বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮

আজমল হোসেন লাবু

Feb. 27, 2021, 11:44 p.m.

কার দোষ ?
কার দোষ ?
ভোরের আলো - ছবি:

হলো না, না হলোই না। মোটেই খুব ভালো হলো না। আশার গুড়ে কেন যেন বালিই জমা শুরু হলো। রাজনৈতিক উৎকর্ষ সাধনের ব্যার্থ পাহাড় এই বরিশাল। দিনে দিনে সেটা এই নগরবাসীর গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিলো। চলছিলো সেভাবেই। হটাৎ এক হিরণ ঝড় তাকে দুমরে মুছরে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিলো। মেয়র নামক শব্দের এই নতুন রূপ দেখলো বরিশাল। পরিস্কার পরিছন্নতা আলো ঝলমলে বরিশাল। সকল সমালোচনার মুখে চুনকালি মাখিয়ে প্রতিটি ভাঙাচোরা রাস্তার সংস্কারক হলেন তিনি। পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় সংস্কার কাজ ও পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সরব উপস্থিতি। সম্প্রসারিত হলো সম্ভাব্য সকল রাস্তা। প্রকাশ্য আসরে তিনি বলতে শুরু করলেন, আমি মেয়র মানে, আমি এই শহরের সব থেকে বড় পরিচ্ছন্নতা কর্মী! আমি মেয়র মানে, আমি এই শহর-বাগানের মালি। হুল নয়, ফুল ফোটানো আমার কাজ। হয়তো বেঁচে থাকলে আজ এই শহরটা কৃষ্ণচূড়া, শোনাইল কিংবা জারুল ফুলের শহর নামে খ্যাতি অর্জন করতো দেশময়। ভাগ্য খুব বেশি দিন সহায় হলো না আমাদের। তিনি চলে গেলেন পরপারে। অন্ধকারের কাছে পরাজিত হলো আলো।

আবার থেমে গেলো এই শহর মানুষের প্রত্যাশার পথ। তবু মানুষ বলে কথা। যাকে বাঁচতেই হয় আশা জাগানিয়া। শূন্যের পাশে পুনরায় সংখ্যা বসিয়ে আবার তাকে গড়তে হয় আশার সপ্নিল সিঁড়ি। এক, দশ, একশো, হাজার। সেই আশার পথের নুতন শুন্য এসে উপস্থিত হলো বরিশালে। যার বাপ দাদার প্রখড় রজনৈতিক বলয়ের ছায়ায় বেড়ে ওঠা এক নুতন মুখ। যিনি শূণ্য থেকে এক, তারপর ধীরে ধীরে দশ, একশো, হাজার। এভাবে অনেককে পিছনে থাকতে বাধ্য করে একদিন এই শহরে নেতা হওয়ার প্রত্যয়ী হলেন সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। যে নামের শেষের অংশই পরিরূর্র্ণতা দেয় তাকে সকল রাজনৈতিক যোগ্যতার। ততোদিনে মেয়র কামালের বিরোধীতায় নামে হিরণের বলয় ভেঙে চুরমার করবার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। রাজনীতি বলে কথা। তাদের কত সময় লাগে ক্ষমতার প্রয়োজনে দুয়ার পাল্টাতে? অন্তরে ভীষণ রকম হিরণপ্রীতি থাকলেও প্রকাশ্যে কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি অগ্নিদৃষ্টি উপেক্ষা করা। এর ফলশ্রুতিতে এক সময় দেখলাম খোদ হিরণ’স্ত্রী ঘোষণা দিলেন, ‘এই শহরের মেয়র দেখতে চাই সাদিক আবদুল্লাহকে।’ এ নিয়ে অনেক কথা ছিল তখন। সে আলোচনার আজ আর কোন অর্থ বহন করে না।

