সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২৩ চৈত্র ১৪২৬

সাইফুর রহমান মিরণ

March 20, 2020, 11:08 p.m.

ব্যবসায়ীদের সাজা হচ্ছে, ভোক্তাদের সাজা দেবে কে?
ব্যবসায়ীদের সাজা হচ্ছে, ভোক্তাদের সাজা দেবে কে?
ভোরের আলো - ছবি:

বাজার অস্থিতিশীল হলে প্রথম অভিযোগ আসে ব্যবসায়ীদের ওপর। এমনটাই স্বাভাবিক। কারণ কিছু ব্যবসায়ী অতি মুনাফার আসায় পন্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। সেজন্য ব্যবসায়ীদের দ- হচ্ছে। হচ্ছে জরিমানাও। গতকালও বরিশালের অনেক ব্যবসায়ীকে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু ভোক্তাদের কারণে বাজারে যে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে তার দায় কে নেবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে? দেশে সৃষ্ট সংকটের জন্য ব্যবসায়ীরা যেমন দায়ি তেমনি ভোক্তারাও কম দায়ী নয়। ওই শ্রেণির ভোক্তার কারণে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নি¤œ আয়ের মানুষদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। গুজব শুনে বাজার থেকে চাল, ডাল, পেঁয়াজসহ নিত্য পন্য মজুত করা ভোক্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

গত বছর পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির খবর শুনে একদল ভোক্তা বস্তা ভর্তি পেঁয়াজ কিনে সংরক্ষণ করেছেন। তাদের অনেকের পেঁয়াজ বাসায় নষ্ট হয়েছে। আবার লবনের দাম বাড়তে পারে এমন গুজব শুনে ১০-২০ প্যাকেট কিংবা বস্তা ভর্তি লবন কিনে বাজারে সংকট সৃষ্টি করেছেন। গত কয়েক দিনে বাজারে চাল, ডাল এবং পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি কেজি চালে ৫ থেকে ৭টা এবং প্রতি কেজি পেঁয়াজে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এই বৃদ্ধির জন্য কেবল ব্যবসায়ীরা নয়, ভোক্তারাই দায়ি। লোভী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও অসুস্থ ভোক্তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

সারা দেশে যখন করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে একাট্টা হচ্ছে তখন দেশের এক শ্রেণির ভোক্তা সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীদের মতো সব ধরণের পন্য মজুত করতে শুরু করেছেন। আর তাদের ওই অসুস্থ্য প্রতিযোগিতার কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। করোনা থেকে হাত শোধন করার জন্য ‘হ্যা- স্যানিটাইজার’, হ্যক্সিসল, নাক ঢাকার জন্য মাস্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থ্য প্রতিযোগিতার কারণে বাজারের বেশিরভাগ দোকানে এখন ‘হ্যা- স্যানিটাইজার’, হ্যক্সিসল, পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ভোক্তা কেবল নিজে ভোগ করার জন্য এবং নিজে ভালো থাকার জন্য এসব পন্য কিনে বাসায় রেখে দিয়েছেন। বাজারে এসব পন্য পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও পাওয়া যায় তার দাম দুই কিংবা তিনগুন বেশি দিতে হচ্ছে। এতো গেলে হাতধোয়া কিংবা শোধন করার বিষয়। এর চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করেছে এই শ্রেণির ভোক্তারা।

গত বৃহষ্পতিবার নগরের পিঁয়াজ পট্টির সব আড়তের পেঁয়াজ সন্ধ্যার আগে শেষ হয়ে গেছে। অনেক চালের আড়তও শূন্য হয়ে যায় সন্ধ্যা নামার আগে। কয়মাস বসে এতো পরিমাণ পেঁয়াজ খাবেন। এতো পরিমাণ পেঁয়াজ কি বাসা বাড়িতে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এই পেয়াজ এবং চাল, ডাল যতটুকু দরকার ততটুকু কিনলে আজকের এই কৃত্রিম সংকট দেখা তি না। সবাই যখন করোনা মোকাবেলায় ব্যস্ত একদল উচ্চ শেণির ভোক্তা পন্য মজুদের প্রতিযোগিতায় নামে।

চাল ও পেঁয়াজের মৌসুম হলেও কেবল ভোক্তাদের প্রতিযোগিতার কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, উচ্চ শ্রেণির ভোক্তদের ধারণা করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়লে বাজারে পন্যের সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হতে পারে এমন আশঙ্কা উচ্চ শ্রেণির এই ভোক্তাদের। তাই তারা পন্য মজুদে নেমে পরেন। অসুস্থ্য ভোক্তাদের ধারণা পন্য পরিবহন বন্ধ হলে তারা না খেয়ে মরে যাবে। তাই বেশি বেশি পেঁয়াজ, চাল, ডাল কিণে ঘর বোঝাই শুরু করে দেয়। তাদরে অসুস্থ্য প্রতিযোগিতায় ৪০ টাকার পেঁয়াজ ১০০ টাকায় কিনে কয়েক ঘন্টার মধ্যে পেঁয়াজ পট্টি পেঁয়াজ শূন্য করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে বস্তায় বস্তায় চাল কিনে ঘর বোঝাই করে ফেলেছেন। 

আমাদের দেশে এক সময় টাকার কুমির ছিল ২২ পরিবার। এখন সেই সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। দেশের এই উচ্চ শ্রেণির ভোক্তাদের অর্থের অভাব নেই। অভাব আছে মানসিকতার। এরা কেবল নিজেরা খেয়ে বাঁচতে চায়। এদের পেটের ক্ষুধা কম। কিন্তু চোখের ক্ষুধা অনেক বেশি। উচ্চ শ্রেণির এই ভোক্তাদের চোখের ক্ষুধার বলি হচ্ছেন পেটে ক্ষুধার মানুষেরা।

বিত্তবান এমন ভোক্তাদের কাছে করোনা কিংবা মহামারি কোন বিষয় নয়। কে মরলো কে বাঁচলো এদের তাতে কিছু যায় আসে না। পাশের মানুষটি ভালো না থাকলে নিজে ভালো থাকা যায় না। এই ধারণা এরা মানতে চান না। এদের একটাই চিন্তা তিনি বা তার পরিবার ভালো আছে কি না। তাই তো তারা হয়ে যান মজুদদার। খাবার-দাবার সব মজুদ রেখে এরা তৃপ্তির ঢেকুর গেলেন এবং গর্ব করে বেড়ান। সেই খাবার কতটুকু খাবে আর কতটুকু নষ্ট হবে সে চিন্তা তাদের নেই। অথচ তাদের ঘরে যতটা খাবার নষ্ট হয় তা দিয়ে অনেক মানুষের অন্নের সংস্থান হতে পারতো। এই শ্রেণির ভোক্তাদের এরকম প্রতিযোগিতার খেসারত দিতে হচ্ছে খেটে খাওয়া ও কম আয়ের সাধারণ মানুষদের। সময় এসেছে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার।

আমরা বিশ্বাস করি, যে পরিবারের যতটুকু দরকার সেটুকু কিনলে বাজারে কৃত্রিম সংকট হবে না। ভোক্তারা সচেতন হলে ব্যবসায়ীরা সংকট সৃষ্টি করতে পারবে না। কেবল আমি খাবো আর আমার পরিবার খাবে, এই চিন্তা বদলাতে হবে। তাই যে ভোক্তারা বস্তায় বস্তায় চাল, ডাল, তেল, লবন, পেঁয়াজ মজুদ করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সব ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে।