সাইফুর রহমান মিরণ

Sept. 18, 2019, 12:10 a.m.

ছোট উদ্যোগের সঙ্গে থাকতে হবে, বড় পরিবর্তন এনে দেবে
ছোট উদ্যোগের সঙ্গে থাকতে হবে, বড় পরিবর্তন এনে দেবে
সম্পাদকীয় - ছবি: ভোরের আলো

‘অ্যা স্মল অ্যাকশন, বিগ চেঞ্জ’। ছোট উদ্যোগ, বড় পরিবর্তন। সমাজে ছোট ছোট উদ্যোগই বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে পারে। যিনি বা যারা প্রথম এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তাদের নানা ধরণে প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়। যখন ওই উদ্যোগ সমাজে প্রভাব ফেলে তখন এগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। যারা ওই উদ্যোগকে সেদিন নেতিবাচক বলে নানা মন্তব্য করতেন তারাও এসে সামিল হন প্রশংসার বাণী নিয়ে। তাই সকল ইতিবাচক ছোট উদ্যোগের সঙ্গে থাকতে হবে, তাহলে সেই উদ্যোগই সমাজের বড় পরিবর্তন এনে দেবে।

মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে কার্তিক পরামানিক গাছ লাগনো শুরু করেন। তার লাগানো গাছের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বিনামূল্যে এই গাছ লাগিয়েছেন। অনেকেই তাকে পাগল বলেছে, আবার অনেকেই বলেছে, গরিবের ঘোড়া রোগ ধরেছে। আবার অনেকেই তার লাগানো ছোট গাছগুলো কেটে ফেলেছে। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। সামান্য নরসুন্দর পেশার কার্তিক পরামানিক গাছ লাগিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। বৃক্ষহীন ১০-১২ মাইল রাস্তায় গাছ লাগিয়েছেন কার্তিক পরামানিক। কেবল কাছ লাগননি, অন্যরা যাতে গাছ লাগায় তার জন্য উদ্বুদ্ধও করেছেন। গড়ে তুলেছেন নার্সারী। সেখান থেকে বিনামূল্যে গাছ সরবরাহ করছেন। এটাই নাকি তার শান্তি। তাকে এখন বৃক্ষপ্রেমিক উপাধি দেয়া হয়েছে।

কার্তিক পরামানিক বলেছেন, ‘আমি ভাবি গয়া-কাশি গিয়ে যে পুণ্য অর্জন করা যায়। আমি গাছ লাগিয়েই সেই পুণ্য অর্জন করব। একদিন মা আমাকে নিয়ে কাকার বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যান। সেখানে দেখি এক পাকুড় গাছের তলায় বীজ পড়ে গাছ গজিয়েছে। আমি সেই চারা নিয়ে আসি এবং শ্যামপুর গ্রামের তিন মাথার রাস্তার মোড়ে তা লাগাই। সেই থেকেই আমার গাছ লাগানো শুরু। আর আমার প্রথম লাগানো গাছটিই এখন এলাকার একটি বড় পাকুড় গাছ। অনেক কষ্ট করে গাছটিকে বাঁচিয়ে রেখেছি। যার বয়স এখন প্রায় ৬৮ বছর। ওই গাছ লাগানোর পর শুরু হয় জীবন যুদ্ধ। একদিকে নরসুন্দরের পেশা অন্যদিকে কাজের ফাঁকে রাস্তার দুই ধারে, খোলা জায়গায়, বিভিন্ন বাড়িতে, বিডিআর ফাঁড়িতে গাছ লাগানো আমার নেশায় পরিণত হয়। সেসময় অনেকেই আমাকে পাগল বলেছে, আবার অনেকেই বলেছে গরিবের ঘোড়া রোগ ধরেছে। আবার অনেকেই আমার লাগানো ছোট গাছগুলো কেটে ফেলেছে। কিন্তু আমি দমে যায়নি। সেই কেটে ফেলা গাছের স্থলে আবারও লাগিয়েছি নতুন গাছ। সামান্য রোজগারের অর্থ বাঁচিয়ে কিনেছি বাঁশ ও দড়ি। সেগুলো দিয়ে করেছি গাছের পরিচর্যা। মানুষের সব তাচ্ছিল্য তুচ্ছ মনে করে আমি আমার লক্ষ্যে অবিচল থেকে গাছ লাগিয়েই চলেছি। এলাকার ১০ কিলোমিটার  জায়গা আজ গাছে গাছে ছেয়ে গেছে। বেড়েছে পাখ-পাখালির আনাগোনা। এলাকার হিমশীতল পরিবেশ এখন সবাই ভোগ করছে, এটা ভেবেও আমি শান্তি পাচ্ছি।’

আবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিনামূল্যে বই বিতরণ করে বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলা পলান সরকার যখন প্রথম এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তখন তাঁকেও পাগল বলেও আখ্যা দিতে ছাড়েননি অনেকে। কিন্তু বইপ্রেমি পলান সরকার যখন তার পাঠক সংখ্যা বাড়িয়ে তুলে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন তখন তাকে ধন্য ধন্য বলে জয়গান দিয়েছেন। কিন্তু পলান সরকারের সামান্য উদ্যোগ শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক নারী-পুরুষদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে। পরবর্তী সময় যারা শিক্ষা থেকে দূরে ছিল, তারা স্কুলে ভর্তি হয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করেছে। নিরক্ষরতা দূর করতে পলান সরকারের সেই উদ্যোগ আজ বিশ^সভায় স্বীকৃত।

নিজের টাকায় বই কিনে পাঠকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বই পড়ার একটি আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য পলান সরকার ২০১১ সালে একুশে পদক পান। ২০০৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে নিয়ে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপা হয় ‘বিনি পয়সায় বই বিলাই’ শিরোনামে। ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে বিশ্বের ভিন্ন ভাষার প্রধান প্রধান দৈনিকে একযোগে পলান সরকারের বই পড়ার এই আন্দোলনের গল্প ছাপা হয়। উপাধি পেয়েছেন আলোর ফেরিওয়ালা। ৩০ বছর তিনি পায়ে হেঁটে বই বিলিয়েছেন।

আবার রিকশা চালক জয়নালের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। রিকশা চালিয়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা তখন যে শুনেছে সেই তাকে পাগল বলে তিরষ্কার করেছে। আজ যখন তিনি সত্যিই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন, তখনই তাকে ধন্য ধন্য দেওয়া হচ্ছে। 

স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য জয়নাল আবেদিন ঢাকা ২৮ বছর রিকসা চালিয়ে অর্থ জমিয়েছেন। তারপর পৌনে তিন লাখ টাকা নিয়েফিরে আসেন তার গ্রামের বাড়িতে।

২০০১ সালের এক শুক্রবার সকালে গ্রামের মানুষকে ডেকে বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য তার স্বপ্নের মমতাজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা জানান। গ্রামের সবাই তার কথা শুনে হাসাহাসি করেন। এমনকি তার পরিবারও। তখন তার পাশে এসে দাঁড়ান পল্লী চিকিৎক মো. আলী হোসেন। অনেক কষ্টে জমানো টাকায় ২৪ শতক জমি কিনে ২০০১ সালে ছোট একটি আধাপাকা টিনশেড ঘর তৈরি করে জয়নাল আবেদীন মায়ের নামে চালু করলেন মমতাজ হাসপাতালের কার্যক্রম। আজ এই হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৩০ জন রেরাগী চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে।

কার্তিক পরামানিক, পলান সরকার এবং জয়নাল আবেদীনের মতো সারা দেশে অনেক মানুষ আছেন যারা এরকম ছোট ছোট উদ্যোগ নিয়ে সমাজে বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। এখনো অনেক তরুন-যুবকরা এমন উদ্যোগ নিচ্ছেন। কেবল বরিশাল শহরে এই সময়ে ১২টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করছে। যারা নিজেদের টিফিন, রিকশা ভাড়ার খরচ বাঁচিয়ে গাছ লাগানো, বইপড়া, দরিদ্রদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া, স্বাবলম্বী করে তুলতে রিকশা, সেলাই মেশিন দিচ্ছে। এমনকি নগর পরিচ্ছন্নতাসহ নানা উদ্যোগ নিয়ে চলেছে। তাদের অনেককেই নানা রকম নেতিবাচক কথা শুনে শুনে ওইসব উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। আমরা যারা নেতিবাচক কথা বলি, তারা কি একবারও ভেবে দেখেছি এই তরুন ও যুবকরা ভালো কাজের সঙ্গে না থেকে যদি মাদক, জঙ্গি তৎপরতাসহ সমাজ বিধ্বংসী কাজের সঙ্গে যুক্ত হতো, তাহলে কি ভালো হতো? অবশ্যই না। তাই এইসব তরুন ও যুবকদের সকল ইতিবাচক কাজের সঙ্গে থেকে ওদের উৎসাহ দিতে হবে। তাহলে ওদের এই ছোট ছোট উদ্যোগই একদিন কার্তিক পরামানিক, পলান সরকার এবং জয়নাল আবেদীনের মতো নতুন নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করবে।