রবিবার, ০২ অক্টোবার ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

উম্মে হাবিবা ঊর্মি

Sept. 20, 2022, 9:53 p.m.

মরণের হাত ধরে স্বপ্ন ছাড়া কে বাঁচিতে পারে?
মরণের হাত ধরে স্বপ্ন ছাড়া কে বাঁচিতে পারে?
উম্মে হাবিবা ঊমি ॥ - ছবি:

জীবনানন্দ দাশ  স্বপ্নের ভেতর দিয়েই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। তাইতো মৃত্যুর পরে সেই ধুলোভরা ট্রাঙ্ক থেকে একটার পর একটা স্বপ্ন বেড়িয়ে এসেছিল ধূসর রঙ নিয়ে যা আজ সবচেয়ে বেশি রঙিন হয়ে আছে পাঠকের মনে। আজ নিঃসন্দেহে তিনি তাঁর স্বপ্নের চেয়েও বড়!

লিখতে চাচ্ছি এই স্বপ্ন দেখার অভিজ্ঞতাসহ বাস্তবতা থেকে। দীর্ঘদিন থেকেই বিষয়টি মনের ভেতর নীরবে ওঁৎ পেতে ছিল। জয়ের আনন্দের বিহ্বলতা চিরন্তন সত্য। সুতরাং সেই সত্যেরই প্রকাশমাত্র।

শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের সাথে যোগাযোগের অন্যতম একটি মাধ্যম হলো বিদ্যালয় পরিদর্শন। আমি ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শনকে কেবল চাকরিবিধি হিসেবেই দেখি না, নিজের অসম্ভব ভালো লাগার সময়  হিসেবে দেখি। যার মূল কারণ বিদ্যালয়ের সেই ছোট্ট ছোট্ট নিষ্পাপ মুখগুলো! ওদের মুখোমুখি হলে ফিরে আসা একটু কঠিন হয়ে যায় আমার নিজের জন্য। বিভিন্ন কথা কৌশলে ওদের বুঝতে চেষ্টা করি ওদের মতো করে। এক একজন শিক্ষার্থী যেন এক একটা জীবন্ত উপন্যাস! কী ভাষা-কথা তাদের! কখনো আনন্দে ভাসি আবার কখনো নীরব সত্য মিথ্যের গোলকধাঁধায় নিজের কাছে উদ্ভুত অনেক প্রশ্ন, হতাশা নিয়ে ফিরে আসি!

তো এবার আসি মূল প্রসঙ্গে দীর্ঘদিনের বিদ্যালয় পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি  শিক্ষার্থীদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তারা বড় হয়ে কে কি হতে চায়, প্রায় সবক্ষেত্রেই উত্তর আসে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট, শিক্ষক, পুলিশ। কালেভদ্রে কখনো কখনো এর বাইরে দু একটা নতুন কিছু শোনার সৌভাগ্য হলেও তার সংখ্যাগত অনুপাত প্রকাশ করা দুষ্কর। যখন রীতিমত একটু চাপিয়ে দিয়েই  জানতে চাওয়া হয় ‘এর বাইরে আর কি কিছুই কেউ হতে চাও না?’ তখন হয়তো নতুন দু একটা শব্দ বেরিয়ে আসে। তাও সেটা আমাকে একেবারে নিরাশ না করার উত্তর কিনা জানিনা। মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ উত্তর-ই ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তাও একজন বললে বাকিরা এটাই সূত্র হিসেবে ধরে নিয়ে একই ফলাফল মিলিয়ে দেয়! প্রশ্ন হলো, এই যে সীমাবদ্ধতা সেটা কি শুধু-ই তাঁদের  জানার সীমাবদ্ধতা? নাকি সেই সীমাবদ্ধতার অদৃশ্য রেখা দিনের পর দিন তাদের মস্তিষ্কে আমি-আপনি- আপনারা-তাঁরা বপন করে দিচ্ছি? দীর্ঘদিনের চাকরীর অভিজ্ঞতায় কোনোদিন কোনো মেয়েকে বলতে শুনিনি সে একজন ক্রিকেটার কিংবা একজন ফুটবলার হতে চায়!

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফুটবল টুর্নামেন্টে মেয়েদের  অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আছে নানা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা, যা প্রায়শই শিক্ষকদের কাছে শুনে থাকি! প্রতিযোগিতায় মেয়েদের অংশগ্রহণ না করতে দেয়ার প্রচারণায় নামতে দেখা যায় এক শ্রেণির মহাজনদের (পারলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে)। এ বিষয়ে তাঁকে বোঝাতে বা বলতে গেলে খুব সহজে জুটে যায় কিছু সস্তা তকমা। উল্টো তিনি বা তাঁরা  হয়ে যান তখন আরও বড় মহাজন। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত পবিত্র প্রতিষ্ঠানেও এইসব বিষয়ে নিরুৎসাহিত করার আওয়াজ শোনা যায়। এই বলয়কে ভেদ করে যেকজন এগোয় তারা জানে এই সমাজের কত বিষবাক্য তাঁদের অজানা ছিল!

