মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০, ১৭ চৈত্র ১৪২৬

সাইফুর রহমান মিরণ

March 15, 2020, 11:54 p.m.

সাংবাদিক নির্যাতনকারীদের শাস্তি দিয়ে, আইনের প্রতি আস্থা ফেরাতে হবে
সাংবাদিক নির্যাতনকারীদের শাস্তি দিয়ে, আইনের প্রতি আস্থা ফেরাতে হবে
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন - ছবি: ভোরের আলো

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ না কি সংবাদপত্র ও সাংবাদিক। রাজনীতিক, মন্ত্রী, সাংসদ, আমলা, প্রশাসন সবার মুখেই এই শব্দটি শোনা যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে রাষ্ট্রের এই স্তম্ভকে ওনারা নিজেদের পোষ্য হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন। এঁদের অনুসারী হয়ে খবর প্রকাশ করলে কোন সমস্যা নেই। তখন এদের মুখ থেকে গালভরা বাহাবা পাওয়া যায়। কোনভাবে যদি খবরটি এদের কারো বিপক্ষে যায় তাহলে আর রক্ষা নাই। রাজনীতিক, মন্ত্রী, সাংসদ, আমলা-কামলা-প্রশাসনের কর্তারা মিলে চতুর্থ স্তম্ভের রড, সিমেন্ট বালু আলাদা করে ফেলবেন। গুড়িয়ে দেওয়া হবে স্তম্ভ। মতের সঙ্গে না মিললে স্তম্ভকে দিগম্বর করতেও ছাড়েন না তারা। রাস্ট্রের একটি স্তম্ভ না থাকলে তাঁদের কিছু যায় আসে না। তিন ঠ্যাঙের টুলের মতো রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকলেও এই কর্মকর্তাদের দাপট কমবে না।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, যে দেশের গণমাধ্যম যতটা স্বাধীন সে দেশ ততো সমৃদ্ধ এবং উন্নত। গোটা দুনিয়ায় রাস্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভকে আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে। আর আমাদের দেশের চতুর্থ স্তম্ভের অবস্থা কেমন সেটা বুঝতে বেশি দূর যেতে হবে না। জেলায়, উপজেলায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা-নির্যাতন, মামলার চিত্র দেখলেই চতুর্থ স্তম্ভর করুণ দশা বোঝা যায়। সবশেষ কুড়িগ্রামে মধ্যরাতে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের ওপর নির্মম নির্যাতন এবং ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে জেল দেওয়ায় সেটা আরও স্পষ্ট হয়েছ। গভীর রাতে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের বাড়ির দরোজা ভেঙে স্ত্রী-স্বজনদের সামনে বিবস্ত্র করে নির্যতন চালানো হয়েছে তার ওপর। পরে তাকে মধ্যরাতে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছে। নির্মম এবং জঘন্য এই ঘটনা ঘটিয়েছেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন। তাঁর নির্দেশে এবং তাঁর নির্বাহী ম্যাজিস্টেটরা ওই ঘটনা ঘটিয়েছেন। এই ঘটনায় নিন্দার ঝড় বইছে গোটা দেশজুড়ে। গণমাধ্যমের ওপর এমন নির্মম ঘটনায় দেশের বাইরেও সমালোচনা হচ্ছে। আমরা এমন ঘটনায় হতবাক হয়েছি। অবিলম্বে এই জঘন্য ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূল শাস্তি দাবি করছি।

বর্তমান সরকারের দাবি দেশে আইনের শাসন চালু আছে। আমরা সেটা বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু আইন যেভাবে আমলা ও প্রশাসন ব্যবহার করছে তাতে সেই বিশ্বাস কতটা স্থায়ী হবে বুঝতে পারছি না। সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের ওপর মধ্য রাতের নির্মমতার পর এক বছরের জেল দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার তাঁর জামিন হয়েছে। অথচ আরিফুল ইসলামের জন্য তার স্ত্রী-স্বজনেরা জামিন আবেদন করেননি। স্ত্রী-স্বজন এবং গোটা দেশের গণমাধ্যম কর্মীদের দাবি হচ্ছে আরিফুল ইসলামকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া। এই ঘটনায় আমরা আরও হতবাক হয়েছি। এই অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, দেশের আইন-আদালত সবই জেলা প্রশাসক আর প্রশাসনের হাতের মুঠোয়। তারা ইচ্ছে করলে যে কাউকে নির্মম নির্যাতন করতে পারবেন, জেল দিতে পারবেন। আবার ইচ্ছে হলেই কারাগার থেকে মুক্তি দেবেন। এটা কেমন আইন? আইন যদি এভাবে আমলাদের বৈঠকখানার কাগজে রূপ নেয় তাহলে আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ থাকবে কিভাবে?

আমরা যতটা জানি, ‘দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন আছে, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা আছে। সে অনুযায়ী রাতের বেলা কোনো নাগরিককে ঘর থেকে তুলে এনে মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম পরিচালনা করাটা অবৈধ। যে সাংবাদিককে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে, তিনি যদি সন্দেহের তালিকায় থাকতেন, তাহলে তাঁকে নজরদারিতে রাখা যেত; কিংবা ‘অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায়’ পুলিশ অভিযান চালাতে পারত। আরো গুরুতর মনে হলে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর বাসা সিলগালা করে দিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মধ্যরাতে ‘দরজা ভেঙে’ একজন নাগরিককে তুলে আনা এবং পরে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে কারাদ- দেওয়াটা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা যতটুকু বুঝি, তাতে মোবাইল কোর্টের ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা, কিন্তু তা না করে ওই সাংবাদিককে তুলে আনার পর কোর্ট এর কার্যক্রম পরিচালনা থেকে পুরো ঘটনাটির পিছনেই যে অপরাধ দমন নয় বরং অন্য কোনো বিবেচনা কাজ করেছে তা স্পষ্ট।’

