শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

May 14, 2020, 8:23 p.m.

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব তেরো)
ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব  তেরো)
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। - ছবি: ভোরের আলো।

করোনায় ঝুঁকি জেনেও যারা মাঠে কাজ করছেন তাদের জন্য আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। সরকারি-বেসরকারি প্রশাসন, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান যারা যারা এই ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন তাদের নিয়ে ভোরের আলোর বিশেষ আয়োজন। ধারাবাহিকভাবে আমরা ব্যক্তি, ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমাদের আজকের শিরোনামের প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।



কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। এই অজানা হন্তারক করোনার জন্ম চীনের উহান প্রদেশে। চীন এই হন্তারককে জব্দ করতে পারলেও ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দুনিয়ায়। পৃথিবীর শত শত কোটি মানুষের দিন-রাত এক করে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। রাতের ঘুম নেই উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর। বাংলাদেশও আজ এই অজানা হন্তারক করোনা দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে প্রতিদিনের মৃত্যুর মিছিল আমাদের শঙ্কার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অসহায় হয়ে মানুষের মৃত্যুর মিছিল দেখে প্রত্যেক মানুষের হৃদয় ভারাক্রান্ত। কিন্তু এই ভাইরাস থেকে মুক্তির উপায় এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে নিরন্তর চেষ্টা চলছে প্রতিরোধ ব্যবস্থার। সেই প্রতিরোধে মাঠে থেকে যারা যুদ্ধ করে চলেছেন তাদের প্রতি আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা।

গত বছরের শেষের দিকে আঘাত হানা করোনা আজ বিশ্বের দেশে দেশে থাবা বিস্তার করে চলেছে। ১৮৭টি দেশ করোনা মহামারীর সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছে। এ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৪৩ লাখ মানুষকে আক্রান্ত করেছে করোনা ভাইরাস। প্রায় ৩ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।  প্রতিদিনই নতুন নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বাংলাদেশে ১৭ থেকে ১৮ হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। ক্রমেই বেড়ে চলেছে আক্রান্তের সংখ্যা। এখনো এই ভাইরাসকে প্রতিরোধ করার কোন উপায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে সতর্ক ও সচেতনতার সঙ্গে চলছে নিরন্তর লড়াই। উন্নত বিশে^র সঙ্গে আমরাও এই করোনার ভয়াল ছোবল থেকে মুক্তির পথ খুঁজে ফিরছি। প্রতিদিন একটু একটু করে প্রাণ রক্ষার চেষ্টা চলছে। চলছে অসহায় মানুষের পাশে ভরসা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা। করোনার শত ঝুঁকি যেনেও কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে সেখান থেকে দূরে সরাতে পারেনি। মানব সমাজকে রক্ষায় তারা কারো দিকে না তাকিয়ে নিরন্তর চেষ্টা করে উদাহরণ সৃষ্টি করছেন। সেই চেষ্টার কারিগরদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান ও কৃতজ্ঞতা।

বাংলাদেশে করোনা ঝুঁকি মোকাবেলায় নিবেদিত ও নিরন্তর চেষ্টা যারা করছেন তাদের মধ্যে অনেকগুলো সংস্থা কাজ করছে। আছে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা উদ্যোগও। ভয়াবহ ঝুঁকি জেনেও বাংলাদেশে মাঠে কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আমাদের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মীরা। এর সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের বৃহৎ অংশ পুলিশ, জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, গণমাধ্যমসহ অন্যান্য সংস্থা। যারা নিজেদের ঝুঁকিকে তুচ্ছ করে দেশের মানুষের কল্যাণে, নাগরিকদের সুরক্ষয় কাজ করছেন। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানিক ঝুঁকেকে এরা তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছেন। করোনার ভীতিকে জয় করতে এরা এক একজন মানব বর্ম হয়ে আমাদের চার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে এই মুহূর্তে চরম ঝুঁকি জেনেও যারা নিবিড়ভাবে মাঠে থেকে কাজ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম এক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। ১৯৭১ এর মুক্তি সংগ্রামের সময় যেভাবে মাঠে ছিল উদীচী। আজ করোনা মহামারী প্রতিরোধে অধিক শক্তি নিয়ে সারা দেশেই মাঠে আছে।

বাংলাদেশে করোনা যখন অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। সবাইকে যখন ঘরে এবং সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হচ্ছে। তখনই উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের কর্মীরা মানুষকে সচেতন করতে মাঠে নামেন। নিজেদের ঝুঁকিকে পাত্তা না দিয়ে তারা পাড়ায় মহল্লায় ঘুরে ঘুরে মানুষকে সচতন করতে থাকেন। হাত ধোয়া এবং মাস্ক ব্যবহারের নিয়মসহ প্রচারপত্রও বিলি করতে থাকেন। এর পাশাপাশি অসহায় মানুষ যারা হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার কিনতে পারবেন না তাদের কথা চিন্তা করে উদীচী হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের শিক্ষার্থী উদীচী কর্মীরা এই কাজে কারিগরী সহযোগিতা দেয়। পরে অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের শিক্ষকরাও সহযোগী হন। কেবল ঢাকায় ২০ হাজার হ্যাণ্ড স্যাসিটাইজার তৈরি করে উদীচী কর্মীরা। এর বাইরে বগুড়া উদীচী, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলাও একই কাজে যুক্ত হয় উদীচী কর্মীরা। সারা দেশে প্রায় ৫০ হাজার হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে তা অসহায় মানুষের হাতে হাতে তুলে দেন উদীচী কর্মীরা।

হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার তৈরি ও বিলি করতে গিয়ে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের কর্মীরা কর্মহীন মানুষের খাবার সংকটের কথা জানতে পারে। এরপরই উদীচী হ্যা- স্যানিটাইজার তৈরি ও বিলির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য সহায়তা নিয়ে মাঠে নামে। কেন্দ্রীয় সংসদ ৫ হাজার পরিবারের পাশে খাদ্য সহায়তা নিয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই সহায়তা এখনো অব্যাহত আছে। যখন প্রশাসন মানুষকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে বাড়ি থাকতে বলছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজের সুরক্ষার কথা বলছে তখনও উদীচী কর্মীরা খাদ্য সহায়তা ও সুরক্ষা সমাগ্রি নিয়ে দিন রাত মাঠে কাজ করছে।

ঝুঁকি থাকার পরও বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে উদীচীই ব্যাপকভাবে মাঠে থেকে কাজ করে চলেছে। কেন্দ্রীয় সংসদের বাইরে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী বরিশাল জেলা সংসদ অসহায় মানুষের জন্য মাঠে নামে। তারা সচেতনতায় প্রচারণার পাশাপাশি উদীচী বৈশাখী মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে যুক্ত ঢাকি, ভ্যান চালক, মাইক শ্রমিক, ডেকরোটর শ্রমিকদের পরিবারের পাশে খাদ্য সহায়তা নিয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার তৈরি, প্রচারণা এবং খাদ্য সহায়তা নিয়ে বগুরা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের অন্যান্য জেলা ও শাখাগুলোও কাজ করে। সার্বিকভাবে উদীচী কর্মীরা এখনও ঝুঁকি জেনেও মাঠে থেকে করোনা মোকাবেলা করে চলেছে। কখনো সচেতন ও সতর্ক করে, কখনো চিকিৎসা দিয়ে, কখনো নিরাপত্তা দিয়ে, কখনো আবার খাবার সামগ্রি দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়ে উদীচী আছে মানুষে পাশে। সারা দেশের উদীচী কর্মীরা কেন্দ্রের সঙ্গে একজোট হয়ে অপ্রকাশ্য হন্তারকের বিরুদ্ধে দিন-রাত যুদ্ধ করে চলেছেন। যা বাংলাদেশে অনন্য উদাহারণ সৃষ্টি করেছে।

সারা দেশে যখন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা করোনার ভয়ে স্বেচ্ছায় অন্তরীণ হয়েছে, তখন উদীচী কর্মীরা জীবনবাজি রেখে করোনা মোকাবেলায় অসহায় মানুষে পাশে। এখনো দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ও দলের নেতারা ঘরবন্দি। করোনার ছোবল থেকে মুক্ত থাকতে তারা কর্মী কিংবা মানুষের পাশে থাকতে সাহস করছেন না। কিন্তু উদীচী কর্মীরা মাঠে থেকে মানুষদের সাহস যোগাচ্ছে। নেতারা অবশ্য বলেন আমরা না বের হলেও আমাদের সহযোগিতা মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। খাবার পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক কিংবা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার অজুহাতে তারা মাঠে নামছেন না। বাস্তবে তারা করোনার ভয়ে বের হতে সাহস করছেন না। তারা মাঠে না থাকায় খাবার পেলেও অনেকে সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। মানসিক সাহস দিয়ে যারা পাশে আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মাঠ প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, গণমাধ্যম এবং এর সঙ্গে উদীচীর মতো কিছু সংগঠনকর্মীরা। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা যদি শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, তাহলে করোনার ভয়কে জয় করা অরো একটু সহজ হতো।

বনশ্রী এলাকায় শ্রমজীবী মানুষদের মধ্যে আজ সকালে উদীচীর হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম।(ডনে) করোনা প্রতিরোধে জরুরি পরিস্থিতিতে সারা দেশের গৃহবন্দী খেটে খাওয়া মানুষের দোরগোড়ায় খাবার পৌঁছে দিচ্ছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।

 

এই মুহূর্তে মানুষ যতোটা খাবারের চিন্তায় ব্যকুল, তার চেয়ে অনেক বেশি করোনার ভয়ে অস্থির। মানুষের একটা ধারণা হয়েছে করোনা হলে আর বাঁচার উপায় নাই। মানুষের মনের এই ভীতি দূর করতে হলে অবশ্যই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে মানুষের পাশে থেকে সাহস যোগাতে হবে। শঙ্কা থাকলেও করোনার ভীতি দূর করতে হলে কাউকে না কাউকে একটু ঝুঁকি নিতেই হবে। যে ঝুঁকি নিয়ে মাঠে আছে উদীচী। আছে গণমাধ্যম, পুলিশ, জেলা প্রশাসনসহ অন্যরা। এই সময় অবশ্য অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব নিয়ে মাঠে থাকা দরকার। ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে হলেও আমরা সবাইকে মাঠে থাকার আহ্বান জানাই।

আসুন, সামাজিক কিংবা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে করোনার এই যুদ্ধ মোকাবেলায় যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করি। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী নয়, আমরা সবাই মিলে এই যুদ্ধে অংশ নেই। নিজের দায় অন্যের ওপর না চাপিয়ে, নিজের কাজটি নিজে করি। মৃত্যুর ভয়কে বড় করে না দেখে, মানুষের মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে উদ্যোগী ভূমিকা রাখি। সচেতন ও সতর্কতার সঙ্গে মানুষের পাশে দাঁড়াই।


 

আরো পড়ুন


করোনা ঝুুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব- ৯)

করোনা ঝুুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব-৮)

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব সাত)

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব ছয়)

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব পাঁচ) : বাংলাদেশ পুলিশ, বরিশাল

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব চার) : জেলা প্রশাসন বরিশাল

করোনা ঝুুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব তিন) : স্বাস্থ্য বিভাগ

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (দ্বিতীয় পর্ব) : নীরব হোসেন টুটুল

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা ( প্রথম পর্ব) : লাল-সবুজ সোসাইটি