এ রকম অনেক পর্যায়ক্রমিক ঘটনা অতিক্রম করে এক সময় এ শহরের নাগরিকবৃন্দের সামনে উপস্থিত হলো বরিশাল সিটি করপোরেশন র্নিবাচন। সময়কাল ২০১৭। ক্ষমতায় কিংবা সঙ্গত না হলেও বলা যায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে তখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় তখন অনেকেই। তারা প্রত্যেকেই যোগ্য, সকল যোগ্যতার নিরিখে। সেই যোগ্যতরদের তালিকাটা ছিলো অনেকটা এইরকম। এসপি (অবঃ) মাহাবুব উদ্দিন আহম্মেদ বীর বিক্রম, সাহান-আরা আবদুল্লাহ, কর্নেল (অবঃ) জাহীদ ফারুক শামিম, গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল, অ্যাড. তালুকদার মো. ইউনুস, জেবুন্নেসা আফরোজ এবং সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। অবশ্য আমার এবং আমার বন্ধু মুরাদের মতো হয়তো ছিলো আরো অনেক নাম। যা প্রকাশ হয়নি, আর হবেও না কোনদিন। হয়তো তারা মনে মনে বলেও ছিল, ‘যদি নির্বাচিত হই তবে সর্ব প্রথম নাগরিকদের উপর আরোপিত কর ২০% মওকুফ করা হবে। করপোরেশনের কারো চাকরি যাবে না। এটা নিশ্চিত করা হবে তবে কর্মচারীদের তার পূর্বেই নিশ্চিত করতে হবে যে, তারা কেউ কখনোই কোন অন্যায় গ্রহণ করবেন না। ওয়ার্ড ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। তার মান নির্ণয় করতে কাজের সন্তুষ্টি প্রদান করবেন নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের নিধারিত যোগ্য ব্যক্তিবর্গ।

প্রতিটি ওয়ার্ডের অন্তত একজন ব্যক্তিত্ব নিয়ে থাকবে মেয়রের পরিকল্পনা গ্রহণের উপদেষ্টা পরিষদ। যার মেয়াদকাল থাকবে ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছর। সকল কাউন্সিলরগণ এবং এই পরিষদ মিলে নির্ধারণ করবেন মেয়রের অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। প্রত্যেক কাউন্সিলর নিশ্চিত করবেন তার ওয়ার্ডের প্রত্যেক বাড়িতে অন্তত একটি সুরক্ষিত ফুলের গাছ। তিনিই নিশ্চিত করবেন প্রতিটি বাড়ির আঙিনা পরিষ্কারের রূপরেখা। শহরে প্রবেশের সকল পথে কঠিন নিষেধ আরোপিত হবে মানব ইন্দ্রিয়ের জন্য সব থেকে ক্ষতিকর হাইড্রোলিক হর্ণের উপর। শহরের সর্বত্রই লেখা থাকবে এ শহর ভিখারী, ধূলা, ধোয়া এবং হাইড্রোলিক হর্ণ মুক্ত।

 
এই যে কল্পনাপ্রসূত এতগুলো কথা লিখলাম, এগুলো মূলত অসংখ্য অখ্যাত জনের একধরণের বিখ্যাত স্বপ্নিল কল্পনা বিলাস। যা সাধারণত বিখ্যাত জনদের মস্তিষ্কে প্রবেশের অনুমতিই পায় না। কারণ তারা কখনোই বলেন না, এই যে সিটি করপোরেশান, এটি মূলত কোন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নয়। এটি শুধুমাত্র নাগরিকদের সন্তুষ্টি এবং সেবা প্রদানের জায়গা। কেবলমাত্র এই একটির কথাই বলতে ভুলে যান সেই সব বিখ্যাত লোকেরা। যাদের নাম আমি উল্লেখ করেছি সম্ভাব্য মেয়র হবার যোগ্যতায় যারা নিজেদের সামিল করেছিলেন। তারা শুধুমাত্র বলেছিলেন নির্বাচিত হলে এই শহর সন্ত্রাসমুক্ত করবেন, মাদকমুক্ত করবেন, মশা এবং দুর্গন্ধমুক্ত করবেন। কিন্তু তারা কখনোই বলেননি যে, আমি নির্বাচিত হলে এ জাতীয় কোন বিষয়ের কখনোই উৎসমুখ হবো না। যে কাথাগুলো বললে এবং মানলে খুব সহজে সবকিছু সহজ হয়ে যায়। কলুষমুক্ত হয় সংসার, সমাজ, শহর, দেশ। স¦াধীন হয়ে ওঠে সন্ত্রাস দমনে পুলিশ। মাদকের অবাধ বিচরণ রুখে দিতে পারে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। আর ঠিক এমনটা হবার মানসিকতা প্রমাণ কোরলেই মশা, মাছি এবং দুর্গন্ধ আপনা থেকেই নাই হয়ে যায়।

