বুধবার, ০৩ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

আজমল হোসেন লাবু

May 7, 2020, 10:45 p.m.

যা কিছু হারায়, সবই কি চুরি!
যা কিছু হারায়, সবই কি চুরি!
মন্তব্য প্রতিবেদন। - ছবি: ভোরের আলো।

ধীরে ধীরে করোনা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আশার টুটি চেপে ধরে হতাশাই যেন ক্রুড় হাসি হেসে চলেছে। সবর্ত্র অন্ধকার। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ এখন আলোর সন্ধানে। মিলছে না আমাদেরই কারণে। তা না হলে কি করে সম্ভব এমন দুর্বিসহ সময়ে আমাদের এহেন কার্য। যা শুরু হয়েছে করোনার পথ চলার সঙ্গে সঙ্গেই। বলা যায় প্রায় একই সঙ্গে। তার নাম ‘চুরি’! এই তীব্র ভয়াবহ করোনার সময় নিরন্ন ক্ষুধার্ত মানুষের ত্রাণ সেও কি চুরি করা সম্ভব? পত্রিকা, সাংবাদিক, পুলিশ, র‌্যাব বলছে চুরি হচ্ছে। যদিও আমার একটি ক্ষুদ্র ধারণা ছিলো, এই মহামারীকালে লকডাইনের কারণে সকল শ্রেণি পেশার চেয়ারগুলি মূলত কার্যহীন। সুতরাং নির্দিধায় এমনটা ভাবাই যায় যে, চুরি আপাতত স্থগিত। তা হলে, কেন এমন চুরির প্রশ্ন এমন অসময়? এখন তো প্রতিটি মানুষ সমষ্টির প্রয়াসে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত। এর মধ্যেও চুরি? বন্ধুর প্রশ্ন, আচ্ছা এর মধ্যেও চুরি কি সম্ভব? যা কিছু হারায়, তার নবই কি চুরি? এটি কোন চুরি করার সময়?

আমার বন্ধুর এমন প্রশ্নের উত্তর দেইনি। খুবই ইচ্ছে হচ্ছিল উল্টো প্রশ্ন করবার, সেটা হলো- চুরির সময়টা তাহলে কখন? না প্রশ্নটা করা হয়নি। কারণ আমি জানি এর উত্তর। আপনিও জানেন। জানে আমার বন্ধু, জানেন সবাই। যিনি চুরি করেন সম্ভবত তিনিও কম বেশি জানেন। অথবা নাও জানতে পারেন। যেমন আমরা যা করি তার সকল কিছুই কি জেনে বুঝে করি, করি না তো? ধরুন এই আলোচ্য বিষয়েরই আরেকটি সমার্থক প্রশ্ন- আচ্ছা সব সময় চুরি করলে দেশটা চলবে কেমন করে? ধরুন এই প্রশ্ন কর্তা আপনি, আমি বা আমরা প্রতিদিন বাড়ি ফিরে পকেটে অযাচিত টাকাগুলো যখন দেখি তখন এমন প্রশ্ন কি জাগে? যদি জাগতো কোথাও কারো মনে, যদি অপরিচিত টাকাগুলোকে বা অর্জনকে চুরি মনে হত, তাহলে বোধকরি চুরি বিষয়ক প্রশ্নগুলো আর থাকতো না। আসলে আমরা স্বভাবগতভাবেই অন্যকে যা কিছু বলতে বেশ পছন্দ করি। কিন্তু শুনতে ততটা নয়। অন্যের কর্মটি চুরি অথচ একটু ভিন্ন আদলে আমার কর্মটি তেমন নয়। 

এটা খুবই স্বাভাবিক, আমরা সারাদিন নানান প্রয়োজনে যা যা করি তার সবটাই যথাযথ বা বৈধ করি কি? তাহলে যে কারণেই হোক কাজের যে অংশটুকু বৈধ নয় তাকে কি বলা যায়, কি বলা উচিত? চুরি বলবো কি? চুরির আভিধানিক অর্থের বাইরেও নানান রূপের চুরিকেও কি আমাদের বুঝতে হবে না? একজন ছাত্র পড়িয়ে যা নিচ্ছে আর যা নেওয়া তার উচিত এর পার্থক্যকে কি বলা যায়? আইন-শৃংখলায় যারা নিত্য নিবেদিত থাকেন রাস্তায়, কাজের শেষে তাদের পকেটের টাকাটাকে কি স্ক্যান করে দেখা সম্ভব? সেই টাকায় কতো হাতের ছাপ? বলা কি যায়, উচিত কি, এক পকেটে এতো হাতের টাকা কেন? আইন আদালত পাড়ায় কলমের যে খোচায় মক্কেলের অন্তর্বাসের টাকা রাখাও সম্ভব হয় না। তাকে কি বলে? রাজস্ব খাতে অডিট নামের আড়ালে সমাধানকল্পে যে অর্থের ব্যবহার তাকে কি বলবো? হাজার হাজার টাকা দামের পর্দা, বালিশ, কম্বল ক্রয়কে চুরি বলা কি ঠিক হবে? মাত্র কিছুদিন পূর্বেও রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে ক্যাসিনো চক্রের কাছে যে টাকার স্তুূপ, স্বর্ণালঙ্কার এবং এফ.ডি.আর পাওয়া গেল তাকে কি বলা যায়?

