বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮

সাইফুর রহমান মিরণ

April 8, 2021, 11:59 p.m.

নগরের ভীড়ে সবুজ কৃষ্ণচূড়ায় রক্তিম হিরণ
নগরের ভীড়ে সবুজ কৃষ্ণচূড়ায় রক্তিম হিরণ
শওকত হোসেন হিরণ। - ছবি: ভোরের আলো।

নগরীরর একজন স্বপ্নবাজ মানুষ শওকত হোসেন হিরণ এর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে ভোরের আলো পরিবার।


সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি কবিতার লাইন দিয়ে শুরু করি, ‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে, শুধু একবার চোখ মেলো, এই গ্রাম-নগরের ভীড়ে।’ আজকের লেখার জন্য লাইনটি কতটা যৌক্তিক জানি না। কবি জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার বরিশালে, কবিতার শহর বরিশালে, সবুজে ঢাকা বরিশালে স্বল্প সময়ের জন্য কোন এক মহামানবের আবির্ভাব হয়েছিল। যিঁনি হ্যাচকা টানে বদলে দিয়েছিলো পুরো নগরের চিত্র। রোদে শুকানো মাটিতে সবুজের বীজ বপন করেছিলেন তিনি। আজকের বরিশাল নগরের সবুজ বেষ্টনী তাঁর পরশের-ই ছোঁয়া। তিনি হচ্ছেন একজন হিরণ। একজন স্বপ্নবাজ মানুষ শওকত হোসেন হিরণ।

২০১৪ সালে তোমার স্বপ্নেরা তখন কেবল ডানা মেলতে শুরু করেছিল। কি অপরূপ লাগছিল সেই সময়ের প্রকৃতিকে। আজ সেটা বোঝানো কঠিন। স্বপ্নগুলো যখন বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে তখনই তোমাকে চলে যেতে হলো না ফেরার দেশে। আজ এই দিনে তোমার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আমাদের দায় থেকে বলছি, তোমার সুন্দরকে শ্রদ্ধা না করলে আমরা যে পঙ্কে নিমজ্জিত হবো। তোমার উদারতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাকে যদি স্মরণে রাখতে না পারি, তাহলে আমাদের মতো আর অকৃতজ্ঞ কেউ থাকবে না। তাইতো আমাদের মতো হাজার হাজার মানুষ আজো তোমাকে খুঁবে ফেরে এই নগরের প্রতিটি সবুজ বৃক্ষের মাঝে। খুঁজে ফেরে কৃষ্ণচূড়ার লাল আভার মধ্যে। হয়তো তুমি সেই কৃষ্ণচূড়ার লাল আভা হয়ে আছো আমাদের এই বৃক্ষরাজির মধ্যে।

আজ ৯ এপ্রিল। লক্ষ্য করেছি, এখনই সবুজ কৃষ্ণচূড়ায় রক্তিম মুকুলের আহ্বান। দুই এক দিনের মধ্যেই জানান দেবে সুবর্ণ জয়ন্তীর লালাভো সূর্য কৃষ্ণচূড়ারা। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছরে সেই কৃষ্ণচূড়া আরও গাঢ় লাল হয়ে সম্ভাষণ জানাবে বাংলাদেশকে। এমন মাহেন্দ্রক্ষণে তুমি-ই কেবল থাকবে না তোমার সবুজ বরিশালে। তবে তোমার কৃষ্ণচূড়ারা কিন্তু অকৃপণভাবে তোমার মতোই বরিশাল এবং বাংলাদেশটাকে ভালোবেসে তোমার বার্তা পৌঁছে দেবে সবার দুয়ারে। শওকত হোসেন হিরণ তোমার জাদুমন্ত্র ভুলে যায়নি এই নগরের মানুষ। সঠিক সময় হয়তো তারা মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছ। তবে সেই আফসোস থেকেই তারা তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে আছে। তোমার চলে যাওয়ার দিনটি স্মরণে রেখে আবারও তোমার প্রতি শ্রদ্ধা এবং একান্ত শ্রদ্ধা জানাই।

