মঙ্গলবার, ০৪ আগষ্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

Feb. 20, 2020, 9:59 p.m.

একুশ আমাদের চেতনার অগ্নি মশাল
একুশ আমাদের চেতনার অগ্নি মশাল
অমর একুশ - ছবি: ভোরের আলো

‘ওরা এদেশের নয়, দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়, ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি, একুশে ফেব্রুয়ারি, একুশে ফেব্রুয়ারি।’ ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাগের পর প্রথম আঘাত আসে আমাদের ভাষার ওপর। ১৯৮৪ সালে ধর্মভিত্তিক দেশ পাকিস্তানের ঘোষণা ঊর্দ্যুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাস্ট্রভাষা। তখনই বাঙালি প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চেতনার বহ্নি শিখা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে রাস্তায়। শুরু হয় ভাষার মর্যাদা রক্ষার তীব্র আন্দোলন। সেই আন্দোনের পথ ধরে আসে একুশ। যে একুশ মায়ের মুখের বাংলা বোলকে ফিরিয়ে দিয়েছে। তাই একুশ আমাদের চেতনার অগ্নি মশাল হয়ে পথ দেখাচ্ছে। যে পথ ধরে আমরা ৬৬, ৬৮, ৬৯ এবং একত্তরের মুক্তি সংগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছি। কেবল পৌঁছাইনি, আমরা স্বাধীন মানচিত্র পেয়েছি। পেয়েছি লাল-সবুজের পতকা। তাই একুশ আমাদের গর্ব ও অহংকারের মূর্ত প্রতীক।

ফেব্রুয়ারি মাস নানা কারণে আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। তাই ফেব্রুয়ারি মাসটি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋতুরাজ বসন্ত বর্ণিল হয়ে ওঠে ফেব্রুয়ারি মাসে। ১৯৫২ সালের ভাষা সংগ্রামের চূড়ান্ত অর্জন হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি আমাদের আন্তর্জতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দিয়েছে। একুশের এই ভাষা সংগ্রামে যারা অগ্রণী ভূমিকা রেখে শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। একই সঙ্গে যারা ভাষা সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের প্রতিও আমাদের কৃতজ্ঞতা।

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। একুশ আমাদের মায়ের মুখের মা ডাক ফিরিয়ে দিয়েছে। তাই মা আর একুশ এক ও অভিন্ন সত্তা। বাংলা ভাষা অর্জনে আমাদের রয়েছে অমিত ত্যাগ। ভাষা সংগ্রাম কিংবা ভাষা আন্দোলনের কথা বলতে গেলে আমাদের যেমন শহীদ, ছালাম, বরকত জব্বারের নাম স্মরণ করতে হয়। তেমনি ভাষা আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে যারা কাজ করেছেন তাঁদেরও স্মরণ করা দরকার। তাঁদের মধ্যে অন্যমত হচ্ছেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁর ভূমিকা অবিষ্মরণীয়। ভাষা সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের প্রতি যেমন শ্রদ্ধা নিবেদন করি, তেমনি জাতির পিতার প্রতিও আমাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান।

একুশ আমাদের মাথা নত না করার দৃঢ়তা দিয়েছে। ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালির বাইরে খুব একটা নেই। ৫২’র ভাষা আন্দালন আমাদের ৬৬, ৬৮, ৬৯ এবং ৭১ এর মুক্তি সংগ্রামের পথে এগিয়ে নিয়ে এসেছে। সেই পথ ধরেই আজ আমরা উন্নত দেশের সারিতে উঠে আসছি। পৃথিবীর বুকে আজ বাংলাদেশ একটি উজ্জল নক্ষত্রের নাম। কেবল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...’। এই গান আমাদের বিশ্বের দরবারে আর একবার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে। তাই তো আমরা বলি, মাতৃভাষার হয়েছে জয়, একুশ সারা বিশ্বময়। বিশ্বের ১৮৮টি দেশে একযোগে গেয়ে ওঠে আমাদের ভাষার অপার সৃষ্টি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’। যে গানের লেখক আবদুর গাফফার চৌধুরী এবং যার প্রথম সুরকার আবদুল লতিফ এবং পরে শহীদ আলতাফ মাহমুদ নতুন করে সুর দেন। যে সুর আজ সারা দুনিয়ার মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে।

না আমরা মায়ের ভাষা ভুলতে পারি না। তবে কখনো কখনো অশুভ শক্তি মায়ের ভাষাকে ভোলাতে মায়াজ্বাল ছড়ায়। আমরা সেই জাল ছিন্ন করে ময়ের মর্যাদা রাখবোই। একুশ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের উজ্জ্বল-প্রোজ্জ্বল এক অচিন্তিত পূর্ব কালান্তরের সূচনা করেছে। একুশ আমদের বাঙালি হিসেবে এবং অসাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

আমরা চাই, কোন অশুভ শক্তি যেন আমাদের বাংলা ভাষার ওপর নতুন করে থাবা বিস্তার করতে না পারে। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় বাংলা ও বাঙালি এক ও অভিন্ন নাম। আমরা যেন, মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে একুশকে লালন করি। কেবল ফেব্রুয়ারি মাস নয়, সারা বছর বাংলা ভাষা নিয়ে চর্চা হোক। আমাদের ইংরেজি মিডিয়াম ও ভার্সন স্কুলগুলো যেভাবে বাংলা ভাষাকে দূরে ঠেলে দিতে চাইছে, সেখান থেকে উত্তোরণের পথ খুঁজতে হবে। জানার জন্য এবং বিশ্ব দরবারে প্রতিযোগিতার জন্য কেবল ইংরেজি নয়, যে কোন ভাষার প্রতি দখল নিতে পারি। কিন্তু মায়ের ভাষাকে ভুলিয়ে দিয়ে অন্য ভাষার চর্চা কোনভাবেই কাম্য না। এটা আমাদের কোনভাবেই সমৃদ্ধ করবে না। আমাদের সন্তানরা যেন বাংলাকে ভুলে না যায়। সেদিক বাবা-মাকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারেরও এব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলন কেবল মুখে নয়, কার্যকরী করতে উদ্যোগ নিতে হবে।