শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

May 12, 2020, 11:04 p.m.

দূরে থেকেও কাছে যারা (পর্ব-১)
দূরে থেকেও কাছে যারা (পর্ব-১)
আমাদের আজকের প্রতিষ্ঠান বরিশাল জিলা স্কুলের সকল ব্যাচ। - ছবি: ভোরের আলো।

করোনায় ঝুঁকির কারণে অনেকে মাঠে থেকে সহযোগী হতে পারছেন না। দূরে থাকলেও তারা সব সময় মানুষের কাছে আছেন। কিন্তু তাদের মন পড়ে আছে মাঠের এবং কর্মহীন মানুষের কাছে। দূরে থেকেও কাছের মানুষের ভরসা হয়ে আছেন যারা। ভোরের আলো তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। এখন থেকে ‘ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা’র পাশাপাশি ‘দূরে থেকেও কাছে যারা’ ধারাবাহিকভাবে ছাপা হবে। আমাদের আজকের প্রতিষ্ঠান বরিশাল জিলা স্কুলের সকল ব্যাচ

 

অজানা এক হন্তারকের নাম কেভিড-১৯। বাংলাদেশে করোনা নামে সবার কাছে পরিচিত এই হন্তারক। যার কাছে অসহায় গোটা দুনিয়ার মানুষ। চীনের উহান প্রদেশে প্রথম আক্রামণ শুরু করলেও বর্তমাতে উন্নত দেশে থাবা বিস্তার করে চলেছে। বাংলাদেশেও এই অজানা শত্রু আঘাত হানছে। বিশ্বের নিদারুণ, নির্দয় ও নির্মম এক ভাইরাস করোনা। করোনার এই মহামারী থেকে মুক্তি পেতে আমাদের নিরন্তর চেষ্টা চলছে। তারপরও আমরা কোনভাবেই তার সঙ্গে পেরে উঠছি না। এই ভাইরাস আমাদের আত্মার সম্পর্কগুলো ছিন্ন করে দিচ্ছে। আমরা দেখছি মৃত্যুর মিছিল। কখনো স্বজনের আহাজারী। বাদ যাচ্ছে না ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, আমলা, কামলা, গণমাধ্যমকর্মীসহ সাধারণ মানুষও।

বাংলাদেশে দীর্ঘ প্রায় দুই মাস এই হন্তারক করোনার কারণে সবকিছু বন্ধ হয়ে আছে। কর্মীর কাজ নেই। শ্রমিকের মজুরী নাই, ছাটাই হচ্ছে গণমধ্যমকর্মী, কাজের নিশ্চয়তা হারাচ্ছে পোশাকশিল্পসহ ব্যক্তিমালিকানাধীন সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। অনিশ্চিত এক সময়ের মধ্যে দিয়ে চলছে মানুষ। অনেকের বাড়িতে খাবার সংকট সৃষ্টি করেছে করোনা। করোনার বিরুদ্ধে নিরন্তর প্রতিরোধের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে রূপ পরিবর্তন করে করোনা আমাদের অক্টোপাসের মতো জাপটে ধরছে। সেখান থেকে আমরা কোনভাবেই বের হতে পারছি না। দিনে দিনে আমরা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। সেই ঝুঁকি জেনেও যারা দিন-রাত মাঠে থেকে লড়াই করে চলেছেন তাদের অনেকেই এখন আমাদের কাছে পরিচিত। যাদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছেন, ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ, গণমাধ্যম, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, ব্যাংক কর্মকর্তাসহ অনেকে। যারা নিত্য ঝুঁকি জেনেও মাঠে থেকে সেবা করে চলেছেন।

করোনার এই ঝুঁকি মোকাবেলা করার ইচ্ছা থাকলেও অনেক মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়ে মাঠে থাকতে পারছেন না। কিন্তু তাঁদের মন পড়ে আছে মাঠে। যারা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন তাদের জন্য কিছু একটা করার তাড়না তাদের প্রত্যেক দিন তাড়া করে। তাদের মন খুঁজে ফেরে করোনার এই দুর্যোগের মধ্যে কর্মহীন এবং অসহায় মানুষদের। তাঁদের পাশে কেমন করে সহযোগী হওয়া যায় সেই চিন্তায় উদ্বিগ্ন হন তারা। সেই পথ খুঁজে পেয়ে তারা আর দূরে থাকতে পারেন না। তারা ছুটে চলেন বাড়ি বাড়ি। তাই বলি কেবল মাঠে থেকেই নয়, মাঠের বাইরে থেকেও করোনা মোকাবেলায় কাজ করা সম্ভবব। দূরে থেকেও যারা এমন মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন তারা হচ্ছেন বরিশাল জিলা স্কুলের সকল ব্যাচের শিক্ষার্থী। করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটি ফাণ্ড তৈরির উদ্যোগ নেন। সেই উদ্যোগ আজ করোনা জয়ের এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

না। কোন প্রচারের জন্য নয়। তারা কাজ করে চলেছেন নিভৃতে। জেলা স্কুলের বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের দেওয়া অনুদান নিয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নিদিৃষ্ট দোকান ঠিক করাই আছে। ওই দোকানে তাদের দেওয়া টোকেন নিয়ে প্রয়োজন মোত খাদ্য সামগ্রিসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষ কিনে নিতে পারছেন। এই কাজে তাদের সহযোগিতা দিচ্ছেন মেট্রোপলিটন পুলিশ। যা আজো অব্যাহত আছে। থাকবে আগামীতেও।

