শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

May 8, 2020, 11:50 p.m.

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব ১২)
ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব ১২)
ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা। - ছবি: ভোরের আলো।

করোনায় ঝুঁকি জেনেও যারা মাঠে কাজ করছেন তাদের জন্য আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। সরকারি-বেসরকারি যেসব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এই ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন তাদের নিয়ে ভোরের আলোর বিশেষ আয়োজন। ধারাবাহিকভাবে আমরা এই উদ্যোগ তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আমাদের আজকের শিরোনামের প্রতিষ্ঠান নার্সিং স্বাস্থ্য সেবা

 

কেভিড-১৯। করোনা বিশ্বের নিদারুণ, নির্দয় ও নির্মম এক ভাইরাসের নাম। যে ভাইরাস আমাদের আত্মার সম্পর্কগুলো ছিন্ন করে দিচ্ছে। আমরা দেখছি মৃত্যুর মিছিল। কখনো স্বজনের আহাজারী। আবার কখনো করোনা আক্রান্ত স্বজনকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং লাশ ফেলে পালিয়ে যাওয়ার মতো নির্মম ঘটনা। করোনার বিরুদ্ধে নিরন্তর প্রতিরোধের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে রূপ পরিবর্তন করে করোনা আমাদের অক্টোপাসের মতো জাপটে ধরছে। সেখান থেকে আমরা কোনভাবেই বের হতে পারছি না। দিনে দিনে আমরা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। সেই ঝুঁকি জেনেও যারা দিন-রাত মাঠে থেকে লড়াই করে চলেছেন তাদের কজনকে আমরা চিনি কিংবা জানি? করোনা যোদ্ধাদের অনেকের নামই থেকে যাবে অন্তরালে। তারপরও তারা করোনা যুদ্ধের সম্মুখভাগের যোদ্ধা হিসেবেই দায়িত্ব পালন করবেন। এমন দৃঢ়তা দেখিয়ে চলেছেন সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত অনেকে। তারা আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত কৃতজ্ঞাতাপাশে আবদ্ধ করে চলেছেন।

করোনা যোদ্ধার কথা উঠলেই বলি এই যুদ্ধ ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের। ডাক্তারদের পরামর্শ যারা ২৪ ঘন্টা তামিল করে রোগীর সেবা দেন তারা হচ্ছেন আমাদের নার্স। তাদের বিষয়টি সেভাবে উঠে আসছে না। তারা থেকে যাচ্ছেন অনেকটা অন্তরালে। সারা বিশে^র নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা পৃথিবীর এই করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ করে চলেছেন। আজকের আমাদের কাছে করোনা যোদ্ধা হিসেবে তারা বিশেষভাবে পরিচিত। বিশে^র আঙিনা ছাড়িয়ে আমরা বাংলাদেশের কথা বলতে চাই। বলতে চাই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সদের কথা। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্স সেবা তত্তাবধায়ক সেলিনা আক্তারসহ করোনা ওয়ার্ড ও অন্যান্য ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করা সকল নবার্সদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। কম বেশি সবাই ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আবার এই সেবা দিতে গিয়ে কেউ কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়ে আইস্যুলেশনেও আছেন।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুইজন নার্স সেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সুইটি আক্তার সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে শিশু সন্তানদের থেকে আলাদা হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন একজন। আমরা তাঁর কথা বলতে চাই। তিনি করোনা যোদ্ধা মনিকা সমদ্দার। যার কথা বলতেই হবে। যিনি এখন ছোট ছোট দুই সন্তানকে রেখে করোনা ওয়ার্ডে সেবা নয়, চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীর সেবা করতে করতে কখন যে তিনি নিজেই আক্রান্ত হয়েছেন জাননে না।

কথা বলতে গিয়ে তাঁর চোখ ছলছল করে উঠলো। ডুকরে কেঁদে উঠলেন। না। নিজের জন্য নয়, প্রিয় দুই ছোট্ট শিশু সন্তানের জন্য। সন্তানের জন্য বুকফাটা আহাজারী থাকলেও এতটুকু টলেননি তিনি। বলেছেন আমার জন্য দোয়া করবেন, সুস্থ্য হয়ে যেন করোনা রোগীর সেবা করতে পারি। এরাই তো আমাদের বৈশ্যিক করোনা মোকাবেলার নির্ভিক যোদ্ধা। আজ আপনার প্রতি আমাদের একান্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকলো। আপনাকে কুর্ণিশ জানাই।

