মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০, ১৭ চৈত্র ১৪২৬

সাইফুর রহমান মিরণ

March 26, 2020, 12:13 p.m.

করোনা: প্রশাসনই ভরসা, নগরবাসীর পাশে নেই বিসিসি
করোনা: প্রশাসনই ভরসা, নগরবাসীর পাশে নেই বিসিসি
বিসিসি ভবন। - ছবি: ভোরের আলো।

সারা বিশ্ব করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। অনেক দেশে মহামারী আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশও ঝুঁকির মধ্যে আছে। সচেতন ও সতর্কতা ছাড়া এই মুহূর্তে বিকল্প তেমন কিছু নেই। তাই নাগরিকদের সচেতন এবং পরিচ্ছন্ন রাখতে বেশি বেশি প্রচারণা দরকার। সারা দেশে প্রশাসন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। বরিশালেও বিভাগীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন সাধারণ মানুষদের আশ্বস্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। কিন্তু বরিশাল সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তেমন কোন উদ্যোগ নেই।

সামর্থ অনুযায়ী কোন কোন প্রতিষ্ঠান, দুই একটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র সংগঠন প্রচারণা চালাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের অভিযোগ করোনা প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধিরা ‘চাচা আপন পরান বাঁচা’ নীতি অনুসরণ করছেন। সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক দল ও জনপ্রতিনিধিদের পাশে পাচ্ছে না। একই অবস্থা রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদেরও। তারা সবাই স্বেচ্ছায় অন্তরীণ হয়ে আছেন। যা কোনভাবেই কাম্য নয়। তবে ব্যতিক্রমও আছে। সকল দুর্যোগের মতো করোনা মোকাবেলায়ও মানুষ তাদের পাশে চায়।

কথায় আছে দেশে দুর্যোগ এলে পীরের গায়েও লাগে। সবাই বিশ্বাস করে কোন দুর্যোগে একা বাঁচা যায় না। কেউ যদি মনে করেন কেবল ঘরে থাকলেই করোনা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে, তাহলে ভুল করবেন। করোনার প্রাদুর্ভাব ঘটলে কেউ একা বাঁচতে পারবেন না। তাই সচেতন ও সতর্কতার সঙ্গে সবাইকে নিয়ে মোকাবেলা করার উদ্যোগ নিতে হবে। সাধারণ মানুষদের সচেতন করতে হবে। যাদের জীবানুনাশক ব্যবহারের সামর্থ নেই, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। করোনা থেকে আমি দূরে থাকলেই দুর্যোগ মোকাবেলা হয়ে যাবে এই ধারণা বদলাতে হবে।

আমরা মনে করি ১৯৭১ সালের চেয়ে বড় দুর্যোগ দেখা দেয়নি। ৭১-এর ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে। যার মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। ওই দুর্যোগ মোকাবেলায় সাড়ে সাত কোটি বাঙালি একযোগে মাঠে ছিল। একই অবস্থা হয়েছে প্লেগ, বসন্ত ও কলেরার দুর্যোগের সময়ও। সব দুর্যোগে মানুষ মানুষের পাশে থেকে সহযোগী হয়েছিল। তবে ব্যতিক্রমী করোনা থেকে মুক্তির জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং সচেতনতা অবলম্বনের পরামর্শ। তার মানে এই নয়, সব কিছু ছেড়ে একা ঘরে বসে থাকলে করোনা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। দেশের সব কঠিন দুর্যোগে সহযোগী হয়ে মানুষের পাশে থাকতে হবে।

ইতিপূর্বে বিভিন্ন দুর্যোগে বরিশালের মানুষের পাশে থেকে সাহস যুগিয়েছেন মেয়র সেরনয়িবাত সাদিক আবুল্লাহ। করোনা প্রতিরোধেও তেমনি পাশে থাকবেন এমন প্রত্যাশা মানুষের। এই মুহূর্তে মেয়রের সর্বাত্মক জনবল নিয়ে মানুষের পাশে থাকা দরকার। কিন্তু কেন যেন তিনি জনসাধারণ থেকে একটু দূরে অবস্থান করছেন। কেন এই অবস্থা? হয়তো করোনার কারণেই হবে। নগরবাসী চায়, করোনা মোকাবেলা করতে সাধ্যমতো পাশে থাকবেন মেয়র। আমরা জানি, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কিন্তু মেয়র সেই দূরত্ব বজায় রেখেই মানুষের পাশে থাকতে পারেন। তবে তিনি সচেতনতায় গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। গতকাল কয়েকটি স্থানে হাত ধোয়ার জন্য পানির ড্রামও দিয়েছেন তিনি। এই দুর্যোগে বরিশালের সাধারণ মানুষ মেয়রকে সহযোগী হিসেবে তাদের পাশে পেতে চায়।

করোনা মোকাবেলায় বরিশালের পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, ফায়ারসার্ভিস সর্বাত্মক জনবল নিয়ে কাজ করছেন। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনায় বাজার স্থিতিশলীল রাখতে সহযোগিতা করছে। সচেতনতায় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশংসনীয়। মেট্রোপলিটন পুলিশ নগরে জীবানুনাশক ছিটিয়ে মানুষের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করছেন। প্রশাসন যতটা সরব ভূমিকা পালন করছে, সেই তুলনায় বরিশাল সিটি করপোরেশন অনেকটা নীরব।