আমরা একটু ২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল বৃহষ্পতিবার বরিশালের ছবিটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে চাই। যদিও আজ বৃহষ্পতি নয়, শুক্রবার। মাঝখানে ৭ বছর অতিক্রম হয়েছে। ২০১৪ সালের সেই বৃহষ্পতিবার বিকেল তিনটা। বঙ্গবন্ধু উদ্যানে জনপ্রতিনিধিসহ উৎসুক নাগরিকদের ভীড়। সবার দৃষ্টি বরিশালের সবুজ ভেদ করে নীলাকাশে। কেন সবার দৃষ্টি আকাশপাানে? কারণ তো একটাই আকাশ থেকে নামবেন সবুজ বরিশালের সবুজ স্বপ্নের কারিগর শওকত হোসেন হিরণ। বিকেল সাড়ে তিনটায় বঙ্গবন্ধু উদ্যানের সবুজ ঘাস ষ্পর্শ করেন এই নগরের মৃত্যুহীন প্রাণ শওকত হোসেন হিরণ। সতেজ, সরব হিরণের নিথর শবদেহ যখন বঙ্গবন্ধু উদ্যানের সবুজ ঘাস স্পর্শ করেছে তখন আকাশ-বাতাস প্রকম্পতি ছিল কান্নার ধ্বনিতে। গগণবিদারী আহাজারীতের ভিজে যায় সবুজ গালিচা বঙ্গবন্ধু উদ্যান। মানুষের স্রোতে বঙ্গবন্ধু উদ্যান জনসমুদ্রে রূপ নেয়।

কেন এমন দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল সেদিন? হিরণ কি জাদু করেছিলেন আমাদের? যার জন্য এতো মানুষ এসে ভীড় জমিয়েছেন? এই নগর প্রান্তরে কি ছবি এঁকেছিলেন হিরণ? বরিশাল নগরে এই প্রশ্নের উত্তর জানেন না এমন একটি মানুষও পাওয়া যাবে না। যারা হিরণকে প্রচ- রকম অপছন্দ করতেন তারাও এ প্রশ্নের উত্তর জানেন। হয়তো তারা অনেকে প্রকাশ্যে এখন আর সে কথা বলতে চাইবেন না। কিংবা বলতে পারবেন না। তবে ২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল বৃহষ্পতিবার সবাই একবাক্যে এই প্রশ্নের উত্তার দিয়েছিলেন। সেদিনে সবার উত্তর একই ছিল। সবাই বলেছেন- সত্য, সুন্দর এবং সতেজ এক বরিশালের ছবি এঁকেছিলেন হিরণ।

হিরণের আঁকা বরিশালের সবুজ ক্যানভাস সেদিন আছড়ে পড়েছিল বঙ্গবন্ধু উদ্যানে। মানুষের মনিকোঠায় স্থান করে নেওয়া হিরণ হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালা হয়ে গেলেন মুহূর্তে। তবে হ্যামিলয়নের বাঁশিওয়ালার সঙ্গে হিরণের পার্থক্য শুধু জীবন আর মৃত্যুর। হ্যামিলিয়ন জীবন্ত প্রতিচ্ছবির কাহিনী। আর হিরণ মৃত্যুহীন কিংবদন্তীর নাম। মানুষের ভালোবাসায় জয় করেছেন মৃত্যুকে। মৃত্যুহনী প্রাণ বলছি এই জন্য মৃত্যুকে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন। দীর্ঘ ৭ বছর পরও বরিশালের মানুষ আজো তাই হিরণকে খুঁজে ফেরেন।

