিযোদ্ধারা নভেম্বর মাস থেকে বিভিন্ন থানা আক্রমণ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

৭ ডিসেম্বর গভীর রাতে হঠাৎ করে বরিশালে কারফিউ ঘোষণায় মানুষ অতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারফিউ থাকলেও রাস্তায় পাক সেনা টহল না থাকায় জনমনে আশার সঞ্চার হয়। ধারণা করা হয় বিভিন্ন থানাসহ ব্যাপক এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসছে। এটা সম্ভবত হানাদার বাহিনী বুঝতে পেরেছেল। সড়ক পথে পালানো যাবে না ভেবে তারা জলপথে জাহাজ ইরানী ও কিউসহ একাধিক গানবোট, লঞ্চ ও কার্গো নিয়ে রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে বরিশাল ত্যাগ করে। ব্যাপক গোলা বারুদ থাকা সত্যেও সেদিন তারা গোপনে বরিশাল ত্যাগ করার চেষ্টা চালায়। তবে শেষ পর্যন্ত তারা রক্ষা পায়নি। ভারতীয় বিমান বাহিনী চাঁদপুরের মোহনায় তাদের জাহাজসহ নদীবক্ষে নিমজ্জিত করে দেয়।

এদিকে বরিশাল শহরে কারফিউ থাকা সত্বেও সেনা টহল নেই কেন এ প্রশ্ন ভাসতে থাকে শহরময়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎসুক নগরবাসী রাস্তায় বেরিয়ে আসতে শুরু করে। আস্তে আস্তে দীর্ঘ ৯ মাসের স্তব্ধতা কাটতে থাকে। ১০টার দিকে মিত্র বাহিনীর কয়েকটি বিমান দেখে মানুষ উৎফুল্ল হয়ে পরে। সবাই রাস্তায় বেরিয়ে এসে ‘জয় বাংলা’ বলে শ্লোগান দেওয়া শুরু করে। ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বরিশালের নবগ্রামে একদল মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নেয়। একইভাবে নগরীর চতুর্দিকে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিতে থাকে।

৮ ডিসেম্বর নবগ্রাম রোডের মুক্তিযোদ্ধারা সুলতান মাস্টারের নেতৃত্বে বরিশাল নগরে প্রবেশ করে কোতয়ালী শহর দখল করে। এখানে পাক পুলিশ বাহিনী তাদের কাছে আত্মসমর্পন করে। এরপর নগরীতে প্রবেশ করে লাকুটিয়ায় অবস্থনরত সুইসাইডাল স্কোয়াডের সদস্যরা। রেজাই সত্তার ফারুকের নেতৃত্বে তারা নগরীর পাওয়ার হাউজ এলাকা দখল করে এবং এখানকার রাজাকার ও পাকসেনাদের আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করেন। গৌরনদীর বেইজ কমান্ডার নিজামউদ্দিন হাওলাদার তার বাহিনী নিয়ে বরিশালের পেশকার বড়িতে অবস্থান নিয়ে স্থাপন করেন অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম। বাবুগঞ্জের বেইজ কমান্ডার আব্দুল মজিদ দুপুরের পর বরিশাল টেক্সটাইল মিলে ক্যাম্প গঠন করেন। কুদ্দুস মোল্লা তার দল নিয়ে বরিশাল জেলখানার দায়িত্বভার নিয়ে নেন। সাব সেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমর আহত অবস্থায় বাকেরগঞ্জে থাকায় তিনি ৯ ডিসেম্বর বরিশাল প্রবেশ করেন।

এদিকে মহাউল্লাসে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় সমগ্র বরিশাল। চারিদিকে শ্লোগান জয় বাংলা, আজ বরিশাল মুক্ত দিবস, হানাদার মুক্ত বরিশাল। এভাবেই নয় মাসের অবরুদ্ধ বরিশাল মুক্ত হয় ৮ ডিসেম্বর। বিজয়ের গৌরবের মিছিলে একাত্ম হয় বরিশাল।

অন্যদিকে যে সব রাজাকার আলবদর পালিয়ে যেতে পারেনি  তারা আশ্রয় নেয় পাক সেনাদের ক্যান্টনম্যান্ট হিসেবে পরিচিত ওয়াপদায়। পাকসেনারা বাংকারে ঢুকে অস্ত্র তাক করে ঘোষণা দেয় নূরুল ইসলাম মঞ্জুর ছাড়া তারা আর কারো কাছে আত্মসমর্পন করবে না। পরবর্তীতে ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নূরুল ইসলাম মঞ্জুর ৩ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বরিশাল আসেন এবং ১৮ ডিসেম্বর শিকারপুর ফেরীঘাটে দেড়শ পাকসেনা ও রাজাকার আত্মসমর্পন করে।