শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

May 7, 2020, 11:02 p.m.

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব ১১)
ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব ১১)
ডাক্তার সৌরভ সুতার। - ছবি: ভোরের আলো।

করোনায় ঝুঁকি জেনেও যারা মাঠে কাজ করছেন তাদের জন্য আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। সরকারি-বেসরকারি যেসব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এই ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন তাদের নিয়ে ভোরের আলোর বিশেষ আয়োজন। ধারাবাহিকভাবে আমরা এই উদ্যোগ তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আমাদের আজকের শিরোনামের ব্যক্তি হচ্ছেন ডাক্তার সৌরভ সুতার

এই মুহূর্তে বিশে^র অন্যতম হন্তারকের নাম হচ্ছে কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস। উন্নত বিশে^র আধুনিক প্রযুক্তির ফলাকে অকেজো করে দিয়ে দাবরে বেড়াচ্ছে করোনা। যার আঁচে আমাদেরও পোড়াচ্ছে। দিনে দিনে আমরা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। তবে উন্নত দেশর মৃত্যুর মিছিল আমাদের চেতনাকে কোনভাবেই নাড়া দিতে পাড়ছে না। সেসব দেশে স্বজন হারানোর কান্নার রোল যেন আমাদের কানে পৌঁছচ্ছে না। তাই আমরা স্বজন হারানোর ব্যাথায় ব্যথিত হতে পারছি না। আবার দেশে কোথাও কোন ব্যক্তির করোনা পজেটিভ হয়েছে শুনে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি। করোনা আক্রান্ত রোগীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। করোনা শুনলে সেই এলকায় কেউ যেতে সাহস করছে না। নিজে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে ভীত গোটা দেশ। কোথাও আমরা যেন নিরাপদ নয়। দিন-রাত কেবল মৃত্যুপথযাত্রীদের অনুসরণ করে চলেছি। তারপরও নাম না জানা হন্তারক করোনা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে ফিরছে মানুষ। চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ সর্বত্র চলছে করোনা মহামারী জয়ের নিরন্তর চেষ্টা।

করোনা শুনলে যখন তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে বেড়ায় গোটা সমাজ, তখনও কিছু মানুষ এইসব রোগীদের পাশে থেকে সহযোগী হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। তাদের মধ্যে অনতম হচ্ছেন চিকিৎসক। এর বাইরে রোগীকে হাসপাতালে পাঠানো, রাস্তায় ফেলে রাখলে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং মৃত্যুর পর লাশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত আছেন পুলিশ প্রশাসন। সতর্কতায় আছেন জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, গণমাধ্যমসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকার পরও যারা এই কঠিন দয়িত্ব পালন করছেন তারা আমাদের বাংলাদেশের নতুন ঠিকানার নাম। সেই নতুন ঠিকানার জন্য যারা সম্মুখ সারিতে যুদ্ধ করে চলেছেন তারা করোনা যোদ্ধা। করোনাকে জয় করার মন্ত্রে যেন তারা দীক্ষা নিয়েছেন। এই পৃথিবীকে মানুষের বাসোপযোগী করে তোলাই যেন এঁদের ধেয়ান-জ্ঞান। ঝুঁকি জেনেও নিরন্তরভাবে মাঠে থেকে কাজ করে চলেছেন তাদের একজন ডা. সৌরভ সুতার। বর্তমানে হাসপাতালের করোনা চিকিৎসাসহ সব বিষয়ে তদারকির একজন মানুষ হিসেবেও সৌরভ সুতারের নাম অগ্রগন্য হিসেবে উঠে আসছে। তাঁর প্রতি আমাদের একান্ত শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

করোনার অজুহাত এবং সামাজিক দূরত্বের নামে অনেক মানুষ ঘরবন্দী। করোনায় নিজেরা আক্রান্ত হবেন সেই চিন্তা তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। অনেকের আশা করোনার সময়টা পার হয়ে আবার হুংকার দিয়ে বের হবে। তারা কোনভাবেই মানুষের সহযোগী হতে পারছেন না। তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। সেই মুহূর্তে করোনা যোদ্ধা চিকিৎসকরা স্বমহিমায় আছেন মাঠে। তারা নিজেরদের স্বাস্থ্যঝঁকিকে পাশে সরিয়ে রেখে দিন-রাত করোনা মোকাবেলায় কাজ করছেন। তাদের একজন চিকিৎসক হচ্ছেন সৌরভ সুতার। ঘর ছেড়ে হাসপাতালে থেকে কিভাবে অন্যদের সাহস যোগাচ্ছেন তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। রোগীসহ সহকর্মী, শিক্ষানবীশ চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স, তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সহাস হয়ে পাশে থাকছেন। সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা দিয়েও তাদের মনোবল বাড়িয়ে তুলছেন।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. সৌরভ সুতার। দায়িত্ব পালন করছেন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে। তাঁর স্ত্রী ডা. ইন্দ্রানী কর ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন মেডিকেল কলেজের পিসিআর (করোনা) ল্যাবে। করোনা কখন কিভাবে কাকে আক্রমন করবে সেই বিষয়ে এখনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। তাতে কি তারপরও অজানা এই শত্রুকে মোকাবেলা করতে চেষ্টার অন্ত নেই। সেই চেষ্টার কারিগরদের অন্যতম হচ্ছেন আমাদের এই চিকিৎসকরা। করোনা মোকাবেলার এই যুদ্ধে সৌরভ সুতারও অনন্য। তাই ডা. সৌরভ সুতার এবং তাঁর স্ত্রী ডা. ইন্দ্রানী করসহ এই যুদ্ধে যেসব ডাক্তাররা অংশ নিচ্ছেন তাদের সবার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা।

