বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

May 27, 2019, 12:59 a.m.

দোষ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হোক, সতর্ক থাকুন মেয়র
দোষ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হোক, সতর্ক থাকুন মেয়র
অনুরোধ প্রতিবেদন - ছবি:

একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। গল্প বলছি কেন? সত্যি ঘটনা। এক সময় দেশ-বিদেশের বড় বড় কোম্পানীগুলোতে কোয়ালিটি কন্ট্রোল (কিউসি) কর্মকর্তা নামে একজনে নিয়োগ দেওয়া হতো। তাদের দায়িত্ব ছিল কোম্পানী কিংবা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পন্যের মান নিয়ন্ত্রণ রাখা। যদি কোনভাবে উৎপাদিত পন্যের মান সঠিক না থাকতো, তাহলে তাঁকে জবাবদিহি করতে হতো। এই পদ্ধতিতে কোম্পানীর পন্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত অন্য কর্মকর্তারা জবাবদিহিতার বাইরে থাকতেন। এই সুযোগে ওইসব কর্মকর্তারা কিউসি কর্মকর্তাকে ফাঁসাতে নানাভাবে ষড়যন্ত্র করতেন। বর্তমান সময় কোম্পানীগুলো কিউসি কোয়ালিটি কর্মকর্তার ধারণা পরিবর্তন করে টোটাল কোয়ালিটি কন্ট্রোল (টিকিউসি) নীতি অনুসরণ করা শুরু করেছে। এর ফলে এখন আর উৎপাদিত পন্যের গুণগতমান সঠিক না থাকলে ওই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত সবাই জবাদিহিতার আওতায় আসছে। অর্থাৎ পন্যের কাচামাল থেকে শুরু করে প্যাকেট হওয়ার আগ পর্যন্ত যার কাছে ত্রুটি ধরা পড়বে তিনি ওইখানেই সেটা সংশোধন করে দেবেন। যিনি দেবেন না তিনিই ওই ত্রুটির জন্য দায়ি থাকবেন। এখন আর কেউ কারো দোষ খোঁজার সময় পাচ্ছেন না। ওপরের এই সত্য গল্পটা বলার একটা কারণ হচ্ছে- গত ২২ মে নগর ভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও সচিব ইসরাইল হোসেন হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে ঘন্টাখানেকের বেশি সময় বক্তব্য রেখেছেন। হোল্ডিং টাক্স নিয়ে বক্তব্যে তিনি তখনকার মেয়রের নানা দোষ-ত্রুটির কথা সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন। তাঁর ওই বক্তব্যে উঠে আসে, তখনকার মেয়র রাজস্ব উত্তোলনে মুখ চিনে ট্যাক্স ধার্য করার কথাও। গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তখনও তো তিনি (ইসরাইল) প্রধান রাজাস্ব কর্মকর্তা ছিলেন। তাহলে কেন ওই দায় কেবল তখনকার মেয়রের ওপর উঠবে। ওই দোষে তো তিনিও দুষ্ট হবার কথা। তিনি তো সেদিন এই ঘটনার প্রতিবাদ কিংবা আকারে ইঙ্গিতে কাউকে বলারও চেষ্টা করেননি। তাহলে তাঁর ক্ষেত্রে কি ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সমদহে’ এই উক্তি প্রযোজ্য হয় না? আমরা জানি, তিনি একজন পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা। তাঁর সদিচ্ছা থাকলে সেদিন তিনি প্রতিবাদ করতে পারতেন। প্রয়োজনে তিনি বদলী হয়েও যেতে পারতেন। কিন্তু সেদিন সেটা তিনি করেননি। তিনি অন্যায় হয়েছে জেনেও ওই কর্তৃপক্ষের সঙ্গেই থেকেছেন। গত ২২ তারিখের সংবাদ সম্মেলনে তিনি সত্যের যুধিষ্টির হয়ে বর্তমান মেয়রের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিগত সময়ের দায় বর্তমান মেয়রের ওপর চাপাতে চাইলেন। সেদিন যদি তিনি সঠিক ভূমিকা রাখতেন, তাহলে নগরবাসী আজকে হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে উদ্বিগ্ন হতেন না। যদিও বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ট্যাক্স নিয়ে নগরবাসীকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেদিন সংবাদ সম্মেলনে সিটি করপোরেশনের সচিব ও প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইসরাইল হোসেন বলেছেন, ৫২ হাজার হোল্ডিং ট্যাক্স গ্রহীতার কাছ থেকে মাত্র ৯ কোটি টাকা আদায় হতো। সঠিক নিয়মে কর আদায় করলে ৮০ থেকে ৯০ কোটি টাকা করা আদায় হতো। নগরীতে আগে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে নানা অনিয়ম ছিলো। আগের পরিষদের মেয়র আহসান হাবিব কামাল তাঁর ইচ্ছেমতো ট্যাক্স কমিয়ে দিতেন। মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন পরিষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর নগর ভবনের রাজস্ব বাড়ানোর নানা তৎপরতা শুরু করেন। এতে আগের পরিষদের ট্যাক্স আদায়ের নানা অনিয়ম ফাঁস হয়ে যায়। তিনি আরো বলেছেন, সিটি করপোরেশনের একজন সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আগে বার্ষিক হোল্ডিং ট্যাক্স দিতেন মাত্র ২ হাজার টাকা। ২০১৬ সালে সিটি করপোরেশনের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার