সাইফুর রহমান মিরণ

Sept. 7, 2019, 11:12 p.m.

ম্লান হচ্ছে দুর্গাপূজা! সবার মতো করে সবার উৎসব হোক
ম্লান হচ্ছে দুর্গাপূজা! সবার মতো করে সবার উৎসব হোক
অনুরোদ প্রতিবেদন। - ছবি: ভোরের আলো

শিশু থেকে বড় হতে হতে শিখেছি নিজের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রাখো। একই সঙ্গে অন্যের ধর্মকে ঘৃণা করো না। ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে ওঠো। কিন্তু কোন ধর্মকে খাটো করে নয়। তুমি তোমার ধর্ম পালন করো। অন্যকে তার ধর্ম পালন করতে দাও। বড় হয়ে শিখেছি বাংলাদেশ হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে সব ধর্মের মানুষ একজন অন্যজনের সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্নার সঙ্গী। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের উৎসব-পার্বনে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকবে। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু ঘটনা আমাদের দীর্ঘদিনের চেনা পরিচিত রূপে কালো তিলক দিয়ে ঢেকে দিতে চায়। সেটা কখনো সাম্প্রদায়িক উস্কানী, ধর্মে ধর্মে বিভেদ সৃষ্টিসহ নানা উদ্যোগ। বাংলাদেশের মানুষ সেগুলো মোকাবেলা করে আবারো সম্প্রীতি অটুট রাখতে চেষ্টা করে চলে। তারপরও কখনো কখনো সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয় এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকা-ে সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিব্রতবোধ করে।

বাংলাদেশের কথা বলছি এই কারণে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের ধর্মীয়ভাবে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। এর একটি হচ্ছে নির্বাচন কমিশন, অন্য দুটির দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। এই তিনটি কর্মসূচিই হতে যাচ্ছে হিন্দু ধর্মের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজার মধ্যে। যার একটি মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষর সময়সূচি অনুযায়ী ষষ্ঠীর দিন এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয় (বুয়েট)-এর পরীক্ষা সপ্তমীর দিনে। অন্যদিকে রংপুর উপ-নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। 

যারা এই সময়সূচি নির্ধারণ করছেন তারা ধর্মীয় উৎসব সম্পর্কে জানেন না এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। নিঃসন্দেহে তারা বাংলাদেশের ক্যালে-ার দেখেই সময়সূচি করেছেন। কিন্তু তারা ধর্মীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠতে পারেননি। তাই তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসবের মধ্যে পরীক্ষা রেখেছেন। রেখেছেন সংসদ নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। দয়িত্বশীল মন্ত্রণালয় এবং নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে এমন দায়িত্বহীন কর্মকা- আশা করি না। তাহলে কেন এমন হলো? এর জবাব কে দেবে? তারপরও আমরা চাই আমাদের সম্প্রীতি বজায় থাকুক। এই সমস্যার সমাধান হোক। এই সমস্যা সমাধান না হলে আমাদের অনেক অর্জন ম্লান করে দেবে।

বাংলাদেশে প্রায়শই একটা শ্লোগান জোরেসোরে বলতে শোনা যায়, সেটা হচ্ছে ‘ধর্ম যার যার, রাস্ট্র সবার’ আবার ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী আমলারা কথাগুলো বেশি বেশি বলেন। বাস্তবের সঙ্গে এই কথার মিল খুঁজে পাওয়া অনেক সময়ই কষ্টকর হয়ে পড়ে। অনেক সময় মনে হয় লোক দেখানো বুলি আওরান কর্মকর্তা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা। কারণ সব ধর্মের উৎসব সবার জন্য হয়ে ওঠে না। এক ধর্মের উৎসবকে অন্য ধর্মের অনুসারীরা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয় না, নিতে পারে না। তাই উৎসবও সব ধর্মের মানুষের হয়ে ওঠে না। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা কিন্তু নয়। সব ধর্মের কিছু মানুষ আছে যারা ধর্মীয় উৎসবকে সার্বজনীন রূপ দিতে চেষ্টা করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে না।

বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে মোটাদাগে যদি বলি মুসলিম ধর্মের বড় দুটি উৎসব ঈদুল ফিতর এবং ঈদ-উল-আযহা। হিন্দু ধর্মের প্রধান উৎসব দুর্গা পূজা, খ্রিস্টানদের প্রধান উৎসব বড়দিন এবং বৌদ্ধদের প্রধান উৎসব বৌদ্ধ পূর্ণিমা। এর বাইরেও অনেক ধর্মীয় উৎসব রয়েছে। এ ছাড়া ছোট ছোট নৃতাত্তিক গোষ্ঠীর ধর্মীয় উৎসব রয়েছে। তবে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান এবং বৌদ্ধ ধর্মের উৎসবগুলোই বাংলাদেশে ভাবগাম্ভির্যে আয়োজন করা হয়। কিন্তু এসব উৎসবের মধ্যে প্রধান্য পায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ধর্মের দুই প্রধান উৎসব। এরপর সনাতন ধর্মের দুর্গাপূজা। তবে বেশিভাগ ক্ষেত্রে সমানভাবে দৃষ্টি দেওয়া হয় না। একই অবস্থা হয়তো অন্যান্য দেশে। সেখানে মুসলমানরা ধর্মীয় আয়োজন করতে গিয়ে একই সমস্যায় পরেন। কিন্তু সাম্প্রদয়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশে এইধরণের সমস্যায় কোন ধর্মের মানুষ পড়–ক সেটা রাস্ট্র চায় না। এমন বিশ^াস স্থাপন করতে চাই।

দুর্গা পূজার মধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ভর্তি পরীক্ষা এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সেটা কি না বুঝে করেছেন? আমাদের কাছে কিন্তু তা মনে হচ্ছে না। জেনে বুঝেই করেছেন বলে মনে হচ্ছে। ওই কর্তৃপক্ষের হয়তো ধারণা হয়েছে, হিন্দু ধর্মের উৎসব থাকলে এমন কি আসে যায়। ওই ধর্মের অনুসারীদের পরীক্ষার্থীই বা কতজন হবে? যে কজন আছে তারা অবশ্যই ষষ্ঠী কিংবা সপ্তমীর দিনে পূজাম-পে না গিয়ে পরীক্ষার কথা ভাববে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলে আমরা যে গর্ব করি, সেই গর্বের মুখে কালির আচড় ফেলা হলো কি না সেটা ভেবে দেখা দরকার। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার কিংবা ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই শ্লোগান দেওয়ার মুখ কি আমাদের থাকবে? গুরুত্বপূর্ণ দুটি ভর্তি পরীক্ষা এবং একটি উপনির্বাচন এক সপ্তাহ আগে কিংবা পুজার এক সপ্তাহ পরে নিলে কি খুব সমস্যা হবে? যারা এই ক্ষুদ্র চিন্তা না করে স্থূল চিন্তা থেকে পরীক্ষার সুচি নির্ধারণ করেছেন তাদের থেকেও আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার।

আমরা জানি, দেশে দেশে ধর্মীয় উৎসবের প্রাধান্য পায় ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের জীবনাচারের ওপর ভিত্তি করে। যেমন তাদের  শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের ওপর ভিত্তি করে। এক্ষেত্রে সারা পৃথিবীতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা উপেক্ষিত থাকেন ধর্মীয় উৎসব আয়োজন নিয়ে। তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়। বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশেও এমনটা ঘটে থাকে হয়ত। দেশ-দেশান্তরের সব উদাহরণ আমার জানা নেই।

আমরা বলতে চাই, বিশে^র কোন দেশে এই উদাহরণ থাকলেও বাংলাদেশ যেন সেই উদাহরণ সৃষ্টি না করে। কারণ বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণটি যদি আমরা মনে করার চেষ্টা করি তাহলেও এমন অবস্থা হবার কথা নয়। এ ছাড়াও তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততোদিন তিনি বাঙালির একজন হয়েই ছিলেন। সব সময় ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করেছেন। বরং অন্য ধর্মের মানুষ যাতে বেশি সুযোগ পায় সেই লক্ষে কাজ করে গেছেন। তাহলে এখন কেন এমন হবে? আমরা যেন সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে থেকে বাংলাদেশ বিনির্মাণে একসঙ্গে পা ফেলতে পারি সেই পথ সুগম করতে হবে। সেজন্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে আরো একটু নজর দিতে হবে। মেডিকেল ও বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা এবং রংপুর উপনির্বাচনের তারিখ পুননির্ধারণ করে সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হোক।



_সাইফুর রহমান মিরণ