শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

May 18, 2020, 10:08 p.m.

ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব ১৪)
ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা (পর্ব ১৪)
বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। - ছবি: ভোরের আলো।

করোনায় ঝুঁকি জেনেও বরিশালে যারা মাঠে কাজ করছেন তাদের জন্য আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সরকারি-বেসরকারি প্রশাসন, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান যারা যারা এই ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন তাদের নিয়ে ভোরের আলোর বিশেষ আয়োজন। ধারাবাহিকভাবে আমরা ব্যক্তি, ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমাদের আজকের বিষয় ‘ঝুঁকি জেনেও মাঠে যারা’ শিরোনামের প্রতিষ্ঠান বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী

করোনা আজ আমাদের চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। জীবন-মরন মাঝে আমরা কেবল দিন অতিবাহিত করে চলেছি। অজানা এক হন্তারক করোনা প্রতিদিন আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। যদিও করোনা ঝুঁকি কেবল বাংলাদেশে নয়, এটা এক বৈশি^ক দুর্যোগ। এই দুর্যোগ মোকাবেলায় ভয় নয়, সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। করোনায় যথেষ্ট ঝুঁকি থাকলেও কোনভাবেই অমানবিক হওয়ার সুযোগ নাই। আক্রান্ত মানুষদের তাড়িয়ে দিয়ে অমানবিক আচরণ করা কোনভাবেই কাম্য নয়। আমরা যখন নিজের ঝুঁকির কথা চিন্তা করে বাড়ির থেকে ডাক্তার, পুলিশ, সাংবাদিক, গৃহকর্মীদের তাড়িয়ে দিচ্ছি তখনও মাঠে থেকে আমাদের সচেতন করে চলেলে একদল মানুষ। নিজেদের ঝুঁকিকে পাত্তা না দিয়ে তারা কেবল সেবাধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে চলেছেন। এরা হচ্ছে করোনা মোকাবেলার সম্মুখ সারির যোদ্ধা।

করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে মাঠে আছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। একদল দিন-রাত ২৪ ঘন্টা আমাদের বাড়ি, আঙিনার জঞ্জাল দূর করছেন। এর এক দল আমাদের সতর্ক সচেতন এবং নিরাপদে রাখতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছেন। অন্য আরেক দল আমাদের করোনা মুক্ত করতে হাসপাতালে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। এদের মধ্যে ডাক্তার, পুলিশ, মাঠ প্রশাসনের কথা কমবেশি উঠে আসলেও অন্ধকারে থেকে যাচ্ছে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। যারা জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে আমাদের শহর-নগর-বন্দরসহ বাড়ির আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখতে কাজ করছেন। কাজ করছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ড পরিচ্ছন্ন রাখতেও।

আমরা বিশ্বাস করি করোনা মোকাবেলায় এখনো বেশিরভাগ মানুষ ইতিবাচক কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাদের মধ্যে যেমন ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা আছেন, তেমনি নিবিড়ভাবে আছেন পুলিশ, সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, গণমাধ্যম। করোনা মোকাবেলায় সব প্রশাসন একাকার হয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তবে তার চেয়েও বেশি নিবিড়ভাবে কাজ করছেন আমাদের সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। দিন-রাত নিজের স্বাস্থ্য ঝুঁকি জেনেও একদিকে যেমন নগর পরিচ্ছন্ন রাখছেন, তেমনি রাতভর মানুষের পাশে থেকে বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। তাদের নিরাপত্তা কিংবা ব্যক্তিগত সুরাক্ষা ব্যবস্থা কতটা আছে সেটা আমারা সবাই দেখছি। তারপরও তারা নিজের সুরক্ষার কথা চিন্তা করছেন না। কেবল নগর এবং নগরের মানুষদের দুর্গন্ধমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখতে চেষ্টা করে চলেছেন। সিটি করপোরেশনের এই করোনা যোদ্ধা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রতি আমরা কেবল কৃতজ্ঞতা নয়, একান্ত শ্রদ্ধা জানাতে চাই।

