বুধবার, ০৩ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

মুকুল দাস

April 18, 2020, 10:27 p.m.

শান্তি দাস: কেবল ছবি, কেবল স্মৃতি
শান্তি দাস: কেবল ছবি, কেবল স্মৃতি
শান্তি দাস - ছবি: ভোরের আলো।

শেষ থেকে শুরু। যেদিন সাংস্কৃতিক সংগঠল শান্তি দাস মারা যান, সেদিন বিকেল চারটের সময় ওয়ার্কর্স পার্টি বরিশাল জেলার সভাপতি নজরুল হক নীলু মুঠোফোনে নাজালো, শান্তি দা’র অবস্থা খুব একটা ভালো না, আর সময় দেবে কি না জানি না। জানতাম ক্যান্সারের সঙ্গে ধীঘদিন তাঁর বসবাস। আমি শান্তি দাকে দেখার উদ্দেশ্যে রাখাল বাবুর পুকুর পাড়ে আাসতেই নাট্যজন কাজল ঘোষ আমাকে দেখতে যেতে নিষেধ করে। একই সঙ্গে বাসায় ফিরে যেতে বলে। করোনা দুর্যোগের ভয়ে ওই নির্দেশনা ছিল কাজল ঘোষের। কাজলকে বলি, আমি দূর থেকে দেখবো। কাজলের নিষেধ না মেনে আমি প্রথমে রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী বিশ্বজিৎ সেনগগুপ্তর বাসায় যাই। বিশুর সঙ্গে শান্তি দা যেখানে থাকতেন সেই বাড়ির দোতলায় গিয়ে জানালার বাইরে থেকে দেখলাম শায়িত শান্তি দাসকে। চোখ মেলা, শ্বাসকষ্টের জন্য কৃত্রিম (আর্টিফিশিয়াল রেসিপ্রেশন) শ্বাসপ্রাশ্বাস চলছে। আমি হাত নাড়লাম। কিন্তু ওপক্ষ থেকে কোন সাড়া (রেসপন্স) পেলাম না। মন খারাপ করা অনুভূতি নিয়ে বাসায় ফিরি। প্রায় দু’ঘন্টা পর বিশুই আমাকে বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মত সেই নিদারুণ দুঃসংবাদটি দিল। ‘শান্তি দা নেই’।

আশির দশকের প্রথম দিকে শান্তি দাসের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি তখন মহাবাজ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। আমার বিদ্যালয় সংলগ্ন সরকারি উলালঘূণী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে শান্তি দাস কর্মরত। সময় পেলেই শান্তি দাস আসতেন আমার কাছে, আমিও যেতাম তার কাছে। যথারীতি দুপক্ষেই চা-জলখাবারের আয়োজন থাকতো। এভাবেই সম্পর্ক এবং সখ্য গড়ে ওঠে। পরে যখন জানলাম শান্তি দাস ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য এবং গণশিল্পী সংস্থার সভাপতি, তখন ঘনিষ্ঠতা আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। কারণ আমি নিজেও রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকে বাম ঘরানার।

একবার গণশিল্পী সংস্থা বরিশাল শাখা দু’দিন ব্যাপী গণসঙ্গীত প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। সভাপতি শান্তি দাস এই প্রশিক্ষণ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দায়িত্ব দেন প্রয়াত গণসঙ্গীত শিল্পী স্বয়ম্ভূ সরকারের ওপর। গণসঙ্গীতের প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন প্রয়াত গণসঙ্গীত শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা আক্কাস হোসেন ও আমি। আক্কাস ভাই দু’টি গান শিখিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি শহীদ আলতাফ মাহমুদ গীত ‘রিক্সা চালাই মোরা রিক্সাওয়ালা’। আমি শিখিয়েছিলাম হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সলিল চৌধুরীর দুটি গান। ‘বাঁচবো বাঁচবোরে আমরা’ ও ‘মানবো না এই বন্ধনে’। রাজনীতি সচেতন, সংস্কৃতি মনস্ক, বামপন্থী শান্তি দাস যে কোন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

গণশিল্পী সংস্থা বরিশাল শাখা ২০১৬ সালে প্রয়াত নাট্যজন মিন্টু বসু এবং আমাকে স্মারক সম্মাননা প্রদান করে। ইতোমধ্যে শান্তি দাস আরো একটি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দেন। শুদ্ধভাবে নজরুলগীতি পরিবেশনের লক্ষ্যে এবং নজরুলগীতির প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলেন ‘নজরুল সাংস্কৃতিক জোট’। এই সংগঠনের সভাপতি শান্তি দাস ও সম্পাদক গোপাল কৃষ্ণ গুহ রিপন।

নজরুল সাংস্কৃতিক জোট বরিশাল শাখা দু’দিনব্যাপী একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছিল প্রান্তিক সঙ্গীত বিদ্যালয়ে। ঢাকা থেকে আমার শ্যালিকা দীপু সমদ্দারের নেতৃত্বে এসেছিলেন প্রশিক্ষণ দিতে ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক নজরুলগীতির শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল, কল্পনা আনাম, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, করিম এইচ খান ও মাহমুদুল হাসান। প্রশিক্ষণ শেষে যেদিন ঢাকা ফিরে যাবে প্রশিক্ষকগণ সেদিন আমার শ্যালিকা নজরুলগীতির শিল্পী দীপু সমদ্দারের সৌজন্যে ঢাকা এবং বরিশালের সবাইকে দুপুরে খাবারের নেমন্তন্ন করি। ঢাকা ছাড়া যারা এই নেমন্তন্নে অংশগ্রহণ করে তাদের মধ্যে ছিলেন শান্তি দাস, গোপাল কৃষ্ণ গুহ রিপন, বাসুদেব ঘোষ, শুভংকর চক্রবর্তী, শেখ নাসের জামাল, সাঈদ পান্থসহ অন্যান্য অনেকে। শান্তি দাসের মতো নিপাট ভালো মানুষের মৃত্যুতে আমি হারালাম এক সহযোদ্ধাকে। কমরেড লাল সালাম।