এই করোনা যোদ্ধা বলছিলেন, ‘রোগীর সেবা করাই আমাদের দায়িত্ব। কার করোনা আছে কার নেই সেটা আমাদের বোঝার কথা নয়। সেবা দিত গিয়ে আমি আক্রান্ত হই। গত ৩০ এপ্রিল অসুস্থ্য হয়ে পড়ি। ৩ মে করোনা পজেটিভ আসে। এরপর থেকে করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছি।’ আমার কষ্ট হচ্ছে আমার সাড়ে চার বছরের কন্যা এবং দুই বছর চার মাস বয়সের ছোট্ট ছেলের জন্য। কন্যা যখন বলে মা আমি তোমার সঙ্গে ভাত খাবো, তখন আর নিজেকে সামলাতে পারি না। আবার ছোট্ট ছেলে ফোনে বলে ওঠে মা তুমি কোথায়? আমি কি উত্তর দেবো বলেন তো? আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। তারা বর্তমানে দাদা-দাদির কাছে আছে। তারা বয়স্ক হওয়ায় তাদেরও ঝুঁকি রয়েছে। আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন সুস্থ্য হয়ে আবার রোগীর সেবা করতে পারি।’

আপনার প্রতি কেবল আমাদের নয়, গোটা দুনিয়ার মানুষের দোয়া থাকলো। আপনি অবশ্যই সুস্থ্য হয়ে আমাদের সেবায় নিয়োজিত হতে পারবেন। পারবেন আপনার প্রিয় সন্তানদের স্ব স্নেহে গড়ে তুলতে।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সেবা তত্তাবধায়ক সেলিনা আক্তার ২৪ ঘন্টা তাঁর নার্সদের নিয়ে রোস্টার তৈরি করে সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। হাসপাতেলের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন এবং জ্যেষ্ঠ্য চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি করোনা ওয়ার্ডসহ পুরো হাসপাতালে রোগীর সেবার দায়িত্বটি পালন করছেন। তিনি অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে গিয়ে বলছিলেন, ‘আমরা সবচেয়ে কঠিন ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছি। তার কারণ চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার পর পুরো দয়িত্বটা পালন করতে হয় নার্সদের। ২৪ ঘন্টা রোগীর পাশে থেকে ওষুধ খাওয়ানো, ইনজেকশন দেওয়াসহ যাবতীয় কাজ করতে হয়। রোগীদের সেবা করতে গিয়ে দুইজন নার্স আক্রান্ত হয়েছে। একইভাবে ডাক্তাররাও সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। মূলত করোনা মোকাবেলায় ডাক্তার নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

গত ১৭ মার্চ বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতলে প্রথম করোনা ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি হয়। এরপর থেকে তিন বেলা নার্সদের রোস্টার করে করোনা ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বর্তমানে নার্সদের ১০দিন করোনা ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন শেষে ১৪ দিন বাড়ির বাইরে (সরকার নির্ধারিত হোটেলে) আইস্যুলেশনে থাকতে হচ্ছে। এরপর  করোনা পরীক্ষা করা হয়। যদি করোনা নেগেটিভ আসে, তাহলে পরিবারের সঙ্গে ৭ দিন থাকার সুযোগ পাবে। অষ্টম দিনে আবার ওয়ার্ডের দায়িত্ব নিতে হবে। করোনার কারণে নার্সরা মাসের ২৪দিন পরিবারের বাইরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এইভাবে সকল নার্সরা সেবা দিয়ে চলেছেন।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের বাইরে করোনা আইসিইউ চালু হয়েছে। সেই ওয়ার্ডের দায়িত্বে আছেন মোসাম্মৎ ফরিদা বেগম। তিনিও নিবেদিত প্রাণ হিসেবে ঝুঁকির মধ্যেই দায়িত্ব পালন করছেন। তার মতে করোনার এই প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় কম বেশি সবারই ঝুঁকি রয়েছে। তারপরও সেবার কাজ করেই যেতে হবে। ফরিদা বেগমের মতো করোনা সাধারণ ওয়ার্ডে যারা যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের সবারই প্রায় একই রকম বক্তব্য। করোনা ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করা নার্সদের মধ্যে কবিতা বিশ্বাস, সম্পা, মিলিতা সরকার, লিটন গোমেজ, শহীদুল ইসলাম, সোহেল হোসেন, মুনতাহা মৌরীন, মোস্তাফিজুর রহমান, শাহিনা আক্তার, রফিকুল ইসলাম, শারমিন ইসরাত, মনিরা আমিন, মলয় বেপারী, তানিয়া আক্তার, প্রভা হালদারসহ অনেকে। সবার নাম হয়তো এই লেখায় আনা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময় অন্যান্যদের কাজের বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করবো। সেবা তত্তাবধায়কের সঙ্গে পুরো নার্সদের সমন্বয় করে চলেছেন ডেপুটি সুুপারিনটেডেন্ট মাকসুদা বেগম।