বাংলাদেশের ভূমি সংক্রান্ত কোন অফিসে গিয়েছেন কেউ কোন প্রয়োজনে। মিটিয়েছেন প্রয়োজন? যদি জিজ্ঞেস করি কিভাবে? কি হবে তার উত্তর? না বলতে হবে না। আমরা কেউই এর বাইরে নই। আমাদের প্রাত্যহিক সর্বত্র আরোহণ এবং অবরোহণের প্রতিটি ধাপে ধাপে চৌর্যবৃত্তির টাইলস লাগানো। চলতে হলে ওর উপরে পা রেখেই চলতে হবে আমাদের। 

তা হলে খামাখা কিসের আলোচনা, কিসের চোর আর চুরি? এ আলোচনার কোন প্রয়োজন পরে কি? কোন চোরের কথা বলবো। তবে হ্যাঁ, চোর মানে যদি সেই অতীত কালের সিঁধেল চোরের আলোচনা হয় তা হলে অবশ্য সে কথা ভিন্ন। যদিও সে আজ আর নেই কোনখানে। তার সমস্ত চিন্তা, চেতনা, যোগ্যতা কথন যেন ডিজিটালাইজল্ড করে আমাদের গায়ে বর্ম করে চাপিয়ে দিয়েছে। অতএব এই কঠিন করোনাকালেও যা দেখছি যা শুনছি যা জানছি সে চুরি তো আমাদের উত্তরাধিকার! সময় যত খারাপই হোক তাকে ছাড়া আমরা চলি কেমন করে। আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতে গত ২৫ বছরে যা ঘটেছে তা আমাদের এই উত্তরাধিকারের চরম অনুশীলনের ইতিহাস। বলা যাবে না এমন কথা। বলতে নেই। বললেই বিপদ পদে পদে। যদিও ত্রাণের চাল, ডাল, তেল চোর, চুরি খুব ভালো করে বলা যাবে। এতে কোন ভয় নেই বিপদও তেমন নেই। উল্টো আছে প্রমোশন, আছে সুনাম, আছে অর্জন। আরো আছে রাজনীতির বিনি সুতোয় মালা গাঁথা। এমন কাজগুলোর সামান্য ভুল বা কিছু উদ্দেশ্যপ্রনোদিত হলেও তেমন অসুবিধায় পরেন না কেউ। 

মাঝে মাঝে খুব ভাবতে ইচ্ছে হয় আমরা এতোটা ভোলা মনের কেন? তা না হলে জাতির পিতার ভাসনের সেই বাণী কেমন করে ভুলে থাকি? ‘সবাই পায় তেলের খনি, সোনার খনি, আমি পাইছি চোরের খনি’! স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি সেই খনিরই সংরক্ষণ চলেছে বলেই আজো সে আছে। একেবারেই বিলুপ্ত হয় নাই। তাহলে হঠাৎ করে সে নাই হয়ে যাবে কেমন করে? তাইতো পারছি এমন বিভিষিকাময় করোনা সময়েও ত্রাণের সামগ্রী চুরি করতে। না আর ভালো লাগছে না। কোন চোরেরই কোন কিছু নিয়ে বলতে। তার থেকে ভালো একটি গল্প বলি মাত্র সেদিন পড়েছি ভালো মনে আছে কি না বলতে পারবো না। একই সঙ্গে বলতে পারবো না এর লেখকের নাম। কারণ যার লেখায় পড়েছি তিনিও বলেছেন তিনি জানেন না এর লেখক কে। সুতরাং অযথা নামটি না খুঁজে বরং গল্পটি বলি।