না, আর নয়। এখন এমন অলিক কল্পনাপ্রসূত স্বপ্নিল কথা সুতো কেটে দিয়ে বিসিসির সেই ইলেকশনে ফিরে যাই। যে ইলেকশনে সকল জল্পনা কল্পনা এবং প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণতার উপর আস্থার অবসান ঘটাতে একসময় আমরা জানলাম। বরিশালের প্রবীণতম সমাজ, সংস্কৃতি, ব্যবসায়ী এবং শিক্ষিতজন সবাইকে একত্র করে ঢাকায় পৌঁছে গেছেন প্রার্থী সাদিক আবদুল্লাহ। আমরা জানতে পারিনি প্রাধানমন্ত্রীর দুয়ার দর্শন তারা করতে পেরেছিলেন কী না! তবে এটা জেনেছিলাম, আমরা প্রার্থী পেতে যাচ্ছি জনাব সাদিক আবদুল্লাহকেই। তার আভাস পেয়েছিল এ শহর যেদিন তারা দেখেছিল পত্রিকায় সেই ছবি। যেখানে বর্ষীয়ান জাতীয় নেতা জনাব আলহাজ¦ আমির হোসেন আমু নিজ হাতে মিষ্টি তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন সাদিক আবদুল্লাহকে। তার পরের গল্প সবার জানা।

আমরা সবাই ব্যস্ত হলাম মাঠে ময়দানে, নগরবাসীর দুয়ারে দুয়ারে। এক অভূতপূর্ব নির্বাচনী প্রচারের জোয়ার শুরু হল এই শহরে। নির্বাচনের দিন দেখলাম অপজিশন শব্দ তার অর্থ হারিয়ে পজিশনের সাথে মিলেমিশে একএকার হয়ে গেছে। নির্বাচন শেষ, আমরা বিজয়ী হলাম। সিটির মেয়র নির্বাচিত হলেন সাদিক আবদুল্লাহ। ব্যাপক আশা-জাগানিয়া শুরু হল তার কর্মউদ্যোগ। সমস্ত শহরে ছড়িয়ে পরল সেই নতুনের কেতন, ‘আমরাই গড়বো আগামীর বরিশাল’। দেখতে দেখতে কেটে গেল তিন বছর। তিনটি কিংবা পাঁচটি রাস্তা হলো অনেক বড়, মজবুত, আধুনিক। তার পরে আর কি হলো? যাকে দেখে এই শহরের মানুষ বলতে পারে, বর্তমান মেয়র আতিক্রম করেছে কর্মে উদ্যোগে, সৌন্দর্যে হিরণকে। সমালচনা সে তো করাই যায়, হোক সে প্রাসঙ্গিক কিংবা অপ্রাসঙ্গিক। মেয়র কামাল সেওতো হিরণের সকল উন্নয়নকেক বলেছিলেন, লিপস্টিক উন্নয়ন। যিনি নিজে দুর্নীতির দায়ে কারাগারে ফুলের বাগান পরিচর্যায় রত আছেন বলে খবর হয়েছে। হয়তো এখন তিনি বুঝতে পারছেন সুন্দর কি, উন্নয়ন কাকে বলে। 

কিন্তু আমরা যারা বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এ শহরের ব্যাপক উন্নয়নের প্রত্যাশায় আছি তারা কি দেখছি? কেথায় সেই প্রত্যাশিত উন্নয়ন? যে প্রশ্নগুলির সামনে বারবার উত্তর হয়ে ফিরে আসে ‘বরাদ্দ নেই’। কেন বিসিসির নামে বরাদ্দ নেই? কেন তিন বছর অতিক্রম করবার পরেও নির্বাচিত মেয়রকে মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রীর সামনে বিস্ময়ভরে উচ্চারণ করতে হয় ‘মাননীয় মন্ত্রী, আমার বরিশালের উন্নয়ন বরাদ্দ কোথায়, কেন পাচ্ছি না? মানুষের মনে আমার বিরুদ্ধে কোন প্রশ্ন মানে সেকি আপনাদেরও বিরুদ্ধে নয়, সেকি আমার দলেরও বিরুদ্ধে নয়? আমার অযোগ্যতার দায়ভার সেকি আপনাদের উপরেও বর্তায় না? নিশ্চয়ই শহরবাসী এমন প্রশ্নের সঙ্গে সহমত প্রসন করে। আমরা যারা এ শহরের নাগরিক তাদেরও সবার একই প্রশ্ন, মেয়রের গতি কেন থামিয়ে রাখা হচ্ছে? কেন তার নগরের উন্নয়ন বরাদ্দ নেই? এখানে নগরবাসীর কি দোষ, কেন বারবার তারাই বঞ্চিত হবে?