এটাতো মাত্র একটা ক্ষেত্রের উদাহরণ। এরকম হাজারও উদাহরণ রোজ জন্ম নিচ্ছে। যার কোনো জন্মনিরোধক আবিস্কার হচ্ছে না। কিংবা নিয়ন্ত্রণের আগেই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এই যে একটু একটু করে সব বেঁধে দেয়ার সংস্কৃতি তৈরি  হচ্ছে এই আবদ্ধতাই কি চিন্তাকে আবদ্ধ করে দিচ্ছে না? আজ পৃথিবী মানচিত্রের এক প্রান্তের শিশুমন যখন নাসার ৪৬০ কোটি বছর আগের গ্যালাক্সির ছবি দেখে বিজ্ঞানী হবার স্বপ্ন দেখছে তখন আমরা অপরপ্রান্তে একদল পড়ে আছি শিশুমনে পোশাকের  দৈর্ঘ্য প্রস্থ বোঝানোর দায়িত্ব নিয়ে। জগতের এত এত বিষয় থাকতে প্ল্যাকার্ড, ব্যানার পোস্টার নিয়ে একবিন্দু পানিকে সমুদ্র বানিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে। পাঠ্যবইয়ের দুর্বোধ্য/অজানা  শব্দ  গুগল কিংবা ডিকশনারিতে সার্চ বক্সে যাওয়ার আগেই সেখানে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ‘সিডিউস’ শব্দ স্থান পায়। যে কোনো ধর্মীয় উৎসব হোক আর বাঙালির শেকড়ের উৎসব হোক, উৎসব উৎসবে পরিণত হবার আগেই শুরু হয়ে যায় এর পক্ষে বিপক্ষে রচনা প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় নম্বর প্রদানে শুরু হয়ে যায় লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের আর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সঠিক তথ্য কিংবা যুক্তি না জেনেই স্রোতে ততক্ষণে গা ভেসে যায় অনেকদূর! আর এভাবেই একটু একটু করে সেই স্রোতের হাওয়াই গিয়ে লাগছে আমাদের এই কোমলমতি শিশুদের মনের দুয়ারে! আত্মবিশ্বাসী হওয়ার বদলে সেখানে জন্ম নেয় দ্বিধার। সংকোচ, ভয়, অনীহা ততদিনে জীবনের অলিতে গলিতে বাসা বেঁধে নেয়!

শেষ করি এবার তবে। কথা বলা বা লেখা আজকাল সবচেয়ে কঠিন একটি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল কথা বলতে গেলেই খোঁড়া যুক্তি সুপারসনিক গতিতে স্বাগত জানাতে চলে আসে। তবুও বলতে চাই এভাবে শিশুর চিন্তার জগৎ অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার ফলাফল কখনোই সুখকর হতে পারে না। ভবিষ্যতে এরাই হয়তো ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ না লিখে কিংবা মূল্যায়নের খাতায় সঠিক উত্তর না লিখে ফেসবুকের খাতায় উস্কানী পোস্টের কমেন্ট বক্সে ঝড় তুলবে। নানাভঙ্গিতে, সংগীতে অপরকে ছোট করে টিকটকে আর ইউটিউবে জনপ্রিয় হবে। এক সময় আবার এরাই হয়ে উঠবে সেলিব্রিটি!

শুরুর সাথে শেষ করা প্রাসঙ্গিক। তাই আবার ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে। তো এই যে আজ বাংলাদেশের জন্য এত বড় অর্জন এটা নিয়ে ঐশীবাণী হবে না? কালো দৈর্ঘ্যর কাপড়ে ঢেকে দিবেন না? জয়ের আনন্দে জয়ী হবার বদলে এখানেও হয়তো সিডিউসের গন্ধ পাবেন এদেশের বিপ্লবী ফেবসবুকার আর ইউটিউবাররা। বাদ থাকবেন না সেসকল মহাজনেরাও যারা বাড়ি বাড়ি গিয়েও রুখে দিয়েছিলেন স্বপ্নকে। সেই সকল মহাজনদের  উদ্দেশ্যে বলছি, যদি একান্তই ফেসবুকে, ইউটিউবে নাই দেখতে পারেন তবে টেলিভিশন আর পত্রিকায় চোখ রাখতে পারেন। মেনে নিতে পারছেন তো? এই আপনাদের জন্যই আমাদের বিদ্যালয়ের শিশুরা আজ নিজের স্বপ্ন নিজে দেখতে জানে না। তাঁদের ইচ্ছে, স্বপ্নকেও আপনারা প্রতিনিয়ত কালো কাপড়ে মুড়ে দিয়ে নিজের ইচ্ছেকে হয়তো সহজে প্রতিষ্ঠা করছেন। তবে মনে রাখবেন একদিন হয়তো এই স্বপ্নের সীমাবদ্ধতাই আপনার জীবন চলার সীমাবদ্ধতার রেখা এঁকে দেবে খুব গোপনে। তাই সময় থাকতে স্বপ্নের দুয়ারে কপাট দেয়া বন্ধ করুন। ছবির স্বপ্নকুমারীদের হাত ধরে এরকম বড় অর্জন বর্ণ, গোত্র, ধর্ম, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে আপনার আমার সবার হোক। ধূসর পান্ডুলিপিরা রঙিন হয়ে উঠুক হাজার বছর ধরে। মানুষ তাঁর নিজ স্বপ্নে বেঁচে থাকুক অনন্তকাল.....