টাকা। একইভাবে সিটি করপোরেশনের সাবেক এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা আগে ট্যাক্স দিতেন ৫০৬ টাকা, তাঁর কর দেওয়ার কথা ৯৫ হাজার টাকা। সিটি করপোরেশনের একজন কাউন্সিলর আগে ট্যাক্স দিতেন মাত্র ১ হাজার ৩০০ টাকা, অথচ নতুন করে তার কর হবে ৬৪ হাজার টাকা। বরিশাল নগরীর সদর রোডের ডা. সোবাহান মার্কেটের চায়না প্যালেসের সংযুক্ত ভবন বাবদ আগে কর দিতেন ২৭ হাজার টাকা। কিন্তু ২০১৬ সালে সিটি করপোরেশনের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই ভবনের একাংশের করা হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। একইভাবে নগরীর কাঠপট্টি সড়কের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খান সন্স গ্রুপের একটি বহুতল ভবনে এতদিন বার্ষিক কর আদায় হতো ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অথচ ২০১৬ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই ভবনের কর হওয়ার কথা ২৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা। আমরা ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলাম, এখনকার রাজস্ব কর্মকর্তারা তখন ছিল কি না? তাহলে সেদিন কেন ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলো না? আজকের এই কর্মকর্তা সেদিনের অন্যায়ের সঙ্গে থেকেও তখনকার মেয়রের দোষের ভাগিদার না হয়ে, তাঁর বিরুদ্ধে, তাঁর অনিয়মের কথাগুলো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করলেন কেন? কালকে যখন অন্য এক মেয়র দায়িত্ব নেবেন, তখন কি ‘আমরাই গড়বো আগামীর বরিশাল’ এই স্বপ্ন দেখানো মেয়রের দোষের কথা বলবেন তার মতো আরেক কর্মকর্তা? এটা কোনভাবেই কাম্য নয়। আমরা বর্তমান মেয়রের ভিশন বাস্তবায়নের সঙ্গে আছি এবং থাকবো। নগরবাসীকে নিয়ে তাঁর ভাবনার প্রশংসা করতেই হয়। ইতিমধ্যে নগরের জঞ্জাল ছাফ করতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন। মহাসড়কের আদলে নগরের সড়ক নির্মাণ করছেন। রাতে নগর পরিচ্ছন্ন করছেন। অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এককালীন অবসর ভাতা দিয়েছেন। তাঁর এই ইতিবাচক কাজের জন্য নগরবাসী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। আমরা চাই, নগর ভবনের কর্মকর্তারা নাগরিকদের হয়ে উঠুক। অন্যের দোষ খোঁজার আগে নিজে দোষ করলেন কি না সেটা নিশ্চিত হোক। তারা দোষ দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসুক। আমাদের বর্তমান মেয়রের ভিশন বাস্তবায়নে কাজ করুক। অবশ্যই সেটা যেন কোনভাবে অন্যের দায় তাঁর ওপর চাপিয়ে না হয়। তাহলে আমাদের নগর ভবনও হয়ে উঠবে টোটাল কোয়ালিটি কন্ট্রোল (টিকিউসি) নগর ভবন। যেখানে কেউ কারো দোষ খোঁজার সময়-ই পাবে না। মাননীয় মেয়র, নগরবাসী হোল্ডিং ট্যাক্স দিতে চায়। তাদের দাবি বিগত মেয়রের সময় হোল্ডিং ট্যাক্স সাড়ে তিন টাকা, আড়াই টাকা কিংবা দুই টাকা ছিল। তিনি ট্যাক্স আদায়ে কোন কোন ক্ষেত্রে অনিয়ম করেছেন। ওই সময়ের অনিয়মের সুযোগ নিয়েছেন তখনকার মেয়র, কাউন্সিলর ও দলীয় নাগরিকরা। ওই সময়ে হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়ে আমাদের একাধিক প্রতিবেদনেও সেটা উঠে এসেছে। তবে সাধারণ নাগরিকদের জন্য ধার্য করা ট্যাক্স নগরবাসীর কথা বিবেচনায় নিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিন ভাগের একভাগ আদায় করা হতো। এমনটা অন্যায় কি না জানি না। যদি এটা অন্যায় হয়, তবে সে অন্যায়ও তিনি করেছেন। আমদের কাছে মনে হচ্ছে, আমি কিংবা আপনারা বা রাজস্ব কর্মকর্তারা যে-ই যা বলুক আমাদের নগরে আস্থার যায়গা নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরী। আমরা বারবার লিখেও নাগরিকদের আস্থায় নিতে পারবো না। যে নাগরিক কিংবা যিনি ট্যাক্স দিতে যাবেন তার বর্তমান ট্যাক্স-ই নির্ধারণ করে দেবে তার আস্থার জায়গা। আর নাগরিকদের আস্থায় নিয়ে যেতে পারেন কেবল আপনি। আমরা চাই আপনি সেই উদ্যোগ নেবেন। একজন নগর পিতাকে সতর্ক করা কতটা যৌক্তিক জানি না। তারপরও বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, মাননীয় মেয়র, যে কর্মকর্তারা বিগত মেয়রদের দোষের কথা এখন বলে বাহবা নিতে চান তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এই কর্মকর্তারা কারো নয়, যখন যে বা যিনি দায়িত্বে থাকেন তাকে তুষ্ট রাখতে কাজ করেন। যদিও আপনি সে ব্যাপারে সতর্ক হয়েই সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। এই অবিরাম চলায় আরো সতর্ক হতে অনুরোধ।