বুধবার, ০৩ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

April 14, 2020, 8:43 a.m.

নববর্ষ যেন আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়
নববর্ষ যেন আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়
মন্তব্য প্রতিবেদন। - ছবি: ভোরের আলো।

শুভ নববর্ষ। আজ মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ। ১৪ এপ্রিল ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ। চৈত্র সংক্রান্তি পার করে একটি বছরের সূচনা হলো।


এই বছরটি পেছনের আবর্জনাকে ধুয়ে মুছে দিয়ে শুভ পথের দিকে আমাদের নিয় যাবে কি না আমরা জানি না। অগ্নিস্নানে সব পাপ পুড়ে ছাই হবে কি না তাও জানি না। তবে আমরা বিশ্বাস করি সকল অশুভ ছায়া দূর করতে কোন না কোন শুভ সকালের দরকার। সেই সকাল যেন এই নববর্ষ হয়। এই নববর্ষ যেন আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। আমরা যেন আলোর সকালে আলোর আহ্বান দেখতে পাই। যে আলো করোনাসহ সকল কালো, অন্ধকার, জঞ্জাল ধুয়ে-মুছে প্রকৃতিকে সুন্দর ও সতেজ করে দেবে। নুতুন বছরের এই আলো আমাদের সুন্দরভাবে বাঁচার পথ দেখাবে। আজকের বাংলা নববর্ষে আমাদের সেই প্রত্যাশাই থাকলো।

আজ গেটা বিশ্ব করোনা নামের এক দুর্যোগ মেকাবেলায় ব্যস্ত। মানুষের দৈনন্দিন জীবন স্তব্ধ করে দিয়েছে করোনা। সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈকিত দূরত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে একটি ভাইরাস। বাধ্য হয়ে সারা পৃথিবীর সঙ্গে বাংলাদেশেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সব আয়োজন বন্ধ করা হয়েছে। প্রকৃতির এই বৈরী প্রভাবে আমরা চরম শংকটের মধ্যে পড়েছি। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ আজ থমকে দাঁড়িয়ছে। বাঙালির প্রাণের উৎসব চৈত্র সংক্রান্তি, বাংলা নববর্ষ, মঙ্গল শোভাযাত্রা কিংবা বৈশাখী মেলার আয়োজন নেই কোথাও। আজ আমরা যার যার ঘরে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছি। এই দুর্যোগ থেকে মুক্তির পথ খুঁজে ফিরছি।

‘ফিরে চল মাটির টানা, যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে’। মাটি মানুষকে আশ্রয় দিতে আঁচল পেতে থাকলেও সেই আঁচলের নীচে দাঁড়াতে সাহস পাচ্ছি না। সবুজ বৃক্ষ এবং সবুজ প্রকৃতিকে যেন অসহায় মনে হচ্ছে। এই স্নিগ্ধ, কোমল অপরূপ সবুজের হাতছানি থাকলেও মনে হচ্ছে অন্ধকার আমাদের গ্রাস করতে চাইছে। কোন অন্ধ গহ্বর আমাদের সমস্ত সুন্দরকে গ্রাস করতে উদ্যত হচ্ছে।

গতকাল ছিল বসন্তের শেষ দিন। কোকিল তার বিদায়বেলার গানে মুখরিত ছিল। তাঁর কণ্ঠের পরিবর্তনের ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এই তাড়নার মধ্যেও অবিরাম কুহুতানে প্রকৃতিকে আশ্বাস্ত করছিল কোকিল। কোকিলের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল ‘মরি হায়, চলে যায়, বসন্তের দিন চলে যায়’। তাঁর গান গওয়া থেমে যাবে সেই ভয়ে অস্থির ছিল সে। তারপরও নতুন বছরের আলোর পরশ পাওয়ার ব্যাকুলতায় তাকে শান্ত করে দেয়। তার স্বপ্ন, বছর ঘুরে আবার বসন্ত আসবে। কিন্তু আজ যে নতুন সূর্য আলো ছড়াচ্ছে সেই আলো কি কোকিলের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে? না কি কোকিলের স্বপ্নের সঙ্গে আমাদের স্বপ্নও চর্ণ হয়ে যাবে।

আমরা যে সময়টা অতিক্রম করছি সেটা কতটা ভয়াবহ তা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়। সেসব দেশে মানুষের মৃত্যুর মিছিল আমাদেরও নির্বাক করে দিয়েছে। আধুনিক দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানও অসহায় হয়ে তাকিয়ে দেখছে সেই মৃত্যুর মিছিল। যেন কারো কিছু করার নেই। আমাদের সব অর্জন, সব দম্ভ-অহংকার চূর্ণ করে দিয়েছে একটি ভাইরাস। তাই করোনার কোপ থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে। থেমে গেছে আমাদের অর্থনীতির চাকা। থামিয়ে দিয়েছে আমাদের চিরচেনা প্রকৃতিকে। আজ আলোর শিখা কালো হয়ে জ¦লছে মনে হয়। এই অমানিশা কাটতে আমাদের জোট বাধতে হবে। আমরা বাঙালি একজোট বেধে করোনা মোকাবেলায় কাজ করবো। প্রকৃতি আমাদের ব্যবহারে রুষ্ঠ হয়েছে। তাকে শান্ত করতে আমাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। 

আমরা জানি না, কবে আমরা স্বাভাবিকভাবে স্বজনের সঙ্গে মিলিত হবো। আমাদের বৈশাখ, মেলা, পার্বন, আনন্দ আয়োজন কবে প্রাণ ফিরে পাবে। আজ যখন নতুন বছরের নতুন সূর্য আমাদের পরশ দিচ্ছে, তখন গোটা দেশ স্তব্ধ। যে যেমন আছে স্থিরচিত্র হয়ে গেছে। নতুনের ছোঁয়া আমাদের অজানা আতঙ্ক থেকে মুক্তি দেবে কি না জানি না। আমরা চাই, বাংলা নতুন বছর করোনার দুর্যোগ থেকে আমাদের মুক্তি দেবে। একদিন এই অমানিশা কাটবে। অগ্নিস্নানে শুচি হবে এই পৃথিবী। এটা কামনা করা ছাড়া আমাদের আর কি-ই বা করার আছে। আমরা এবারের বৈশাখকে আগামীর শান্তির আহ্বান হিসেবে দেখতে চাই। অবশ্যই এই প্রকৃতি শান্ত হাবে। আবার আমরা প্রাণে প্রাণ মিলে এক সঙ্গে গাইতে পারবো ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো, তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা’।