শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বার ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

আজমল হোসেন লাবু

Nov. 3, 2022, 10:13 p.m.

কেমন করে ভাগ হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু উদ্যান!
কেমন করে ভাগ হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু উদ্যান!
ভোরের আলো - ছবি:

আর সকলই ভাগ হয়ে গেছে বিলকুল ভাগ হয়নিকো নজরুল। এ সত্য, নজরুল নিজে নিজেকে ভাগ করেননি। ভাগ করেছে তাকে স্বার্থের প্রয়োজনে মানুষ। এবং তারা সবাই ধর্মান্ধ। যে কারণে তারা অনেক শব্দকে কেটে সংশোধন করে নিয়েছে নিজেদের সুবিধামতো। সুযোগ বুঝে কেউ বলেছে ও যবন, কারো মনে হয়েছে নজরুল কাফের। সেই মানুষেরা কেউ বেঁচে নেই। আজও যারা করছেন এমন কাজ তারাও কেউ বেঁচে থাকবেন না। কিন্তু নজরুল আজও বেঁচে আছেন ওই অসভ্যদের শিক্ষা দেবার জন্য। তবে মুশকিল হলো অসভ্যরা তো কোনদিনই কিছু শিখবেন না, সভ্য হয়ে যাওয়ার ভয়ে। 

এ ভয় অতিক্রম সহজ নয়। যার প্রমাণ বাঙালির, বাংলাদেশের রাজনৈতিক হিংসাত্মক অভিযাত্রা। যে কারণে রক্ত, হত্যা ,আগুন, দখল, অবিশ্বাস অধিকারহীনতার অস্তিত্ব আমাদের মুক্ত রাখতে পারছে না। অদূর ভবিষ্যতেও যে, তেমন হবে না সে বিশ্বাস রাখাও অসম্ভব। তবু মানুষকে আশা করতে হয়। হয়তো সে আশাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। যদিও জানে সবাই মৃত্যু নির্ধারিত অপবির্তন যোগ্য। আশা নামক কোন কিছুরই সেখানে প্রবেশ নিষেধ। মূলত পরশ্রীকাতরতা, ক্ষোভ, লোভ, চেয়ারের অনন্ত প্রত্যাশা ধীরে ধীরে মানুষকে খুনি করে তোলে।

তেসোরা নভেম্বরে জেল অভ্যন্তরে হত্যাযজ্ঞের রূপকার শারমীয় কিংবা বরাহ নন্দন মোস্তাক গংরা কি নয়? বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উচ্চারণ উপস্থাপনের পর ক্ষুব্ধ কি হয়নি পাকিস্তান? নির্বাচনের ব্যাপক বিজয়ের পরেও কি ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত হয়েছিলো পাকিস্তান? না হয়নি। বঙালিকে স্বাধীকারের যুদ্ধেই আবতীর্ণ হতে হয়েছিল। ছিনিয়ে আনতে হয়েছিল স্বাধীনতার পতাকা। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ আর অজ¯্র নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে। জাতির পিতাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে। তার পরেও থামানো যায়নি স্বাধীনতার যুদ্ধ। মেহের পুরের বৈদ্যনাথ তলায় প্রতিষ্ঠিত অস্থায়ী সরকারের সুচারু নেতৃত্বে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাঙালি আর্জন করেছিল স্বাধীনতা। পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি করেছিল একটি বাংলা নামক এই স্বাধীন দেশ।

তার পরের ইতিহাস ভুলের, লজ্জার, বেঈমানির, ছলনার, বোকামির আর চক্রান্তের। যার পরিনাম ৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বরের উদিত বিজয়ের সূর্য মাত্র পাঁচ বছরেই অস্তমিত হলো ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫-এ এসে। স্বপরিবারে হত্যা করা হলো স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে। এখানেই থেমে যায়নি নৃশংস ঘাতক দল। তারা জানতো বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানেও যারা দেশের স্বধীনতা অর্জনের হাল ছাড়েনি। স্বধীনতা পরবর্তী দেশে বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই যারা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল কিংবা করা হয়েছিল। সেই চার নেতা তখন কারগারে গ্রেপ্তার। ঘাতকরা ঠিকই জানতো, জানতো শারমীয় শয়তান বরাহ নন্দন খন্দকার মোস্তাক। এই চার নেতা বেঁচে থাকলে পূণরায় নির্মিত, সংগঠিত হয়ে যাবে অসম্প্রদায়িক এই বাংলাদেশ। 