কুড়িগ্রামে বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম একজন জেলা প্রশাসনের দুর্নীতির খেরোখাতা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছিলেন। তুলে ধরেছিলেন জনগণের অর্থে সৌন্দর্যবর্ধন করা ‘সুলতানা সরোবর’ পুকুরের নাম কেন জেলা প্রশাসকের নামে হবে। তাই তাঁর আঁতে ঘা লেগেছে। তিনি তার গায়ের জ্বালা জুড়িয়েছেন সঠিক তথ্য দেওয়া সাংবাদিককে নির্মমভাবে নির্যাতন করে এবং জেল দিয়ে। আমরা মনে করি জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন জ্বালা জুড়াতে গিয়ে গোটা জাতির গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এই আগুন নেভানো কঠিন হবে। এই আগুনে জেলা প্রশাসক সুলতা পারভীন ও তার অপকর্মে সহযোগিতাকারীদের জ¦লতে হবে। এই জ্বালায় জ্বালতে হবে আরও অনেককে।

আমরা মনে করি যেখানে অসঙ্গতি দেখবে সাংবাদিকের দায়িত্ব হচ্ছে সেটা তুলে ধরা। আরিফুল ইসলাম তাই করেছেন। আমরাও তাই করবো। তবে কোন প্রতিবেদেন কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তিনি আইনের আশ্রয় নিতেই পারেন। জেলা প্রশাসক আইনের সব দুয়ারের খবর জানার পরও কেন নির্মমতার দিকে গেলেন? মধ্যরাতে চোর-ডাকাতের মতো দরোজা ভেঙে ঘরে ঢুকে নির্যাতন করার অধিকার কি তাঁর আছে? সাধারণভাবেই বলা যায় জেলা প্রশাস এবং ম্যাজিস্টেটরা ফৌজদারী অবরাধ করেছেন। প্রশানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করে গভীর রাতে ভ্রাম্যমান আদালত বসাবেন একজন সংবাদকর্মীকে জেল দেওয়ার জন্য? এমন আচরণ কোনভাবেই শুদ্ধাচর হতে পারে না। সংবাদকর্মী আরিফুল ইসলাম অপরাধ করে থাকলে তার বিচার হোক। কিন্তু যারা বিচার করতে গিয়ে ফৌজদারী অপরাধে জড়িয়েছেন তাদের বিচার অবশ্যই রাষ্ট্রকে করতে হবে। দেশের সাধারণ নাগরিকদের আস্থায় ফেরাতে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনসহ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।

আমরা বলছি না আমাদের প্রশাসনের সব কর্মকর্তারা এরকম আচরণ করেন। কিন্তু একজন সুলতানা পারভীন যে কালিমা লেপন করেছেন সেই কালিমা সব জেলা প্রশাসকের গায়েই লেগেছে। এখান থেকে অবশ্যই শিক্ষা নেওয়া উচিত। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে সাধারণ নাগরিকেদের নির্যাতন করবে এটা কোন সভ্য দেশের মানুষ আশা করে না। সাধারণ মানুষের রক্ত-ঘামে এবং শ্রমে যাদের বেতন-ভাতা হয়, সেই আমলারা সাধারণ মানুষদের পায়ের তলায় পিষে মারবে। এটা হতে পারে না। এখন আর ব্রিটিশ শাসন আমল নেই। এটা হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশ। বড় কর্তা হয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণ বন্ধ করতে হবে।

আপনারা হয়তো ভুলে গেছেন, আগৈলঝারার উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা তারিক সলমানকে দোষ না করেও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেদিন গণমাধ্যম সঠিক তথ্য দিয়ে তারিক সলমানের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আইনের অপপ্রয়োগের তথ্য তুলে ধরায় প্রধানমন্ত্রী ঘটনা জানতে পারেন। পরে তারিক সলমান মুক্ত হন। একই সঙ্গে দোষীদের শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। সেটা যেমন আইনের প্রতি আমাদের আস্থা ফিরিয়ে দিয়েছে। আজও আইনের প্রতি আস্থা ফেরাতে কুড়িগ্রামে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের শাস্তি দিয়ে আইনের প্রতি আস্থা ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন আইনের এমন অপপ্রয়োগ করেছেন তা আইনের শাসন এবং সাংবিধানিক অঙ্গীকারের পরিপন্থি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর নামান্তর। এমন ন্যক্কারজনক ঘটনায় দ্রুত তদন্ত এবং বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে প্রশাসন তথা সরকারের ওপরই জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলবে।

আমরা কলি-কলমের সঙ্গে থাকতে চাই। আমাদের আপনার সম্মান দেখানো দরকার নেই। কিন্তু কোনভাবেই অসম্মান করার অধিকার আপনার-আপনাদেরনাই। সেই অধিকার মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আপনাদের দেয়নি। আমরা কোন প্রশাসনকেই প্রতিপক্ষ ভাবতে চাই না। আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা সহযোগী হয়ে পাশে থাকতে চাই। কিন্তু আমাদের ওপর চড়াও হলে তারও জবাব আমাদের জানা আছে। কালি-কলমই আমাদের হাতিয়ার হবে। আর দেশের সাধারণ মানুষ আমাদের পাশে আছে। যার প্রমাণ গতকাল সারা দেশের আন্দোলন।