বুধবার, ১২ আগষ্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

May 13, 2020, 10:31 p.m.

করোনা মোকাবেলা না কি ঈদ বাজার!
করোনা মোকাবেলা না কি ঈদ বাজার!
কার্টুনে করোনা। - ছবি: সংগৃহীত।

করোনা মোকাবেলায় শুরু থেকেই সরকার স্বাস্থবিধি মানতে আহ্বান জানিয়ে আসছে। সামজিক দূরত্ব বজায় রেখে কিংবা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সকলকে বাড়ি থাকার জন্য নির্দেশও চলমান। সরকারের পক্ষ থেকে মাঠ প্রশাসনের নিরন্তর চেষ্টাও ছিল বেশ কিছুদিন। কিছু মানুষ নানা অজুহাতে বাইরে বের হলেও বেশিরভাগ মানুষ কিন্তু সরকারের নির্দেশনা মেনে বাড়িই ছিল। একান্ত জরুরী প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কেউ বের হয়েছেন এমন নজির বেশি নেই। কিন্তু লকডাউন শিথিল এবং বাজার খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মানুষের মিছিল শুরু হয়েছে। সবাই এখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ঈদের কেনাকাটায়।
করোনা মোকাবেলার চেষ্টা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ঈদ বাজারের ভীড়ে। সকল নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে যে যার মতো পারছে মার্কেট খুলে বসেছে। সব দেখ মনে হচ্ছে, আগে রোজা এবং ঈদ বাজারের মূল্যায়ন করা দরকার। মনে হচ্ছে, মানুষের ভীড়ে করোনা পালিয়ে যাবে। সরকারের কাছেও এখন করোনা মোকাবেলা না কি ঈদ বাজার চালিয়ে যাওয়া তা বোঝা কঠিন।

বুধবার ২৪ ঘন্টায় সারা দেশে করোনায় নতুন করে ১ হাজার ১৬২ জন আক্রান্ত হয়েছে। ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত হয়ে দেশে মারা গেছেন ১৯জন। এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু ২৬৯জন। সারা দেশে এ পর্যন্ত সর্বমোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ হাজার ৮২২জন। এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিং অনুয়ায়ী আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা সর্বোচ্চ। অথচ এই সময় আমাদের মার্কেটগুলো খুলে দিয়ে কি নতুন করে ঝুঁকিতে ফেলা হলো কি না বুঝতে পারছি না।

রোজা ও ঈদের দোহাই দিয়ে খুলে দেওয়া হয়েছে মসজিদ, মন্দিরসহ সব উপাশনায়ল। মসজিদ থেকে এও বলতে শোনা গেছে, করোনা হচ্ছে আল্লাহর গজব। তাই মসজিদে আসলে এমন কোন ক্ষতি হবে না। তাদের আহ্বান করোনাকে নয়, কেবল আল্লাহকে ভয় করলেই হবে। তাতেই করোনা মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। কোন কোন মসজিদ থেকে এমনও আহ্বান করতে শোনা গেছে, আজানের শব্দ পাওয়ার পর ঘরে বসে নামাজ পড়লে সেই নামজ হবে না। আবার বলেছেন আজান শুনে কেবল অসুস্থ্য যারা তাদের বাইরে সবাইকে মসজিদে এসে নামজ আদায় না করলে নামাজ হবে না। মসজিদের পেশ ইমামের কাছ থেকে এমন আহ্বান শুনে নামাজ আদায় করতে সবাই এখন মসজিদমূখি। ধর্মভীরু মানুষরা যখন শুনবে ঘরে বসে নামাজ আদায় করলে নামাজ হবে না, তখন তো তারা মসজিদে যাবেই। কোন করোনা তাদের আটকে রাখতে পারবে না। তারা তো আল্লাহর পরেই হুজুরের কথা বিশ্বাস করেন। এদের কি দিয়ে থামাবেন?