আমরা লক্ষ্য করছি, করোনার এই ঝুঁকির মধ্যে সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে অনেক মানুষ সহযোগী হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারিভাবে কর্মহীন এবং অসহায় মানুষের বাড়ি বাড়ি খাদ্যসামগ্রি এবং নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন, দল ও ব্যক্তি উদ্যোগও চলছে। স্বেচ্ছায় কাজ করছে অনেক তরুন ও যুুবকরা। অনেক শিক্ষার্থীরা নিজেদের জমানো অর্থ সরকারি তহবিলে দেয়ার চেষ্টা করছেন। যে যেভাবে পারছেন করোনা ঝুঁকিকে পাশে রেখে সহযোগী হচ্ছেন। আবার কিছু মানুষ অর্থবৈভবের মধ্যে আবদ্ধ রয়েছেন। নিজেরা নিজেদের সুরক্ষায় ব্যস্ত আছেন। নিজেদের জমানো অর্থের পাহাড় রক্ষায় চেষ্টা চালাচ্ছেন। এমন বাস্তবতায়ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিবিড়ভাবে কেবল সেবা দিয়ে চলেছেন। করোনা কি উপহার দেবে তা তাদের জানা নেই। তবে দিন-রাত করানার সঙ্গেই থাকেন তারা। তারাই সবেচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাদের ঝুঁকি কমাতেও আমাদের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। ওদের ভালো রাখতে না পারলে কিন্তু আমদের মুক্তি নেই।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা একদিকে যেমন সূর্য ওঠার আগে নগর পরিচ্ছন্ন করছেন। তেমনি রাতেও তারা সড়কে সড়কে ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করছেন। বাসা-বাড়ির ময়লা এনে আমাদের সুস্থ্য রাখছেন। আবার সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে পৌঁছে দেওয়া খাদ্যসামগ্রি নিয়েও যাচ্ছেন তারা। বরিশাল সিটি করপোরেশনের ত্রাণ নিয়ে নগরের ৩০টি ওয়ার্ডে পৌঁছে দিচ্ছেন। সিটি মেয়রের তত্তাবধানে ওই সহযোগিতা যাচ্ছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্যোগে ওই সহযোগিতা পৌঁছে দেবার কথা। কিন্তু এই কাজে সেভাবে তাদের আমরা মাঠে দেখছি না। হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া। সিটি করপোরেশনের পুরো ত্রাণ সহযোগিতার বিষয়টি মাঠে থেকে পৌঁছে দিচ্ছেন আমদের পরিচ্ছন্নকর্মীরা। অবশ্য অবশ্যই করপোরেশনের বেশ কিছু কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে আছেন। সিটি মেয়র তার বাসভবনে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিবিড়ভাবে তদারকি করছেন।

আমাদের এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কোন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কি না আমরা জানি না। তবে তাদের একটা রাজনীতি আছে, সেটা হচ্ছে আমরা যারা পোশাকী আভিজাত্য নিয়ে বেড়াই তাঁদের ব্লিচিং পাউডার, সাবান-সোডা দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিচ্ছন্ন রাখার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন। আমাদের করোনা মুক্ত রাখতে নিজেরা করোনার ঝুঁকি বয়ে চলেছেন। তারা নিজেদের উজার করে দিয়ে মানুষের পাশে থাকছেন। স্বাস্থ্য ও সামাজিক ঝুঁকি থাকার পরও সেরকম ইতিবাচক কাজ করে চলেছেন আমাদের এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা, না না আমাদের সৌন্দর্যবর্ধনকাজে নিয়োজিতকর্মীরা। এরা কেবল আমাদের নগরের অভিবাবক খ্যাত মেয়র সেরনিয়াবত সাদিক আবদুল্লাহর মর্যাদা রক্ষা করে চলেছেন। সঙ্গে আমাদেরও একটি আস্থাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে কাজ করে চলেছেন। মেয়রের দেওয়া দায়িত্ব নিবেদিতপ্রাণকর্মী হয়ে পালন করছেন তারা। বর্তমান করোনা মোকাবেলায় ঝুঁকি নিয়েই মাঠে আছেন বরিশাল নগরে আমাদের এই প্রাণকর্মীরা। আমরা তাঁদের এই ইতিবাচক কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। একই সঙ্গে বলতে চাই, এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই বাংলাদেশ। এদের মাধ্যমেই আবার বরিশাল ভেনিসের মতো পরিচ্ছন্ন নগর পাবে। এরাই গড়ে দেবে আগামীর বরিশাল।

আমরা সব দুর্যোগে যাদের পাশে পেতাম, তারা এই দুঃসময় কোথায় আছেন জানি না। তাদের মধ্যে তো কাউকে দেখলাম না করোনা ঝুঁকি মোকাবেলায় নিজেদের কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে? আপনারা কতটুকু সামর্থ নিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করছেন? আমরা মাঠে আছি। আমরা জানি, কে বা কারা নিজের ঝুঁকি জেনেও মাঠে কাজ করছেন। কারা মাঠে থেকে, সামাজিক কিংবা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন। 

যারা মাঠে থাকছেন, তাদের কি মৃত্যু ভয় নেই? করোনা কি তাদের ছেড়ে দেবে বলে মনে হচ্ছে? অবশ্যই না। কেবল জনপ্রতিনিধির তকমা নেবেন, কিন্তু জনগণের সঙ্গে থাকবেন না, সেটা হয় না। করোনা বৈশ্বিক সমস্যা। এই সমস্যা মোকাবেলায় সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব রেখেই জনগণের পাশে থাকা দরকার। আজ ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, গণমাধ্যম ঝুঁকি জেনেও দিন-রাত মাঠে থেকে আমাদের বাড়ি থাকতে বলছেন। একই সঙ্গে আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও প্রাণান্তকর চেষ্টা করে চলেছেন। তাদের জন্যও তো আমাদের দায় আছে। সেই দায় থেকেই সবাই মিলে করোনা মোকাবেলায় উদ্যোগ নিন।