আপনারা যে প্রার্থী দিয়েছেন নগরবাসী তাকেই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছে। যদি প্রশ্ন কোথাও থাকে, তার উত্তর খুঁজুন আপনারা। ভুল যদি কোথাও হয়েছে মনে করেন, তাকে সুধরাবার সময় আছে হাতে এখনো। কোন ব্যর্থতার দায়ের দায়িত্ব নিতে বাধ্য কি নগরবাসী? তারা কখোনই কোন বৈষম্যের শিকার হতে রাজি নন। মাননীয় মন্ত্রী আপনি খবর নিয়ে জানুন, এই শহরের অলি গলির বাস্তব অবস্থা। রাস্তাগুলির করুণ পরিনতি দেখুন, সম্প্রসারিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা স্থবিরতার বিষয় অবগত হোন। দেখুন সমস্ত রাজনৈতিক ঠিকাদার কর্মীবাহীনির মুখ। খবর নিন তাদের পকেটের।
মাননীয় মন্ত্রী আমরা বিস্ময়ভরে দেখেছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার সামনে মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর ভাষণ। মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিন ‘সময় বহিয়া যাইতেছে’। স্থবির এই শহর বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্বের প্রত্যাশায় অপেক্ষমান। এমন রাষ্ট্রীয় অসহযোগিতা চরম স্থবির করে ফেলেছে বিসিসিকে। এই মুহূর্তে নগরবাসী যারপরনাই অখুশি আরোপিত ট্যক্সের ব্যপারে। শহর উত্তর শহর দক্ষিণের দুটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট এখনো অকার্যকর। শহর এবং সম্প্রসারিত শহরের নুতন বাড়ির প্লান কার্যক্রম আরো সহজ আরো গতির প্রয়োজন, যা এখন প্রায় অধরা। নগরবাসী ভাল বুঝতে পারছে না তাদের করণীয় কি? সাগরদী থেকে দোয়ারিকা প্রর্যন্ত বাইপাস সড়ক এই মুহূর্তের সব থেকে জরুরী। পানীয় সমস্যার কোন সমাধান না করে টিউবওলের উপর আরোপিত অর্থের চাপ নগরবাসীর কাছে গোদের ওপরে বিষফোড়াসম। এমন ছোট শহরে স্থানীয় সরকারের এই সকল বড় বড় আইনের প্রয়োগ কতটা বাস্তবসম্মত তা ভেবে দেখা দরকার। এ বিষয়গুলি শহরবাসীকে করপোরেশান বিমুখ করছে ধীরে ধীরে। এভাবে একটি নির্বাচিত চেয়ারকে আষ্টেপিষ্টে বেঁধে রেখে অসম্মান করবার অর্থ স্পষ্টত নগরবাসীকেই অসম্মান করা। 

মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী এভাবে আর কতদিন? মেয়র আপনার বরাবর তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সেটা কতটা সঙ্গত কতটা অসঙ্গত ভাবেননি। তার পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে মনে করে, তিনি সিনাটান করে কথাগুলি উচ্চারণ করেছেন নগরবাসীর প্রেয়োজনে। এভাবে চলতেই থাকলে মেয়রের নির্দেশে তার নগরবাসী সন্মার্জনী লয়ে পথে নেমে আসবে। যেমন মাত্র কিছুদিন পূর্বেই থানা ঘেরাওসহ সমস্ত শহর স্তব্ধ করে দিয়ে তিনি তা দেখিয়ে দিয়েছেন। আমরা পত্রিকায় স্বচিত্র সেই খবর পড়েছি।এমন পরিস্থিতিতে মাননীয় মন্ত্রী, আপনার প্রশ্ন থাকতে পারে কে বলেছে এই শহর মেয়রের সঙ্গে? এমন প্রশ্নের উত্তরে গোপালভাঁড়ের একটি গল্পের বিচক্ষণ বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ‘ভারত নদীয়ার মহারাজা কৃঞ্চকান্তের রাজসভায় দাঁড়িয়ে একদিন গোপালভাঁড় বললেন, মহারাজ আপনার এই রাজসভায় যারা আসেন তারা কেউ নূতন কিংবা ভিন্ন কিছু ভাবতেই জানেন না। ওদের সকলের মনের কথাগুলি এক এবং আভিন্ন। আপনি অনুমতি করলে বিষয়খান যথাযথ প্রমাণ করে দিতে পারি!