একই সঙ্গে গত ১০ মে থেকে ঈদকে সামনে রেখে শপিংমল খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই সিদ্ধান্তের আগেই অনেকে দোকানপাট খোলা শুরু করে দেয় দোকানীরা। ১০ মে বরিশালের মেয়রের আহ্বানে ব্যবসায়ী নেতারা একদিন দোকান বন্ধ রাখলেও ১১ মে থেকে নগরের অধিকাংশ ঈদ মার্কেট খুলে জমজামাট মানুষের সমাগম করা হচ্ছে। ঈদের বাজার খোলার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হামলে পড়েছে বাজারে। সব দেখে মনে হচ্ছে সরকার এতদিন বেহুদা ঘোষণা দিয়ে মানুষকে বাড়ি রাখার চেষ্টা করেছে। এদের আবার কর্মহীন এবং অসহায় বলে বাড়ি বাড়ি খাদ্য সহায়তাও পৌঁছে দিচ্ছে সরকার। ঈদ বাজারে মানুষের ভীড় দেখে বোঝার উপায় নেই, আমাদের ওপর দিয়ে কোন মাহামারী যাচ্ছে। কারো কোন অভাব আছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। সবাই স্বাভাবিক সময়ের মতো কেনাকাটায় ব্যস্ত। প্রতিটি দোকান এবং রাস্তায় মানুষের মিছিল।

গত ৯ মে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ বরিশালের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে করোনার এই দুর্যোগে আগে মানুষ বাঁচানোর অনুরোধ জানানো হয়। তার পর ঈদ আনন্দ। এক বছর ঈদে নতুন পোশাক না কিনে ঘরে থাকার আহ্বান জানানো হয়। এই মুহূর্তে অসহায় ও কর্মহীনদের পাশে নতুন পোশাক কেনার অর্থ বরাদ্দ করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। মেয়র ও ব্যবসায়ীরা বলেন, করোনা বর্তমানে একটি বৈশি^ক সমস্যা। এই সমস্যা মোকাবেলা করতে হলে সবার সহযোগিতা দরকার। ব্যবসায়ীরা মেয়রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বেশিরভাগ ব্যবসায়ীরা একদিন পর ওই সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঈদ মার্কেট খোলেন। সেখানে কোনধরণের স্বাস্থবিধি মানার ব্যবস্থাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গোটা দেশকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে এমন ঈদ মার্কেট চালুর সিদ্ধান্ত আত্মঘাতি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এদিকে একই সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হচ্ছে মার্কেট খুললেও ক্রেতারা দায়িত্বশীল হয়ে সেখানে যাবেন না। আমরা বলতে চাই, ‘মধু আছে আর মৌমাছি সেখানে যাবে না এমনটা হয়? হয়েছে কখনো কোন দেশে?’ নেশার দ্রব্য উন্মুক্ত করে দিয়ে যদি বলেন নেশা করবেন না, সেটা উলু বনে মুক্তা ছড়ানোর মতো ঘটনা ছাড়া অন্য কিছু হবে? স্বাস্থ্যবিধি মানানোর জন্য লকডাউন, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেও বাড়িতে রাখা যাচ্ছে না। সেখানে চলাচল এবং বাজার উন্মুক্ত করে দিয়ে মানুষকে যেতে বারণ করার মতো নির্দেশনা কতটা কার্যকরী হবে বুঝতে পারছি না। আমাদের মনে হচ্ছে উন্নত দেশের মতো মৃত্যুর মিছিল না দেখা পর্যন্ত আমাদের মনোজগতের পরিবর্তন হবে না। মানুষ মরে রাস্তায় পড়ে থাকবে, কেউ ধারে কাছে যাবে না। পঁচে গন্ধ ছড়াবে তেমন পরিস্থিতির জন্যই এমন ব্যবস্থা কি না তাও বুঝতে পারছি না।

আমরা বলতে চাই, ঈদের নতুন পোশক কেনার হিড়িক কমাতে উদ্যোগ নিন। এক বছর ঈদে নতুন পোশাক না পড়লে ঈদ হবে না এমন নয়। ঈদে আনন্দ করতে গিয়ে করোনাকে আলিঙ্গন করার মতো বোকামী করা কতটা সঠিক হবে? দিন দিন যে হারে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে তাতে আমরা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। তারপরও যদি সতর্ক হতে না পারি তাহলে আমাদের আর কেউ রক্ষা করতে পারবে না। উপযুক্ত সময় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে তার দায় পড়বে সবার ঘারে। সেই দায় মোকাবেলা করা সহজ হবে কি?