বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮

সাইফুর রহমান মিরণ

Dec. 13, 2020, 11:21 p.m.

বুদ্ধিজীবী দিবসে ওয়াপদার পুরো এলাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক
বুদ্ধিজীবী দিবসে ওয়াপদার পুরো এলাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক
ওয়াপদা কলোনী। - ছবি: ভোরের আলো।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। বাঙালির অর্জনের মাস ডিসেম্বর। ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখ পাকিস্তানী বাহিনী মত্রিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে। পরাধীন বাংলায় নতুন সূর্যের দেখা মেলে। পাকিস্তানীরা তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাঙালির বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে দেশের খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে বিভিন্ন বধ্যভূমি ও পাকিস্তানী ক্যাম্পে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। যাতে বাঙালি স্বাধীন হলেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে সেজন্যই বুদ্ধিজীবী নিধনে নামে পাক বাহিনী। পাকিস্তানীদের নির্মম নির্যাতনের এরকম একটি স্থান বরিশালের পানি উন্নয়ন বোর্ড (ওয়াপদা)। এখানে এনে বুদ্ধীবীবী মুক্তিযোদ্ধা, নারী-পুরুষ নির্বিচারে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হতো। বুদ্ধিজীবী দিবসে দেশের সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীসহ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্যসহ সকলের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

বরিশালের বধ্যভূমি খ্যাত ওয়াপদা কলোনী নানা দিক দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করে চলেছে। তাই পাকিস্তানীদের নির্মমতারা সাক্ষী বরিশালের টর্চার সেল ও বাঙ্কার সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা সাধারণের জন্য উন্মুক্তও করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষ চায়, বরিশালের ওয়াপদাসহ আশপারেশর পুরো এলাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক।

১৬ ডিসেম্বরের ৮দিন আগে বরিশার মুক্ত হয়েছিল। তাই ৮ ডিসেম্বর বরিশার মুক্ত দিবস হিসেবে পাল হয়ে আসছে। বরিশাল মুক্ত হলেও পাকিদের নির্মমতার সাক্ষী এখনো রয়ে গেছে। পাকিস্তানীদের নির্মম নির্যাতন সহ্য করে এখনো কেউ কেউ বেঁচে আছেন। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস বরিশালে পাক বাহিনীর টর্চার সেল হিসেবে স্বীকৃত ছিল ওয়াপদা কলোনী। ওয়াপদার কয়েকটি ভবনে মুক্তিযোদ্ধাদের এনে নির্মর্ম নির্যাতন করা হতো। পাশেই নারীদের ওপর চলত পাশবিক নির্যাতন। সেই নির্মম নির্যাতনের স্মৃতি স্থান বরিশালের পানি উন্নয়ন বোর্ড (ওয়াপদা)। সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি মনে করে আজে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শিউরে ওঠেন।

গত ৮ ডিসেম্বর বরিশার মুক্ত দিবসে বরিশালের এই পাক বাহিনীর ব্যবহৃত বাঙ্কার ও টর্চার সেল সংরক্ষণ করে সাধারণের জন্য উন্মেুক্ত করেছে বরিশার সিটি করপোরেশন। 

বরিশালের টর্চার সেলে নির্বচারে নারী-পুরুষদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, নীরিহ মানুষদের হত্যা করা হয়েছে, তার সাক্ষী বরিশালের ওয়াপদার বাঙ্কার ও টর্চার সেল। পাক বাহিনীর ব্যবহৃত বাঙ্কার ও টর্চার সেল সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে নতুন প্রজ¥ পাকিস্তানীদের নির্মমতা সম্পর্কে জানতে পারবে। বাঙ্কার ও টর্চার সেল সংরক্ষণের সঙ্গে পুরো এলাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মারক এলাকা হিসেবে গড়ে তুললে এর ব্যাপকতা বাড়বে। এখনো কয়েকটি বাংকার সংস্কার কাজের বাইরে রয়ে গেছে। প্রথম ধাপের কাজের মধ্যে না থাকায় আরও কিছু উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার আশ্বাস শোনা গেছে। দ্রুত সেই কাজগুলো হলে এই এলাকাটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আদলে গড়ে উঠবে। 