আধুনিক বরিশালের রূপকার, সবুজ বরিশালের সফল মেয়র শওকত হোসেন হিরণ। মাত্র সাড়ে চার বছরের মধ্যে পুরো বরিশালের ছবি পাল্টে দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের হিরণ বরিশালের হিরণ হয়ে উঠেছিলেন। তাই সব দলের মানুষ তাঁকে নিজের বলে কাছে পেতেন। তার কারণ হিরণ সকল দুর্যোগে মানুষের পাশে থেকে সাহস যুগিয়েছিলেন। সকল দু:সময় থেকেছেন পাশে। শত ব্যস্ততার মাঝেও নিত্য সকালে লুঙ্গি পড়ে বাড়িতে আসা মানুষের কথা শুনতেন এবং সাধ্য মতো সমাধান দিতেন। কোনদিন হিরণের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা না পেয়ে ফিরে গেছেন এমন একটা প্রমাণও কেউ দিতে পারেনি ওই সাড়ে চার বছরে। মানুষের কথা শুনেছেন, শ্রদ্ধা ও সম্মান করেছেন সব বয়সের নাগরিকদের। স্বশরীরে কিংবা মুঠোফোনে যেভাবেই নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল আত্মিক। তাই তো হিরণের মৃত্যুর পরদিন বঙ্গবন্ধু উদ্যানসহ পুরো বরিশাল এক মোহনায় মিলিত হয়।

মানুষের জন্য ভালবাসার প্রতিদান এমন হতে পারে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কষ্ট। সেদিন যে যেমন পেরেছেন ছুটে এসেছেন। দোকানদার, ব্যবসায়ী, রিকসা শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক নেতা সবাই এসেছেন প্রিয় মানুষ হিরণকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।

আমার নিজের কানে শোনা সেদিনের একটি ঘটনা এর আগেও বলেছি। আজও আবার বলতে ইচ্ছে করছে। সেটা হচ্ছে- ২০১৪ সালের নয় এপ্রিল হিরণের মরদেহ তখন বরিশালে পৌঁছেছে। নগরের আলেকান্দা তাঁর বাসভবন চত্ত্বরে রাখা হয় তার শবদেহ। তাঁকে দেখতে হাজার হাজার মানুষ ছোটে তাঁর বাসভবনের দিকে। মানুষের সেই স্রোতের সঙ্গে গরু নিয়ে হাঁটছেন একটি লোক। কেউ তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করেনি, তারপরও তিনি স্বগতভাবে বলছেন,  ‘মেয়রের বাড়ি এদিক থেকেও যাওয়া যায়’। হিরণ তখন মেয়র ছিলেন না। এই সত্য বরিশালের নাগরিকরা জানতেন, তবে মানতেন না। তাই তো আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য যে কোন দলের কর্মী ও সাধারণ মানুষের মুখে হিরণ হয়ে ওঠেন মেয়র হিরণ। সেই নামেই পরিচিতি ঘটে তাঁর।

পরদিন ১০ এপ্রিল চৈত্রের তাপদাহ তীব্র। তাপদাহ উপেক্ষা করে আমার মানুষের ঢল বঙ্গবন্ধু উদ্যানের দিকে। কিশের প্রতিদান দিতে চৈত্রের রোদ উপেক্ষা করে মানুষের স্রোত বঙ্গবন্ধু উদ্যানের দিকে। কারণ একটাই আধুনিক বরিশালের সত্যি রূপকার হিরণের নামাজে জানাজায় যোগ দিতে হবে। একটা সময় বঙ্গবন্ধু উদ্যানে মানষ দাঁড়াবার জায়গা পাননি। শেষ পর্যন্ত উদ্যানের চার পাশের রাস্তায় যে যেমন পেরেছে দাঁড়িয়ে জানাজায় সরিক হয়েছেন। মাত্র তো সাড়ে চার বছর বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। এর আগে তো অনেকে পৌর চেয়ারম্যান থেকে মেয়র পর্যন্ত হয়েছেন। ছিলেন, আছেন। তাদের ত্রুটি কোথায়? এমন সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বরিশালের সাধারণ মানুষ।