রাজধানী ঢাকাসহ বেশ কিছু জেলায় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদসহ বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ মানুষদের সচেতন করতে সামর্থ অনুযায়ী কাজ করে চলেছেন। তারা হ্যা- স্যানিটাইজার, মাস্ক, হাত ধোয়ার উপকরণসহ সচেতনতায় মাঠে আছেন। এর বাইরে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাধ্যমত চেষ্টা চালাচ্ছে। এই কাজে বিত্তবানরা সেভাবে এগিয়ে আসছে না। দেশে থাকা বহুজাতিক কোম্পানী, বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান এই মুহূর্তে নির্বিকার। তারা নিজেরা কাজ করছেন না, অন্যদিকে যারা কাজ করছেন তাদের আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছেন না। এই মুহূর্তে সবাই মিলে এগিয়ে না আসলে এই দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।

বরিশালে সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের প্রচারণা মানুষদের অনুপ্রাণিত করেছে। তারা প্রচারণার পাশাপাশি সাধ্যমত জীবানুনাশক নিয়ে পাশে আছেন। জীবানুনাশক বিতরণ করা হয়েছে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের পক্ষ থেকেও। এর বাইরে দুইদিন প্রচারণা চালিয়েছে বিএনপি, মাস্ক দিয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি। জীবানুনাশক তৈরি ও বিতরণ করেছে কয়েকটি উন্নয়ন সংগঠন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রজমোহন কলেজসহ একধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কোথাও সরকারী দল আওয়ামী লীগ, তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, বরিশাল সিটি করপোরেশনের দৃশ্যমান উপস্থিতি না দেখে হতাশ সাধারণ মানুষ।

এমন অবস্থায় আমদের নগর পরিচ্ছন্নতায় করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা প্রাণপণে কাজ করে যাচ্ছেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের এই কাজের জন্য ধন্যবাদই নয়, তারা কৃতজ্ঞতা পাওয়ার যোগ্য। তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকি কিংবা করোনার চিন্তা করে ঘরে বসে থাকেননি। এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যদি সামাজিক দূরত্বের দোহাই দিয়ে ঘরে অন্তরীণ হয়, তাহলে আমাদের অবস্থা কি হবে। সেটা কি আমাদের রাজনৈতিক দল, নগর ভবন, বিশিষ্ট নাগরিকরা একবারও ভেবে দেখেছেন? তাদেরও তো সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা দরকার। তারা আমাদের পাশে থাকলেও, আমরা কিন্তু তাদের পাশে সেইভাবে থাকতে পারছি না।

এদিকে নগরের ৩০ ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদেরও মাঠে পাওয়া যাচ্ছে না। মাঠে নেই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও। এই দুর্যোগে নগরবাসীর পাশে মেয়রকে না পেয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন অনেকে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে এসেছে। তারা মনে করেন মেয়রের পক্ষ থেকে সহযাগিতা না থাকলেও তিনি মানুষের পাশে থাকলে মানুষ আশ^স্ত হতে পারতেন। তিনি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই এই কাজটি করতে পারেন। নাগরিকদের সঙ্গে স্বাক্ষাতকার না দিয়ে কেবল করোনা সচেতনতায় মাঠে থাকতে অনুরোধ করেছেন অনেকে।

মাননীয় মেয়র আপনি এই নগরের অভিভাবক। প্রায় ১০ লাখ মানুষ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। বিশেষ করে বর্ধিত এলাকার মানুষকে সচেতন করতে একটু বেশি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আপনি এসে তাদের পাশে দাঁড়ান। একই সঙ্গে কাউন্সলরদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সচেতনতায় মানুষের পাশে থাকতে বলেন।

করোনা আতংকে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে না। হাসপাতালগুলোতে কেউ যেতে সাহস পাচ্ছে না। চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকার কারণেই এই অবস্থা দেখা দিয়েছে। যারা চিকিৎসা দেবেনে সেই চিকিৎসক ও নার্সরা তাদের ঝুঁকি কমাতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছেন। তাদের দাবি পূরণ না হলে করোনা নয়, কোন রোগী সেবা পাবে না। আমাদের চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ সরবরাহ করে তাদের আশ্বস্ত করতে উদ্যোগ নিন।

২৫ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক বাহিনী নিরীহ বাঙালিদের হত্যায় মেতে ওঠে। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। তারপরও বাঙালি পাকিস্তানীদের প্রতিরোধে রুখে দাঁড়ায়। সেই ভয়াল রাতে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। একই সঙ্গে স্বাধীনতা দিবসের ঊষালগ্নে সবাই মিলে করোনা প্রতিরোধে জোটবদ্ধ হই। করোনা দুর্যোগ হলেও আতংকিত হবেন না। সাবান দিয়ে সবসময় হাত-মুখ পরিষ্কার করুন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সাধারণ মানুষের পাশে থাকুন।