সোমবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২১, ১৩ মাঘ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

Jan. 9, 2021, 11:02 p.m.

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে আগামী সুন্দর হবে
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে আগামী সুন্দর হবে
সম্পাদকীয় । - ছবি: ভোরের আলো।

সাবেক মেয়র আহসান হাবিব কামাল না কি কারাগারে মালির কাজ করছেন। কেন? সশ্রম কারাদ-ের নিয়মই এটা। দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আহসান হাবিব কামালকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের ফুল বাগান রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। সাবেক মেয়র কামাল একটি দুর্নীতি মামলায় বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে সশ্রম কারা ভোগ করছেন। ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের একটি দুর্নীতি মামলায় গত ৯ নভেম্বর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক আহসান হাবিব কামাল, সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামসহ ৫ জনকে ৭ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দেয় বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালত।

এক সময়ের বরিশাল পৌরসভার সফল কমিশনার এবং সফল চেয়ারম্যান ছিলেন আহসান হাবিব কামাল। বরিশাল সিটি করপোরেশনের উন্নীত হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়রও ছিলেন। পরে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত মেয়রও হন তিনি। মহানগর বিএনপির সভাপতি ছিলেন। কেন্দ্রীয় বিএনপির মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক কামাল। দীর্ঘ এই পথচলার শুরুর দিকে তার যেমন দাপট ছিল, তেমনি সুনামও ছিল। পরে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। তবে বড় বড় অনেক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সেগুলো রাজনৈতিক ও আর্থিক যোগাযোগে ম্যানেজ হয়েছে। কিন্তু পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন বরিশাল টি অ্যা- টির কাজের একটি অনিয়মের অভিযোগে তিনিসহ ৫জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়। জীবণের শেষ প্রান্তে এসে এমন একটি মামলায় কারাভোগ করতে হবে এমনটা স্বপ্নেও ভাবেননি সাবেক এই মেয়র। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তাই।

আজন্ম বিলাসী গাড়ি-বাড়ির মালিক কামালকে ফুল বাগানে অন্যান্য কয়েদীর মতো মালির কাজ করতে হচ্ছে। এটা শুনে কারোরই ভালো লাগার কথা নয়। আমাদেরও ভালো লাগছে না। কিন্তু সত্য সত্যই তাকে সেই কাজ করতে হচ্ছে। প্রভাব, প্রতিপত্তি আজ তাঁকে রক্ষা করতে পারছে না। তাই যৌবনের জয়গানে মুখরিত হয়ে অনিয়ম দুর্নীতি করলেও তার হিসেব এক সময় তাকে দিতেই হচ্ছে। তাই এই অবস্থা দেখে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে আগামী কখনওই দু:সময় গ্রাস করতে পারবে না। অবশ্যই আগামী সুন্দর হবে।

আমাদের দেশে বড় সমস্যা হচ্ছে, আমরা দায়িত্বকে সব সময় ক্ষমতা হিসেবে ব্যবহার করি। আর এই ক্ষমতার দম্ভে অনেকটা অন্ধ হয়ে চারপাশের মানুষদের ওপর ক্ষমতা দেখাতে শুরু করি। প্রভাব আর প্রতিপত্তি দিয়ে যা নয়, তাই করে চরি। যার ফল হয়, মর্যাদার আসনে বসা ব্যক্তিকে সাধারণ মানুষ সম্মান করে না। কেবল তাদের ভয় পায়। আর যখনই দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব মানুষ সাধারণ মানুষের কাছে আসেন, তখন সাধারণ মানুষ লোক দেখানো হাসি হাসে। সেটাকেই ওই দায়িত্ব পাওয়া ক্ষমতাধররা সম্মান মনে করে তুষ্ট হন। তাদের ধারাণা সবই তার নিয়ন্ত্রণে। কোন কিছুই যে চিরস্থায়ী নয়, এই কঠিন সত্যটা দায়িত্ব পেয়ে তারা ভুলে যান। আর ভুলে গিয়ে কেবল অর্থ বাণিজ্য এবং এক একজন ব্রিটিশ শাসিত শাসক বনে যান। তিারা নিজের এবং কিছু তোষামোদকারী ছাড়া অন্য মানুষদের মানুষ হিসেবে মানতেই পারেন না। যেখানে মানুষই চিরস্থায়ীভাবে বেঁচে থাকতে পারছে না। সেখানে ৫ বছর কিংবা ১০ বছরের ক্ষমতায় অন্ধ হলে তার মাসুল তো দিতেই হবে। সেই মাসুল অনেকেই দিয়েছেন। যা বর্তমানে আমাদের সাবেক মেয়র কামালও দিচ্ছেন। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘ক্ষমতার চেয়ার আর কারাগার, পাশাপাশি’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মূলত রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্তদের সতর্ক করার জন্যই এমন মন্তব্য করেছেন। তার এই মন্তব্য শুনেছেন তার দলের এবং প্রশাসনের সবাই। কিন্তু মানছেন কজন। দায়িত্ব পেলেই আমরা ক্ষমতাবান হয়ে যাই। সেটা তৃণমূলের ছোট সংগঠন থেকে শুরু করে বড় রাজনৈতিক দল, সাংসদ, মন্ত্রী, আমলা সবাই। দায়িত্ব যখন ক্ষমতায় রূপ নেয় তখনই ভুল বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে অনিয়ম এবং দুর্নীতি। একজন কামালের উদাহরণ দিয়ে বলছি না। এমন উদাহারণ এই সময় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ অনেক স্থানেই আছে। তাই দায়িত্বকে ক্ষমতায় রূপ দিয়ে জনগণকে শোষণ না করে দায়িত্বকে দায়িত্ব হিসেবে নিয়ে মানুষের একজন কয়ে কাজ করলে এমন দু:সময় আসবে না।

৪৫ লাখ টাকা এমন একটা বড় অংক হয়ত নয়। এর চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি অর্থ কেলেংকারীর পতিবেদন আমরা পড়ছি এবং দেখছি। আমদের বিমানবন্দর, স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে মাঝে মাঝেই বিশাল অংকের অর্থ, স্বর্ণালংকার উদ্ধার করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। কারাভোগও করছে অনেকে। মর্যাদাবান ব্যক্তিরা এইভাবে কারাভোগ করুক সেটা আমরা চাই না। তারা সাধারণ মানুষের একজন হয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করুক।
 
মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে, শিল্প, সাহ্যিত্য সংস্কৃতির বাংলাদেশে আমরা ক্ষমতা দেখতে চাই না। আমরা মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব দেখতে চাই। যাকে সবাই সম্পান ও মর্যাদা দেবে। জনপ্রতিনিধি, আমলা ও প্রশাসনকে কোনভাবেই সাধারণ মানুষ ভয় না পায় সেটা নিশ্চিত করতে কাজ করুন। তাহলে আর কামালের মত অন্য কাউকে এইভাবে কারাগারে দেখতে হবে না।