মাথায় টুপি আর শেরওযানী পরা মোস্তাক তাই অত্যান্ত সুকৌশলে তাদের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে। নিঃসন্দেহে সে কৌশলে বাঁধা পরতে বাধ্য হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুও। বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি থাকতেও ব্যর্থ হতে বাধ্য হয়েছিলো নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যপ্টেন মনসুর আলী এবং এ.এইস.এম.কামারুজ্জামান। ইতিহাস তা-ই সাক্ষ্য দেয়। পরিনাম ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। ইতিহাসের এই পথের যথার্থ সত্যের সন্ধান এখনো মেলেনি। সেই কালো হাত পূনরায় সম্প্রসারিত হয়েছিল ২১সে আগস্ট ২০০৪ সালে। বাংলাদেশের রাজনীতির সম্প্রীতি ক্রমশ অবিশ্বাসে দ্বিখন্ডিত হয়েই চললো। আজো তা বহমান। জয় বাংলা আর জিন্দাবাদ আজও বিপরীতমূখি।
ঠিক জানি না সমাধান কোথায় কার কাছে? যে জাতির উৎসধারায় রক্তের ¯্রােত লিখে দিয়েছিল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।’ সেই রক্ত সাগরে যে জাতি মুক্তির গান গেয়ে উঠেছিল ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ সেই বিজয়ী জাতি কেমন করে পরাজিতের পায়ে পা মিলিয়ে হেঁটে হেঁটে কোন এক বিস্ময় বিজয় অর্জন করতে চায়? বোধের এ স্খলন কে থামাতে পারে? কে বুঝাতে পারে এই দেশটা রক্ত পলিমাটির স্পর্শে পল্লবিত। কে বুঝাবে দেশ মানুষের। দেশ নীতির নৈতিকতার। দেশ সত্যের। বিভেদ সংকুচিত হওয়া সম্ভব মানুষ; মানুষ হলে। সর্বত্র সত্যের স্খলন, লোভের আর চাটুকারী ব্যাপক বিস্তার বিভেদের দূরত্ব কেবলই সম্প্রসারিত করেছে। কারণ আমরা সবাই মিথ্যাকে অপছন্দ করলেও কেন জানি না  তাকেই সবথেকে বেশি বিশ্বাস করি।  

একটি স্বাধীন দেশ, সেই দেশে স্বাধীনতা বিরোধী ভাবনা, আলোচনা, কেমন করে থাকে? তাকে রোহিত করতে হবে। স্তব্ধ করে দিতে হবে চিরদিনের জন্য। জোর করে কাউকে অসত্যভাবে ব্যক্তি, গোষ্ঠীর স্বার্থে দেশ বিরোধী বলা কিংবা করে তোলা কখনোই সঠিক নয়। যা নীতি নয় তাকে বা তাদের কোন কাজকে। নীতি না বলে, দেশের মানুষকে দেশাত্মবোধের কর্মযজ্ঞেও শামিল করাটা অত্যান্ত জরুরী। সমালোচনা থাকবে, বিরোধীতাও থাকবে তার পরেও অতি অবশ্যই থাকতে হবে সহনশীলতা। অনবরত ক্ষমতা নামক শব্দের পাশে দাঁড়িয়ে না থেকে ছোট হলেও সুন্দর এবং সত্যের পাশে থাকবার মানসিকতা আমাদের প্রাত্যাহিক অনুশীলনে সংযোজিত থাকা অতীব বাঞ্ছনীয়। নয়তো মানুষ ক্রমশ গন্ডার অনুভুতিপ্রবণ হয়ে পরবে।  
এদেশ আমাদের, আমরা আলোচনা করবো সমালোচনা হবে। সমালোচনা হবে রাজনীতির, অর্থনীতির, সাংস্কৃতির, কৃষিনীতির, সমাজনীতির, ধর্মনীতির, এবং রাজস্বনীতির-দেশের নয়। এ দেশ সবার। আমরা স্বাধীন। দেশাভ্যন্তরে পরাধীন থাকবার যে কোন নীতির ভাবনা পরিহারযোগ্য এবং প্রতিরোধযোগ্য। নয়তো অবিশ্বাসের রাজত্বে সবাই দাস হয়ে যাবো। ক্রমশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে খন্ডিত হতেই থাকবো।
তার প্রমাণÑআসুন, দেখে যান আমাদেরই কর্মদোষে
কেমন করে ভাগ হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু উদ্যান!