মহারাজ এমন কথা শুনে মনে মনে ভাবলেন প্রায়শঃই সে গোপালের কাছে বুদ্ধির প্যাঁচে হারলেও আজ তার সেটা মনে হচ্ছে না। আজ গোপাল এমন বিষয়টি কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবে না। তাছাড়া এ রাজসভায় সমস্ত সভাসদ সবাই মনে মনে একই কথা ভাবছে সেটা কি করে সম্ভব? গোপাল মৃদু স্বরে বললেন-মহারাজ সম্ভব, দেখুন। এই বলে গোপাল রাজসভার উদ্দেশ্যে বললেন, মাননীয় সভাসদবর্গ আপনারা শুনুন। এখন আমি মহারাজার অনুমতিতে একটি প্রশ্ন করবো। আপনারা ঝটপট হ্যাঁ কিংবা না বলে তার উত্তর দিবেন। আমি এই মাত্রই মহারাজকে বলেছি আপনারা সবাই মিলে এই মুহূর্তে যা ভাবছেন আমি সেটা জানি! মুহূর্তেই রাজদরবারে গুণগুণ ফিসফাস। একজন তো মুখে বলেই ফেললেন তা কি করে সম্ভব? খুব সম্ভব। তবে শুনুন। এই বলে গোপাল দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন মাননীয় সভাসদবর্গ আজ আপনারা সবাই এই দরবারে এসেছেন শুধুমাত্র একটি ভাবনা নিয়ে। আর সেটা হলো এই মুহূর্তে আপনারা সবাই মহারাজার দীর্ঘ জীবন কামনা করছেন। কথাটা কি ঠিক? সবাই সমস্বরে বলে উঠলো একদম ঠিক। গোপাল আড়চোখে মহারাজের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন। তারপরে বললেন, এবার একটা বোনাস দেই মহারাজ?

মাননীয় সভাসদবর্গ এবার আমার দ্বীতিয় প্রশ্ন। আপনারা মন দিয়ে শুনুন। খবরদার কেউ ভুল উত্তর দিবেন না। তাহলে মহারাজ ভীষণ রাগ করবেন। আমি জানি আজ আপনারা এক মহৎ প্রত্যাশা নিয়ে রাজসভায় এসেছেন। আর তা হলো, আপনারা সবাই কায়মনোবাক্যে চাইছেন এ বছর মহারাজ এক পুত্র সন্তান লাভ করুক। এবার সবাই দাঁড়িয়ে গগণ বিদারী চিৎকার করে বলে উঠলো ঠিক-ঠিক। এভাবে মহারাজের মাথায় ঠিকঠিক এর এক বিশাল বোঝা চাপিয়ে গোপাল ভুড়ি দোলাতে দোলাতে রাজ সভা ত্যাগ করলেন। ধীরে ধীরে সবাই চলে গেল। একেবারে সুনসান রাজসভায় বসে মহারাজ ভাবলেন এটা কি হলো? কি করে সম্ভব! তারপর হঠাৎ উত্তেজনায় চন্ডিরূপ ধারণ করে প্রহরীদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, ‘এই শালারা সবাই রাজদরবারে শুধু ঠিক-ঠিক বলতে আসে’? এমন প্রশ্নে প্রহরীদের মুখে রা শব্দটি নেই। কারণ কী? কারণ একটাই ওরা বলতেও জানে শুধু একটাই কথা আর সেটা হল, মহারাজের হুকুম শুনে কেবল জি হুজুর বলে হুকুম তামিল করা।’ এটা তো প্রশ্ন। এর উত্তর কি ওরা জানে? কে জানে তবে, আমরাও কি জানি ? জানেন কি আমাদের মেয়র মহোদয় কিংবা মাননীয় মন্ত্রী? আসলে শক্তির উৎসমুখে পশ্ন করবার মত যোগ্য আমরা কেউ নই। না ঘরে, না সংসারে। না বাইরে, রাষ্ট্র-রাজনীতির ক্ষমতায়! শুধু পোঁ-ধরা আর লেজুড়বিত্তি ছাড়া কি জানি আমরা? তবে একেবারে না জানলেই বা কেমন করে চলে? তাহলে মানুষ, অর্থাৎ সেই সকল মানুষ যাদের কথা শুনলেই শরীরে আগুন জ¦লে।

তারা কী এমন সুযোগে বলে উঠবে না?
‘তরী ফুটা করি পার হতে গিয়ে ডোবে 
তবু ওরা কারে অপবাদ দেয় ক্ষোভে’?

জনগণকে সুযোগ দিলে সে তো বলবে, সিদ্ধান্ত নিল দল-নেতা, সেই ভুলের ভুক্তভোগী কেন হবে জনতা? আসলে মানুষ প্রশ্ন করছে। আমাদের কান সে কথায় কর্ণপাত করছে না। সে দোষ কার? জানি কি আমরা, কার দোষ, নাচে যেই জন, না তারে যে নাচায়?