শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮

সাইফুর রহমান মিরণ

March 28, 2021, 8:13 p.m.

বাংলাদেশের নাম লেখানোর আর এক বাংলাদেশ
বাংলাদেশের নাম লেখানোর আর এক বাংলাদেশ
আবদুর রব সেরনিয়াবাত। - ছবি: ভোরের আলো।

জ ২৮ মার্চ ২০২১, রোববার। ১০০ বছর আগের ২৮ মার্চ কি বার ছিল সেটা মনে করতে কষ্ট হলেও বছরটি জ¦লজ¦ল করছে। সালটি ১৯২১। ১০০ বছরের ব্যবধানে আজ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের পঞ্চাশ। এক বছর আগে ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির কা-ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর, জাতির পিতার জন্মশতবর্ষের সঙ্গে সঙ্গে আরো একটি জন্মশতর্বষ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। কার সেই জন্মশতবর্ষ? কোন মানুষ, কেমন মানুষ তিনি? তিনি হচ্ছেন, জাতির পিতার মতোই উদার ও দৃঢ়তায় অনড় ব্যক্তিত্ব। সাধারণ মানুষের অনুকোমল অনুভূতি বুঝতে পারা, ব্যাথাতুর মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন অনুধাবন করতে পারা জননেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত। ১৯২১ সালে জন্ম নেওয়া শিশু ‘রব’, আবদুর রব থেকে জননেতার খেতাব পান। পরে অবশ্য ক্ষমাতলোভী কিছু উশৃঙ্খল সেনাসদস্যর নির্মমতার শিকার হয়ে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে বাধ্য হন তিনি। এরপর তাঁর নামের আগে আর একটি শব্দ যুক্ত হয়ে যায়। সেটা হচ্ছে শহীদ আবদুর রব সেরনয়িাবাত। জন্মশতবর্ষে এই জনবান্ধব রাজনীতির কর্ণধার শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাদের প্রতি আমাদের হৃদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ১৯২১ সালের ২৮ মার্চ বরিশাল জেলার তৎকালীন গৌরনদী উপজেলার সেরাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিশু এবং কৈশোরের দূরান্তপনা কেটেছে মনষামঙ্গলের কবি বিজয়গুপ্তের ফুল্লশ্রী ও গৈলার সবুজর-শ্যামল চত্বরে। এই গ্রামের ধূলা-মাটিতে বাবা আবদুল খালেক সেরনিয়াবাত এবং মা মোসাম্মৎ হুরুন্নেছা বেগমের পরম ¯েœহে বেড়ে ওঠেন আবদুর রব সেরনিয়াবাত। ১৯৩৯ সালে গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন তিনি। শিশু থেকে কৈশোরে পা রাখার আগেই তিনি দেখেছেন ইংরেজ শাসন। যা দেখে ভেতরে ভেতরে ক্ষুদ্ধ হতে থাকেন আবদুর রব সেরনিয়াবাত। এরমধ্যেই শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে কিশোর আবদুর রব সেরনিয়বাতের ক্ষোভ সঞ্চারিত হতে থাকে পুরো ভারতবর্ষে। শিক্ষা বঞ্চিত জনপদে জন্ম নেওয়া আবদুর রব সেরনিয়াবাত উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য গ্রামের বাড়ি সেরাল ছেড়ে বরিশালে এসে ভর্তি হন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ব্রজমোহন কলেজে। ১৯৪১ সালে এই কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য পাড়ি জমান কোলকাতায়। ভর্তি হন কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এই দাঙ্গা কোলকাতায় ভয়াবহ আকার ধারণ করে। যা পুরো ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫০ সালে এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন আবদুর রব সেরনিয়বাত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গ বন্ধ করতে তৎপর হন। এসময় তিনি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পাশে ঢাল হয়ে অবস্থান নেন। তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণেই সেদিন গৌরনদী-আগৈলঝারায় সাম্প্রদায়িক হানাহানির ঘটনা ঘটেনি। মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং সম্পদ রক্ষায় নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে অনন্য উদাহারণ সৃষ্টি করেন তিনি। সাধারণ মানুষের অধিকার বাস্তবায়নের স্বপ্নে বিভোর হন আবদুর রব সেরনিয়াবাত। সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন আবদুর রব সেরনিয়াবাত। 

