শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী ২০২২, ৮ মাঘ ১৪২৮

অনলাইন ডেস্ক

Jan. 10, 2022, 10:45 p.m.

শিশুর ক্ষতির কারণ হতে পারে প্লাস্টিক
শিশুর ক্ষতির কারণ হতে পারে প্লাস্টিক
সংগৃহীত। - ছবি:

নতুন নতুন রঙবেরঙের খেলনার প্রতি শিশুদের থাকে অন্যরকম আকর্ষণ। আর তাদের মানসিক বিকাশ কিংবা চিত্ত বিনোদনের বড় অনুষঙ্গও এসব খেলনা। তবে এই খেলনাই হতে পারে ক্ষতির কারণ। গবেষকরা বলছেন, শিশুরা স্বভাবসুলভভাবেই হাতের কাছে যা পায় তাই মুখে দিয়ে ফেলে, এমনকি খেলনাও। আর শিশুদের জন্য তৈরি এসব খেলনা বেশিরভাগই প্লাস্টিকের
 তৈরি। আর এগুলো ফুডগ্রেড তো নয়ই, বরং থাকে ক্ষতিকর পদার্থ; অনেক দেশেই গবেষণায় এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের শারীরের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে এই প্লাস্টিকের খেলনা।

সায়েন্স এলার্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের মলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সম্প্রতি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে গড়ে এক বছর বয়সী ছয় শতাংশ শিশুর মলে ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির চেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাওয়া গেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্লাস্টিকের তৈরি চুষনি চোষা ও পাত্রে খাদ্যগ্রহণ, প্লাস্টিকের খেলনা মুখে দেওয়ায় প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুরা প্লাস্টিকের সান্নিধ্যে বেশি আসে।

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির শিশু বিশেষজ্ঞ কুরুনথাচালাম কান্নানের নেতৃত্বাধীন গবেষণা দলটি মানবদেহের সংস্পর্শে আসা দুই ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক মূল্যায়নে আগ্রহী ছিলেন। এদের একটি পলিথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি), যা খাবার প্যাকেটজাত ও পোশাক তৈরিতে ব্যবহার করা হয় এবং অন্যটি খেলনা ও বোতলে ব্যবহৃত পলিকার্বনেট (পিসি)।

গবেষকরা জানান, প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুদের মলে পলিথিলিন টেরেফথালেট উল্লেখযোগ্য হারে বেশি ছিল। অবশ্য তাদের মলে পলিকার্বনেট মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য ছিল না। গবেষকরা আরও জানান, প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে এক বছর বয়সী শিশুদের মলে পলিথিলিন টেরেফথালেটের উপস্থিতি গড়ে ১০ গুণের বেশি ছিল।

প্লাস্টিকের-খেলনা: গত বছর জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক প্রোগ্রাম (ইউএনইপি) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে উল্লেখ করা হয় শিশুদের ২৫ শতাংশ খেলনায় ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহার করা হয়। একদল গবেষক প্লাস্টিকের প্রোডাক্টগুলোতে উপস্থিত রাসায়নিক পদার্থ কীভাবে শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে তা নিয়ে গবেষণা করেন। গবেষকরা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের একটি তালিকা তৈরি করেন। তালিকাভুক্ত বিষাক্ত পদার্থগুলোর মধ্যে ১০০টিরও বেশি রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে; যা শিশুদের প্লাস্টিকের খেলনাগুলোতে উপস্থিত।

ডেনমার্ক টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির প্রধান গবেষক পিটার ফ্যান্টকে গবেষণার বরাত দিয়ে বলেন, ৬১৩টি প্রাপ্ত ইউনিক রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে ৪১৯টি ভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যা শিশুদের খেলনা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এর মাঝে এমন ১২৬টি রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, যা শিশু স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ক্ষতিকর ১২৬টি উপাদানের মধ্যে ৩১টি প্লাস্টিসাইজার, ১৮টি শিখা প্রতিরোধী এবং সাতটি সুগন্ধযুক্ত উপাদান রয়েছে।

খেলনা: গবেষকরা জানান, বেশিরভাগ প্লাস্টিকের তৈরি খেলনায় কী কী ব্যবহৃত হয়, তা উল্লেখ থাকে না। যার কারণে শিশুদের বাবা-মা জানেন না ক্ষতিকর কিনা। গবেষকরা পরামর্শ হিসেবে জানান, বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের বিকল্প পদার্থ শিশুদের খেলনা তৈরিতে ব্যবহার করা উচিত, যাতে শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে। এছাড়া শিশুদের ঘরে পর্যাপ্ত ভ্যান্টিলেশনের কথাও তারা উল্লেখ করেন, যাতে খেলনায় ব্যবহৃত কেমিক্যাল থেকে শিশুদের ক্ষতি না হয়।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. সফি আহমেদ বলেন, প্লাস্টিকেরখেলনা থেকে ছোট শিশুদের জিহ্বায় ঘা হয়ে যায়, ফাঙ্গাল ইনফেকশন হয়। খেলনা থেকে ময়লা মুখে গেলে পেটে পীড়া, ডায়রিয়া হতে পারে। প্লাস্টিক বেশি সময় মুখে থাকলে দাঁতেরও ক্ষতি হতে পারে। আবার প্লাস্টিক বেশি দিন গ্রহণ করলে কিডনি কিংবা লিভারে সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ফিডারে খাওয়ানো হয়, এটি একেবারে ভালো জিনিস না। ফিডার থেকে মুখে ঘা হয়, সামনের রাবারটার (নিপল) জন্য। পেটের জন্য খারাপ, কারণ ফিডারে খাবার খাওয়ার সময় পেটে বাতাস ঢুকে যায়। এজন্য আমরা ফিডার ব্যবহার নিরুৎসাহী করি এখন। আমরা বলি চামচ-বাটি ব্যবহার করে খাওয়ানোর জন্য।

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, প্লাস্টিক আর পলিথিন কিন্তু একই জিনিস। পলিথিনের মধ্যে কিন্তু প্লাস্টিক যুক্ত থাকে। যেসব খেলনা শিশুরা মুখে ব্যবহার করে সেগুলো প্লাস্টিক ছাড়া হয় না। করতে হলে ফুডগ্রেড প্লাস্টিক হতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশের খেলনা তৈরির সময় এই বিষয়টি মাথায় রাখা হয় না। এটি নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন শিশুরা মুখে নিতে থাকলে এটা তাদের বিপাক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। এটি এভাবে চলতে থাকলে ক্যানসারের মতো পর্যায়ে যেতে পারে।