রবিবার, ০২ অক্টোবার ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

আজমল হোসেন লাবু

Aug. 29, 2022, 11:46 p.m.

সকল সুন্দরগুলো কেন সত্য হয় না
সকল সুন্দরগুলো কেন সত্য হয় না
খবর প্রতীকী। - ছবি: ছবি: ভোরের আলো ডিজাইন

সত্য চিরদিনই কঠিন। তবে তার থেকেও কঠিন তার যথার্থ উপস্থাপন। সত্য উপস্থাপন যদি সুন্দর না হয় তা হলে বিপত্তির আর শেষ থাকে না। এমন উদাহরণগুলো প্রতিদিন তার স্থান সম্প্রসারিত করেই চলেছে। যদি আমরা ভুলে যেয়ে না থাকি, বেশ কিছুদিন আগের সে কথা। তবে খুব যে বেশী দিন আগের তাও কিন্তু নয়। বিএনপি জোটের এক সময়কার স¦রাষ্ট্র মন্ত্রী সাবেক আকাশ বাহীনির প্রধান আলতাফ হোসেন চৌধুরীর সেই কথা? ‘আল্লার মাল আল্লায় নিয়া গেছে’। মনে পড়ে? কি অসাধারণ সত্য ছিলো সেই কথা। এখনো মানুষ অনবরত এই কথাই কিন্তু বলে মৃতের স্বজনদের সান্তনায়। এ কথা শোনা যায় সাধারণের মুখে। কিন্তু যারা অসাধারণ, রাজনৈতিক কিংবা মন্ত্রী মর্যাদার? তাদের মুখে এমন উপস্থাপন কখনোই শোভন নয়, সুন্দরতো নয়ই। তবু এই ভুলই হয়। নিশ্চয়ই মনে আছে আমাদের সেই সময়কার নৌমন্ত্রী মেজর আকবর হোসেনের কথা? এক নৌ দুর্ঘটনার পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন। ‘লঞ্চ ডুবছে তো আমি সেখানে গিয়ে কি করবো? আমি গেলে কি লঞ্চ ভেসে উঠবে? বলছিতো মৃতদের সবার নামে একটা করে ছাগল দিয়ে দেবো’। ছাগল হয়তো তিনি দিয়েছিলেন, সে সত্য। কিন্তু যেভাবে তিনি বলেছেন সেই উপস্থাপন কি সুন্দর হয়েছিলো? এ ভাবে কি বলা যায়? তখনো ভাইরাল শব্দটি এতোটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। হলে কি হতো সে বোধ করি আল্লাই ভালো জনেন।

ঠিক একই ভাবে বিগত আওয়ামী সরকারের অত্যন্ত সুশিক্ষীত ভদ্রজন অর্থ মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সেই উচ্চারণ ‘রাবিশ’ তারপর হাসতে হাসতে শরীর ঝাঁকিয়ে বলা সেই কথা ‘চারি দিকে যা দেখছি তাতে চারশো কোটি ঠাকা চুরি তেমন কিছুই নয়’। এটাও নিশ্চয়ই মনে আছে আমাদের, শেয়ার বাজারের বিপর্যয়ে মানুষ যখন একেবারেই দিশেহারা তখন তার মন্তব্য ছিলো ‘এটা একটা ফটকা বাজার তার আবার নিয়ন্ত্রণ কি?’ সব শেষ  মন্ত্রীত্বের মেয়াদ শেষ করে নিজ দপ্তরে বিদায়ী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এবার যাই ঝাটা পেটা খাওয়ার আগে চলে যাওয়াই ভালো।’ তার প্রত্যেকটি কথায় শিক্ষার সততা ছিলো, ব্যক্তিত্বের সারল্য ছিলো। কেবল ছিলো না রাজনৈতিকতার কুট চাল এবং কথা বলবার সৌন্দর্য। যা না থাকলেই ঘটে বিপত্তি, হয়ে যান ভাইরাল।

যেমনটা মাত্র হলেন বর্তমান বিদেশ মন্ত্রী আবুল কালাম আবদুল মোমেন। যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয় বুঝাতে যেয়ে বলেছিলেন ‘আরে আমরাতো বেহেশতে আছি।’ এ কথার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় যা বললেন তাকে ভাইরাল বললে ভাইরাল শব্দও লজ্জিত হবে। এমন একজন সহজ সরল চিন্তা ভাবনার  মানুষ আমাদের বৈদেশীক কুটনীতির প্রধান? যদিও সে যা বলেছে, এমন রুঢ় বাস্তব সত্য আর হয় না। তবে বলাটা একেবারেই সুন্দর হয় নাই। একেবারেই রাজনৈতিক হয় নাই। একেবারেই বুদ্ধিদীপ্ত হয় নাই। তার এমন সত্য উচ্চারণে অপদস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। অপ্রস্তুত এবং লজ্জিত করেছে, যাদের সম্বন্ধে বলেছে তাদেরকেও।