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সোচ্চার হলে আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেই দাবি জোরালো করতে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া আবদুর রব সেরনিয়াবাত ১৯৫৩ সালে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। গণতন্ত্রী দলে যোগ দিয়ে তাঁর রাজনীতির মাঠে পদচারণা শুরু হয়। ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন হলে তিনি ন্যাপে যোগ দেন। এক পর্যায়ে তিনি বরিশাল জেলা ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও ছিলেন। ১৯৫৮ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ১৯৬৪ সালে সামরিক শাসন প্রত্যাহারের দাবিতে সর্বদলীয় ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট গঠন হলে তাতে যোগ দেন আবদুর রব সেরনিয়বাত। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ৬ দফার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। এই বছরই বরিশালে কর দাতা সমিতি গঠন করেন তিনি। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আবদুর রব সেরনিয়াবাত আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেনে এবং বিজয়ী হলে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেন ও দক্ষিণাঞ্চলীয় কমিটির প্রশাসক নির্বাচিত হন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং মুজিবনগরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

১৯৭৩ সালে গৌরনদী আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের ভূমিমন্ত্রী ছিলেন তিনি। এসময় তিনি ভূমি প্রশাসন, ভূমি সংস্কার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সম্পাদ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। কৃষিবান্ধব জননেতা সাধারণ কৃষকের কথা চিন্তা করে ৭ বছর মেয়াদী খাই-খালাসী আইন প্রবর্তন করেন। দরিদ্র কৃষকের ব্যাথা অনুধাবন করে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন। একই সঙ্গে এক পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা জমি সংরক্ষণের আইন প্রবর্তন করেন। ভূমিহনিদের মধ্যে খাস জমি বন্টনের ব্যবস্থাও শুরু করেন আবদুর রব সেরনিয়াবাত। কৃষি নির্ভর দেশের মানুষের দুরাবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে কৃষকজে কাজে পানির সমস্যা দূর করতে সেচ প্রকল্পও চালু করেন তিনি। এসব কারণে আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে ‘কৃষককূলে’র নয়নমনি আখ্যা দেওয়া হয়।

একজন রাজনীতি সচেতন জনবান্ধব ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবদুর রব সেরনিয়াবাত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন। আইন বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করা আবদুর রব সেরনিয়াবত আইনে পশার সঙ্গে নিবিরভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি বরিশালের আইনজীবী সমিতির সদস্য ছিলেন। রাজনীতি ও আইন পেশার পাশাপাশি সাংবাদিকতাও করতেন আব্দুর রব সেরনিয়াবাত। মানুষের সমস্যা সমাধান এবং সমস্যার কথা তুলে ধরতে তিনি সাংবাদিকতাও করেছেন। একজন স্বচ্ছ রাজনীতিকের পাশাপাশি দৃঢ়চেতা একজন কলমসৈনিকও ছিলেন তিনি। দৈনিক পাকিস্তান, অবজারভার পত্রিকায় কাজ করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন বার্ত সংস্থার ইউপিপির বরিশাল প্রতিনিধি হিসেবও।

একজন মুক্ত চিন্তার মানুষ, একজন অসাম্প্রদায়িক চিন্তার মানুষ আবদুর রব সেরনিয়াবাত রাজনীতির পাঠশালার ছাত্র হিসেবে কর্মী থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। কিন্তু কোন দিন সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট থেকে তাকে দূরে সরে যেতে দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষের একজন হয়ে সব সময় সমস্যা সমাধানে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষটিকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে ৩২ নম্বরে বাড়িতে স্বপরিবারে হত্যা করে ক্ষমতালোভী কিছু কুলাঙ্গার। তারাই সেদিন বঙ্গবন্ধু সরকারের কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবতকে ২৭ নম্বর মিন্টো রোডে তাঁর সরকারি বাসভভনে নির্মামভাবে হত্যা করে। হত্যা করে তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও। তবে প্রাণে বেঁচে যান তাঁর পুত্র আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, শিশু পুত্র বর্তমান বরিশাল সিটি মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ এবং ঘাতকদের গুলি খেয়ে মুমূর্ষু অবস্থা বেঁচে যান আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর সহধর্মীনী সাহান আরা বেগম। তবে সেদিন ঘাতকেদের বুলেট থেকে রক্ষা পাননি অবুঝ শিশু সুকান্ত বাবু।

বাংলাদেশের ৫০ বছরে আমরা যখন সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করছি, তখন বাংলাদেশের হৃদয় হতে কেড়ে নেওয়া শহীদ আবদুর রব সেরনিয়বাতের জন্মশতবর্ষ। কিছুদিন আগে আমরা পালন করেছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। আজ আমরা সুবর্ণ জয়ন্তিতে পালন করবো আর এক স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশের উদার মানুষ শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবতের জন্মশতবর্ষ। আজ বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের মধ্যেই তুমি আছো, তুমিই বাংলাদেশ। এই উজ্জ্বল দিনে বরিশালের কৃতি সন্তান, বাংলাদেশের নাম লেখানোর আর এক বাংলাদেশ শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাতের প্রতি হৃদয়ের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।