গল্পটি এরকম- এক রাজনীতিবিদ আছেন হোম কোয়ারেন্টাইনে। নেতার আবার অভ্যাস একটু-আধটু পান করা। এই দুঃসময়ে পাবেন কোথায়? তাই প্রতিদিন সংগ্রহে থাকা মদ কম করে পান করেন। রাখার সময় বোতল খেয়াল করে দেখেন কতটুকু খেলেন। সন্ধ্যাকালীন পানের পর বোতল রাখতে দেন কাজের ছেলে আবদুলকে। আবদুল অন্য সময় বাংলা খায়। কিন্তু এখন করোনাকালে বাংলা পাবে কই? আর তা ছাড়া সাহেব বলে দিয়েছেন হোম কোয়ারেন্টাইন। বাড়ি থেকে বের হওয়া যাবে না। আবদুল বাড়িতেই থাকে। বাড়িতে কাজ করলেও আব্দুলও রাজনীতি করে। নেতার সমর্থনে মাঝে মধ্যে মিছিল-মিটিংয়ে যায়। তাই তার গলার স্বরও একটু উঁচু। নেতার পানের পর আবদুলও বোতল থেকে নিয়ে একটু-আধটু পান করে। তারপর পানি মিশিয়ে সমান করে বোতল রেখে দেয়। নেতা পরদিন খাওয়ার সময় দেখেন বোতলে যা রেখেছিলেন সব ঠিক আছে কি না। তারপর নেতা আবার পান করেন। এদিকে আবদুল তার কাজ করে চলছেই। এভাবে চলতে থাকে। একদিন পান করতে গিয়ে নেতা দেখেন মদটা কেমন জানি পানসে। অ্যালকোহলের নামগন্ধ নেই। নেতা বুঝতে পারেন কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়। ড্রয়িংরুম থেকে হাঁক দেন- আবদুল! কই তুই? আবদুল জবাব দেয়, লিডার আমি কিচেনে। নেতা বললেন, তুই হুইস্কিতে পানি মিশিয়ে রেখেছিস কেন? হুইস্কি গেল কই? আবদুল জবাব দেয় না। নেতা ছুটে গেলেন কিচেনে। বললেন, তোকে জিজ্ঞেস করলে জবাব নেই কেন? আবদুল বলল, নেতা! কথা কিভাবে বলব, কিচেনে শুধু নামের ডাকটা শোনা যায়। পরের কথাগুলো শুনতে পাই না। নেতা বললেন, এটা কি ধরণের কথা। আবদুল বললো, লিডার! আপনি কিচেনে থাকুন। আমি ড্রয়িংরুমে গিয়ে ডাক দিচ্ছি। আপনি দেখুন শোনেন কি না। নেতা এ প্রস্তাবে রাজি হলেন। আবদুল গেল ড্রয়িংরুমে। বললেন, নেতা শুনতে পান? নেতা বললেন অবশ্যই শুনতে পাই। এবার আবদুল বলল, ত্রাণের বরাদ্দ চুরি করেছে কেডা? কিচেন থেকে জবাব নেই। পাঁচ তারকা হোটেলে পাপিয়ার আমন্ত্রণে গেছিলো কেডা? কিচেন থেকে উত্তর নেই। এবার আবদুল বলল, ভোটের সময় কে বলেছিলো সুখে-দুঃখে তোমাদের পাশে আছি। অথচ এখন করোনাকালে লকডাউন হয়ে বাড়িতে বসে আছে কে? সরকারি প্রকল্প থেকে ভোটে খরচ করা টাকা ওঠালো কে? কিচেন থেকে জবাব আসে না। আবদুল কিচেনে গেল। বলল, কিছু শুনতে পেয়েছেন লিডার? জবাবে নেতা বললেন, তুই ঠিক বলছিস কিচেন থেকে শুধু প্রথম ডাকটাই শোনা যায়। বাকি কিছু শোনা যায় না’। 

এটা নিছকই গল্প অন্য কিছু নয়। ভেবেছিলাম ২৫শে বৈশাখের মত একটি তারিখে দাঁড়িয়ে অন্যদের চোরের গল্প লিখছি কেন? তবে কবিগুরু কি চোর নিয়ে কিছু লেখেননি? তা কি করে হয়। হঠাৎ মনে পরে গেল তাঁর সেই কথাগুলো ‘ভূতের মতন চেহারা যেমন নির্বোধ অতিঘোর, যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোর। উঠিতে বসিতে করি বাপান্ত শুনেও শোনে না কানে, যত পায় বেত না পায় বেতন, তবু না চেতন মানে’। ঠাকুর লিখেছিলেন বটে চোরের জন্য বেতের কথা সবিনয়ে জানাচ্ছি আপনাকে এখন চোরের জন্য সব আছে শুধু বেত নেই। আমাদের এখন এই বেতের খুব প্রয়োজন। কিন্তু হচ্ছে না। করোনাও পারছে না তেমনটা। করোনা যদি সত্যি সত্যি এই সমাজের সমস্ত অসঙ্গতি নির্মাতাদের খুঁজে খুঁজে আক্রমণ করতে পারতো তাহলে কি ভালোই না হতো। ভাবা যায় তেমন আক্রমণ শেষের এক পৃথিবী। আহা কি সুন্দর সেই পৃথিবী। সু স্নিগ্ধ, সুশীতল, ভয়হীন, ভাবনাহীন, স্বচ্ছ, পরিপূর্ণ এবং মানবিক। জানি সে সম্ভব নয়। জানি করোনাও চরিত্রহীন। তার কোন নির্দিষ্ট রূপ নাই। অতএব এ পৃথিবীতে চোরের রাজই চলবে। করোনাও তাদের স্বসম্মানে চাল, ডাল, তেল চুরিতে সাহায্যই করবে। তা হলে আর কেন কথা বলি, কেন সময় নষ্ট করি? কেন বিশ্বাস করি না আমাদের রয়েছে সর্ষেতেই ভূত।