কেন হিরণের প্রতি সাধারণ মানুষের এতো ভালোবাসা তার কিছু কথা বলা প্রাসঙ্গিক। নগরের যেখানেই চোখ যায় হিরণের কাজের ছাপ। বরিশাল নগরে সবুজ বৃক্ষের অর্ধেকের বেশি হিরণের লাগানো। স্বপ্ন ছিল সবুজের নগর তৈরি। রাস্তায় টিস্যু, থুথু ফেলতে নিষেধ করতেন হিরণ। নিজের আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখার তাগিদ ছিল। সূর্য ওঠার আগে নগরের আবর্জনা সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। ৩০ ওয়ার্ডের বাড়ি বাড়ি থেকে বাঁশি বাজিয়ে ময়লা অপসারণের উদ্যোগও তাঁর। নগরে বালুর গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং রাত জেগে তার তদারকি করেছেন হিরণ। নগরের সড়ক প্রসস্তকরণ, আলোর নগরীতে পরিণত করা, ফুটপাত নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, বিনোদন কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালানা সর্বত্র অবদান ছিল হিরণের। তাই তো হিরণ সবার কাছে এত প্রিয় ছিল।

আর একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা না বললেই নয়। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সম্মেলন উপলক্ষে নগরে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনাসহ নেতাকর্মীদের বিলবোর্ডে ছেয়ে যায়। দুইদিন পর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বরিশালে আসবেন জনসভা করার জন্য। শওকত হোসেন হিরণ বিএনপির জনসভা সফল করার জন্য নিজ দলের সব বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলেন। সেই সব স্থানে মুহূর্তের মধ্যে খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতাদের ছবি বিলবোর্ড স্থান পায়। ওই জনসভা যাতে সফল হয় সেজন্য আগের দিন বঙ্গবন্ধু উদ্যানে বিএনপির জনসভাস্থল পরিবদর্শন করেন হিরণ। বরিশালের ইতিহাসে কোন ধরণের হামলা ও সহিংসতা ছাড়া বিএনপির ওই জনসভা সফল হয়।

আজো হিরণের শূণ্যতা পূরণ হয়নি। বর্তমানে বরিশাল নগরী শান্তির নগর হিসেবে পরিচিত। যার রূপকারও হিরণ। লাখো জনতার জানাজার নামাজ শেষে সেদিনকার শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাসের বরিশাল শান্তির বরিশালে রূপান্তর করেছে হিরণ’।
বরিশালে আওয়ামী লীগের বাইরেও অন্য দলের নেতা-কর্মীরা হিরণের শূন্যতার কথা বলছেন। আজো হিরণের জন্য অশ্রু ঝরাচ্ছেন অনেকে। যে মানুষটা মাত্র কয়েক বছরে নগরের রূপ বদলে দিল সেই মানুষটা আমাদের মাঝে নেই। এটা কেমন বিচার বিধাতা। এমন কান্নার শব্দ আজো নগরময়। এই কান্না থামাতে আবরও হিরণের মত একজনকে আসতে হবে। যিনি হিরণের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে রূপসী বাংলার কবি জীবনান্দ দাশের নগর বরিশালকে সাজিয়ে দেবেন।

শওকত হোসেন হিরণ ২০১৪ সালের ২২ মার্চ রাত সাড়ে নয়টায় বরিশাল ক্লাবের লনে পায়চারি করার সময় পা ফসকে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। দ্রুত তাঁকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে রাত একটায় তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। ২৩ মার্চ তাঁকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার হয়। পরে তাকে স্থানান্তর করা হয় সিঙ্গাপুরের গে¬ইন ঈগল হাসপাতালে। সেখানে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। ওই অবস্থায় ৩ মার্চ তাঁকে সেখান থকে আবার ঢাকায় ফেরত এনে অ্যাপোলো হাসপাতালে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে রাখা হয়। ৯ এপ্রিল সকাল সাতটায় তাঁর কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসব্যবস্থা খুলে নেওয়া হয়।