বরিশালের মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালে বরিশাল মহানগরের পানি উন্নয়ন বোর্ড (ওয়াপদা) এলাকা এবং পাশের ৩০ গোডাউন এলাকা পাক বাহিনী দখল করে নেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা তাদের হেডকোয়ার্টার হিসেবে এটিকে ব্যবহার করতো। বরিশালের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা এবং নারীদের এখানে আটকে রাখা হতো। ওয়াপদার কয়েকটি ভবনে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে নির্যাতন চালাত। নারীদের এনে ধর্ষণ করে হত্যা করত। পরে লাশ পাশের খাল ও কীর্তনখোলা নদীতে ফেলে দিত। এ ছাড়া কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে বটগাছের সঙ্গেও ঝুলিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতন করে হত্যা করা হোত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই এলাকাটিকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণের দাবি ওঠে। সেটিকে পরে বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। কিন্তু দীর্ঘদিনেও তা সংরক্ষণ হয়নি। বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশনম মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর টর্চার সেল ও বাঙ্কার সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।

বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের পক্ষ থেকেই প্রথম ওয়াপদা এবং ৩০ গোডাউন এলাকাকে হিসেবে সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি তোলা হয়। এর প্রেক্ষিতে ২০১০ সালে সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণ একটি প্রকল্প গ্রহণ করেন। কিন্তু ওই প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার আগে তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। পরে মেয়র আহসান হাবিব কামালের সময় ওই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পাঁচ বছরেও সেই কাজ শেষ হয়নি। বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর ঠিকাদার কাজ শেষ হয়েছে বলে বিল তুলতে যায়। এরপর ধরা পরে যেনতেনভাবে কাজ করা হয়েছে। ওই এলাকার একটি ভবনও সংরক্ষণ না করে কেবল একটি পার্ক নির্মাণ করেই বিল নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। বর্তমান মেয়র সেই বিল অনুমোদন করেননি। এরপরই শুরু হয় বধ্যভূমি সংস্কার ও সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ।

২০১৮ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলীকে ২৫ মার্চ বরিশালে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তার সঙ্গে মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বরিশালের বধ্যভূমি সংরক্ষণে তাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং বরিশাল সিটি করপোরেশন প্রত্নতত্ত বিভাগের কর্মকর্তা এবং স্থাপতি (আর্কিটেক) এনে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেই প্রকল্পে টর্চার সেল এবং একটি বাংকার সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ৮ ডিসেম্বর ওই প্রকল্পের উদ্বোধন হয়েছে।

এখনো খালের পারে পাক বাহিনীর নির্মিত তিনটি বাংকারের দুটি সংস্কারের বাইরে রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে একটি বাংকার সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাকি দুটি বাংকার সংরক্ষণ করা হবে পরের প্রকল্পে। বাইরের রাস্তাটি কেটে খাল করা হবে। যাতে বংকারের বিষয়টি বোঝা যায়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বরিশালের নিরস্ত্র বাঙালী নারী-পুরুষদের ধরে এনে এই টর্চার সেলে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হতো। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বরিশালে বাঙালি নারী-পুরুষের উপর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের নির্মম নির্যাতন ও নৃশংসতার স্মৃতি বহন করে চলেছে বরিশাল ওয়াপদা কলোনি। স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দাবির প্রেক্ষিতে বরিশাল সিটি করপোরেশন ওয়াপদা কলোনীর প্রায় ১ একর ৩০ শতাংশ জমিতে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই টর্চার সেল ও বাঙ্কার সংস্কার করার উদ্যোগ নেয়।

ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কার হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বরিশালের সুশীল সমাজ ও মুক্তিযোদ্ধারা। তারা বলেন, টর্চার সেল ও বাঙ্কারটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে পাক বাহিনীর নিষ্ঠুরতার বিষয়টি নতুন প্রজন্মের অজানা থেকে যেত। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত এই স্থাপনা সংস্কার করায় এটি এখন আগামী প্রজন্ম দেখতে পারবে। তারা জানতে পারবে হানাদারদের নির্মম নির্যাতন-নিষ্ঠুরতার কথা। এর মাধ্যমে তাদের দেশপ্রেম আরও গভীর হবে আশা করেন। একই সঙ্গে পুরো এলাকা ওই প্রকল্পের মধ্যে এনে মুক্তিযুদ্ধে স্মারক হিসেবে পরিচিতি দেওয়ার দাবি করা হয়েছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বরিশালের বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃত পাকিস্তানীদের নির্মম নির্যাতনের স্থান বরিশালের পানি উন্নয়ন বোর্ড (ওয়াপদা) টর্চার সেল ও বাঙ্কার সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ায় সাদুবাদ জানাতেই হয়। একই সঙ্গে অবশিষ্ট বাঙ্কারসহ পুরো এলাকা সংস্কার ও সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার যে দাবি সেটা পূরণ করতে অবশ্যই উদ্যোগ নেওয়া হোবে সেই প্রত্যাশা।