আসলে সকল ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমটুকু বাদ দিলে। পূঁথিগত শিক্ষিতজন বা শিক্ষার বড় দোষ তারা কখনোই শিক্ষার নির্দিষ্ট রুপরেখার বাইরে, ফেক বা আরোপিত পথে চলতেই পারে না। পক্ষান্তরে প্রায় সকল রাজনীতিবিদদেরই বড় গুণ তারা তাদের পূঁথিগত শিক্ষার অভাবকে রাজনৈতিক শিক্ষাদ্বারা সমৃদ্ধ করে নেয়। যেটা কখনোই সুশিক্ষিত মানুষেরা পেরে ওঠেন না। তবু শিক্ষিত মানুষদের সকল ভলো কাজ নিরুপায় গ্রহণ করে রাজনীতি, দেশ, দল। কিন্তু তারা যখনই রাজনৈতিক কথা বলতে যেয়ে একটু সমালোচিত বা বিপর্যস্ত হন অমনি মুখ ঘুরিয়ে নেন সকলে। কেউ থাকে না পাশে। না রাজনীতি, দেশ, দল, কেউ না!

আবার আছে এর উল্টোটাও। ঠিক একইভাবে বকলম রাজনীতিবিদরা যখন সুশিক্ষিত সাজবার চেষ্টা করেন সেখানেও ঘটে দারুন বিপত্তি। নিশ্চয়ই আমাদের মনে পড়বে চারদলীয় জোটের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কথা? তার বাংলিশ কথাগুলো এক সময় দরুন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো মানুষের মুখে মুখে। তাকে কোন প্রশ্ন করলেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসতো ‘থামুন, অপেক্ষা করুন। উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’।

আসলে আমরা যা নই, প্রায় সবাই তা হবার কিংবা পাবার জন্য আক্ষেপ করি। বাস্তবে সবার কিংবা করোর পক্ষেই কি তা সম্ভব? আকাশে কি গাছ লাগানো যাবে? সাগর মাঝে কি জন্মাবে ঘাস? তবু অপার চেষ্টা সবার অযথা জ্ঞানী কিংবা বোকা সাজবার। তেমনই কোন ভুল কি করলেন বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রী? তিনি বলেছেন কিন্তু এক দারুন সত্য। শুধু ব্যার্থ হয়েছেন সেইটুকুন রাজনীতির ভাষায় সুন্দর উপস্থাপনে। আসলে পৃথিবীব্যাপি এখন কৃত্রিম সুন্দরের আরাধনা যতটা সম্প্রসারিত হচ্ছে, সঠিক সত্যের তেমনটা নয়! তবে কি সত্যহীন সুন্দরই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা? তা হলে সেই সুন্দর যখন স্বচ্ছ পানির মুখোমুখি হবে তখন কি আসল রুপের উন্মেষ ঘটে যাবে না? রঙ মেখে সঙ সেজে কতদূর যাওয়া যাবে? তাহলে কেন বলবো না, সত্যাশ্রয়ী সুন্দর বিস্তারিত হোক। বিনাস ঘটুক কৃত্রিম সুন্দরাশ্রয়ী সত্যের। জানি আমরা সবাই, রাজনীতির প্রজ্ঞার কাছে সবথেকে কঠিন কর্ম হচ্ছে, পূঁথিগত শিক্ষার কাছে নতজানু হওয়া। আর যথার্থ শিক্ষার বা শিক্ষিতজনের কাছেও সহজ নয় মেনে নেওয়া অশিক্ষার নির্দেশ। অথচ এ দুয়ের সমন্বয় ছাড়া সম্ভব কি মানব সম্পদের উন্নয়ন? কোন রাষ্ট্রের মানব সম্পদ উন্নত না হলে, অন্য আর কোন উন্নয়ন শব্দের মানসম্মত কোন অর্থ হয় কি?

লেখক: আজমলা হোসেন লাবু, বাচিক শিল্পী ও বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতিম-লীর সদস্য।