বরিশাল জিলা স্কুলের সকল ব্যাচের শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগের পেছনের মানুষ হচ্ছেন স্কুলের সাবেক ছাত্র দীপু হাফিজুর রহমান। দীপুর সঙ্গেই স্কুলের সকল ব্যাচের শিক্ষার্থীদের একটা নিবিড় যোগাযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের এবং দেশের বাইরে থাকা বরিশাল জিলা স্কুলের বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বিকাশ, ব্যাংক এবং বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ পাঠাচ্ছেন। সেই অর্থে সহযোগিতা পাচ্ছেন কর্মহীন, অসহায় মানুষ। এই সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বাড়ি বাড়ি।

মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়। করোনা তখনো বরিশালে তেমন একটা হানা দিতে পারেনি। এরই মধ্যে ২৮ মার্চ দীপু হাফিজুর রহমানের ব্যতিক্রমী উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন বরিশাল জিলা স্কুলের বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। অর্থ সংগ্রহে যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসেন। এই উদ্যোগের সঙ্গে হাত মেলান বুয়েট স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব গ্রেটার বরিশালের সংগঠন ‘ধানসিঁড়ি’, জার্মানের নাগরিক থমস হওফার। থমাস হওফার করোনায় অর্থ সংগ্রহ করে এই ফাণ্ডে দিচ্ছেন। ২৮ মার্চ  প্রথম ৭০ পরিবারের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয় টোকেন। 

খাদ্য সামগ্রি পৌঁছে দেওয়ায় রয়েছে ব্যতিক্রম। নগদ অর্থ কিংবা চাল, ডাল কিনে দেওয়া হচ্ছে না। প্রতি পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে একটি কূপন। সেখানে একটি নিদিৃষ্ট দোকানের নাম উল্লেখ রয়েছে। সেই দোকান থেকে পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী পন্য কিনতে পারছেন। এই টোকেন পৌঁছানো থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট দোকান থেকে পন্য কেনা পর্যন্ত সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছেন মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যরা।

দীপুর হাফিজুর রহমান জানান, শুরুতে ৭০ পরিবার হলেও বর্তমান ১০৩ পরিবারের কাছে ওই সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে ওই পরিবারগুলো একইভাবে সহযোগিতা পেয়ে চলেছেন। প্রথম সপ্তাহে ৭০ পরিবার, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে ৭৫ পরিবার, চতুর্থ ও পঞ্চম সপ্তাহে ৮৬ পরিবার এবং ষষ্ঠ সপ্তাহে বেড়ে ১০৩ পরিবারের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। যা একক পরিবার হিসেবে ৪৯৫ পরিবারের কাছে দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু একই পরিবারের প্রতি সপ্তাহেই ওই পরিমাণ খাদ্যসামগ্রি দরকার। তাই বারবার একই পরিবারের সহায়তা করার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ চলমান আছে ও থাকবে।

শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত ৫ লাখ ৬৩ হাজার ২৮০ টাকা জিলা স্কুলের সকল ব্যাচের এই ফাণ্ডে জমা হয়েছ। এখনও দেশে এবং দেশের বাইরে থাকা জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা ফান্ডে টাকা জমা করার জন্য যোগাযোগ করছেন। ফাণ্ড সংগ্রহের জন্য দীপু হাফিজুর রহমান প্রতি বৃহষ্পতিবার ইউটিউবে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হন। করোনার এই দুর্যোগে তাদের আহ্বান হচ্ছে, ‘বাড়ি থেকে কেউ বের হবেন না’। আপনাদের পাশে সহযোগী হয়ে আছে বরিশাল জিলা স্কুলের সকল ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। আছে সরকার, আছে প্রশাসন। সবাই মিলে করোনার এই দুর্যোগময় সময় পাড়ি দিতে হবে। সবার সহযোগিতায় এই মাহামারীকে জয় করতে চায় তারা। যতদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয় ততোদিন এইভাবে মানুষের পাশে থাকতে চায় জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা।

করোনার এই দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে চিনি ডাক্তার, নার্স  ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। ঝুঁকি জেনেওে দিন-রাত ২৪ ঘন্টা মাঠে কাজ করছেন পুলিশ সদস্যরা। মাঠে আছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। একই সঙ্গে আছেন প্রশাসনের অন্যন্য দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। এর বাইরের একদল মানুষ করোনা মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছেন নিভৃতে। তারা অনেকটা প্রদীপের আলোয় আসছেন না। এই ধরণের করোনা যোদ্ধাদের অনেকের নাম থেকে যাবে অন্তরালে। এই ধরণের যোদ্ধারা আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত কৃতজ্ঞাতাপাশে আবদ্ধ করে চলেছেন।

করোনার এই ঝড়ের প্রাদুর্ভাব জানলেও ঝড় থেকে মুক্তির পথ এখনো অনেকটাই অজানা। তারপরও চেষ্টা চলছে নিরন্তর। এই চেষ্টার কারিগররা দিন-রাত শারীরিক ও মানসিকভাবে করোনার ঝড় মোকাবেলায় কাজ করছেন। তারা অন্য সবার মঙ্গল কামনায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তারা দায়বোধ থেকে কাজ করছেন। একই সঙ্গে দূরে থেকেও সহযোগী হয়ে পাশে আছেন আনেকে। তাদের সবার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা।

আসুন, আমাদের কাছের মানুষদের আর দূরে সরিয়ে না রাখি। দূরে থেকেও সবার আত্মার আত্মীয় হই। দূরে থেকেই কাছের মানুষগুলোর সহযোগী হই। যারা মাঠে থেকে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন, তাদের সহযোগী হতে হলেও আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে দূরে থেকেও কাছের থাকার চেষ্টা করতে হবে। সবাই মিলে সেই চেষ্টার অংশিজন হলে করোনা আমাদের খুব বেশি তাড়িয়ে বেড়াতে পারবে না। অবশ্যই আমরা জয়ী হবো। আমরা করবো জয় নিশ্চয়।