নাম না জানা হন্তারক করোনা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে ফিরছে মানুষ। চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ সর্বত্র চলছে করোনা মহামারী জয়ের নিরন্তর চেষ্টা। সারা বিশ্বে করোনার ভয়বহতার মধ্যে যে যেমন পারছেন শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সহযোগী হযে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। করোনা শুনলে যখন তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে বেড়ায় গোটা সমাজ, তখনও কিছু মানুষ এইসব রোগীদের পাশে থেকে সহযোগী হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। এই কাজে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছেন আমাদের নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। যখন করোনা আক্রান্ত রোগীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। করোনা শুনলে সেই এলকায় কেউ যেতে সাহস করছে না। নিজে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে ভীত হচ্ছেন। তখনও নার্সরা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন।

ডাক্তারের পর নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা যেমন স্বীকার করতে হয়, তেমনি স্বীকার করতে হয় রোগীকে হাসপাতালে পাঠানো, রাস্তায় ফেলে রাখলে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং মৃত্যুর পর লাশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত যারা যাদের। তারা হচ্ছেন আমাদের পুলিশ প্রশাসন। সতর্কতায় আছেন জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, গণমাধ্যমসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকার পরও যারা এই কঠিন দয়িত্ব পালন করছেন তারা আমাদের বাংলাদেশের নতুন ঠিকানার নাম। সেই নতুন ঠিকানার জন্য যারা সম্মুখ সারিতে যুদ্ধ করে চলেছেন তারা করোনা যোদ্ধা। চরম ঝুঁকি জেনেও নিরন্তরভাবে তারা মাঠে থেকে কাজ করে চলেছেন। তাঁদের সকলের কাছে আমাদের একান্ত শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

করোনার এই ঝড়ের প্রাদুর্ভাব জানলেও ঝড় থেকে মুক্তির পথ এখনো অনেকটাই অজানা। তারপরও চেষ্টা চলছে নিরন্তর। এই চেষ্টার কারিগররা দিন-রাত শারীরিক ও মানসিকভাবে করোনার ঝড় মোকাবেলায় কাজ করছেন। চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি জেনেও তারা অন্য সবার মঙ্গল কামনায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনই নয়, তারা দায়বোধ থেকেও এই ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। তার প্রতি আবারো আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

আসুন, সামাজিক কিংবা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে করোনার এই যুদ্ধ মোকাবেলায় যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করি। নিজের দায় অন্যের ওপর না চাপিয়ে, নিজের কাজটি নিজে করি। মৃত্যুকে পাত্তা না দিয়ে সচেতন ও সতর্কতার সঙ্গে মানুষকে পাত্তা দেই। এই মুহূর্তে ঝুঁকি জেনেও মাঠে থাকা করোনা যোদ্ধাদের একজন হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াই।


 

আরো পড়ুন


করোনা ঝুুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব-৮)

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব সাত)

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব ছয়)

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব পাঁচ) : বাংলাদেশ পুলিশ, বরিশাল

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব চার) : জেলা প্রশাসন বরিশাল

করোনা ঝুুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব তিন) : স্বাস্থ্য বিভাগ

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (দ্বিতীয় পর্ব) : নীরব হোসেন টুটুল

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা ( প্রথম পর্ব) : লাল-সবুজ সোসাইটি

পর্ব ৯ - নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. নাজমুল হুদা, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান এবং মো. আতাউর রাব্বি।