তাদের এই যুদ্ধে হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন এবং মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. অসিত বরণ, পিসিআর ল্যাবের ডা. আকবর আলী, জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা। জ্যেষ্ঠদের পরামর্শ এবং অন্যান্য সহকর্মীদের সহযোগিতায় নিরন্তরভাবে কাজ করে চলেছেন ডা, সৌরভ সুতার।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতলের আউটডোর চিকিৎসক অ্যাসোনিয়েশনের সভাপতি ডা. সৌরভ সুতার। তবে করোনা ওয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা টিমেরও একজন। করোনা শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরে পিপিইর স্বল্পতা ছিল। তখন নিজেদের উদ্যোগে পিপিই সংগ্রহ, আউটডোর সব ডাক্তারদের জন্য ফেস শিল্ড, কেএন ৯৫ মাক্স সরবরাহ করা হয়। করোনা নমুনা সংগ্রাহত বিভিূতির পাশে সহযোগী হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রথম রোজার দিন হাসপাতালের সব চিকিৎসক এবং ছাত্রাবাসের সাড়ে ৩০০জনকে ইফতারির ব্যবস্থা করেছেন। বর্তমানে করোনা ওয়ার্ডে স্বাস্থকর্মীদের ইফার সরবারা চলছে। তাদের অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ইউভি আলট্রা ভয়োলেট মেশিন আর্থিক সহযোগিতায় স্থাপন করা হয়েছে। চিকিৎসক এবং শিকক্ষানবীশ চিকিৎসকদের চিকিৎসাসহ ঢাকায় পাঠানোর জন্য অ্যাম্বুলেঞ্চ খরচসহ যাবতীয় দায়িত্বও বহন করে চলেছেন তিনি। একই সঙ্গে হাসপাতালের আউটডোর ও ইনডোর চিকিৎসকার তদারকীও করে চলেছেন পরিচালক ডা. বাকির হোসেনের পরামর্শে।

হাসপাতারের বাইরে ডা. সৌরভ সুতার নিজের এক মাসের বেতনের অর্থ দিয়ে করোনায় অসহায় মানুষের সহযোগী হয়েছেন। তার গ্রামের বাড়ি স্বরূপকাঠির গুয়ারেখা ইউনিয়নের অসহায় মানুষের ভরসা হয়ে কাজ করছেন। ইউনিয়নের ০৯টি ওয়ার্ড হতে ৪০জন করে ৩৬০জন এবং আরও অতিরিক্ত ৪০জনসহ মোট ৪০০জনকে খাদ্যসামগ্রি সরবরাহ করেছেন। তার এই কাজে তার কয়েক বন্ধুও সহযোগী হয়েছেন। গত ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিল ইউনিয়নের ১২৯জন অসহায় মানুষের পাশে চাল, ডাল, আলু, সাবনসহ নিত্যপ্রয়োজনী দ্রব্য সরবরাহ করেন। ইউনিয়নের কিছু মানুষকে ধারাবাহিকভাে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করে চলেছেন তিনি। করোনা ছাড়াও সৌরভ সুতার তাঁর ইউনিয়নের কোন মানুষের কাছ থেকে ভিজিট নেন না। হাসপাতলে দিনে ১২টা পর্যন্ত কর্মঘন্টা থাকলেও তিনি সাড়ে তিনটা পর্যন্ত কাজ করেন্ কোন কোন ক্ষেত্রে আরও সময় দিয়ে সহযোগী হয়ে থাকেন। তার মতে সহযোগী হয়ে কাজ করলে করোনা মোকাবেলা খুব একটা কঠিন হবে না বলে আমাদের বিশ্বাস।

করোনার এই ঝড়ের প্রাদুর্ভাব জানলেও ঝড় থেকে মুক্তির পথ এখনো অনেকটাই অজানা। তারপরও চেষ্টা চলছে নিরন্তর। এই চেষ্টার কারিগররা দিন-রাত শারীরিক ও মানসিকভাবে করোনার ঝড় মোকাবেলায় কাজ করছেন। চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি জেনেও তারা অন্য সবার মঙ্গল কামনায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনই নয়, তারা দায়বোধ থেকেও এই ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। তাদেরই একজন আমাদের প্রিয় চিকিৎসক ডা. সৌরভ সুতার। তার প্রতি আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

আসুন, সামাজিক কিংবা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে করোনার এই যুদ্ধ মোকাবেলায় যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করি। নিজের দায় অন্যের ওপর না চাপিয়ে, নিজের কাজটি নিজে করি। মৃত্যুকে পাত্তা না দিয়ে সচেতন ও সতর্কতার সঙ্গে মানুষকে পাত্তা দেই। এই মুহূর্তে ঝুঁকি জেনেও মাঠে থাকা করোনা যোদ্ধাদের একজন হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াই।