বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭

আজমল হোসেন লাবু

May 21, 2020, 10:01 p.m.

করোনাকালে প্রশ্ন, এরা কি মানুষ?
করোনাকালে প্রশ্ন, এরা কি মানুষ?
বরিশাল নগরীর চকবাজার থেকে ছবি তুলেছেন- - ছবি: এন আমিন রাসেল, ভোরের আলো।

সময়ের এই করোনাকাল সকল কিছুকেই করে দিচ্ছে নাকাল। অথচ কি সাচ্ছন্দেই না চলছিলো আমাদের সকল বিষয়। মুখে কথায় বক্তৃতায় আলোচনায় সর্বত্রই ছিলো কেবল ভালোর আরাধনা। একচ্ছত্র ভলোতেই সয়লাভ ছিলো আমাদের পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, ঈশান বায়ু অগ্নি ণৈরিক। বড় বেশি ভালো। চোখের সামনে যা যা ঘটেছে সেই বাস্তবতাটুকু শুধু বাদ দিলে, সবাই মিলে যা যা বলে চলেছে সেখানে ভালোর যেন কোন কুল কিনারা নাই। কোন কমতি নেই ভালোর ব্যসার্ধের। যার ফলশ্রুতিতে ভালোর মান যোগ্যতা নিয়েও কোথাও কোন প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন! এই এক বিষয় ‘প্রশ্ন’। মাত্র কিছুদিন পূর্বেও দেশব্যাপি এর সম্পর্কযুক্ত শব্দ ছিলো ‘ফাঁস’। যেখানে প্রশ্ন সেখানেই ফাঁস। আমরা এখানেও ভালো। এখানেও শতভাগ যোগ্য।

আমরা যেমন এখন শত্তুরের মুখে থু থু দিয়ে নিঃশন্দেহে অর্থনীতিতে ভালো। ‘ভিক্ষুক মুক্ত বাংলাদেশ’ এখন আমাদের শ্লোগান। আজ হঠাৎ করে খুঁজলেই ভিক্ষুক মেলা ভার। (যদিও করোনাকালীন এই সময়ের চিত্র ভিন্ন) ভিক্ষা এখন যে বা যারা করছে সেটা নিছকই আজকাল তাদের পেশা। শুনেছি ভিক্ষার অর্জন ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য দেশের কোথাও কোথাও মার্কেট আছে। সেখানে বিক্রেতা নামধারী ভিক্ষুক, ক্রেতা ঠিক কারা, সেটা আমার জানা হয়নি আজো। বিদ্যুৎ ঘরে ঘরে না গেলেও দেশের অনেক পথ থেকেই অন্ধকার বিতাড়িত করেছে। সে কথা রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা আছেন তাদের এমন সফলতার কথা চরম শত্রুও এক বাক্যে স্বীকার করবেন। শিক্ষা? ওই যে বললাম ফাঁসে পড়ে আটকে গেছে। তবে হ্যাঁ বই উৎসবটি অসাধারণ, দারুন। এই দারুন গল্পটা নিদারুনভাবে অর্থ হারিয়েছিলো বেশ কিছু পরীক্ষার কাছে এসে। প্রশ্ন ফাঁস কেলেংকারি প্রায় সকল ক্ষেত্রেই লেজেগোবরে করে দিতেছিলো। কোচিং এর প্রসার, সাহায্যকারী বই এর প্রসার, তা নিয়ে বক্তৃতা ছিলো, কথা ছিলো অনেক। তার রোধকল্পে বিন্দুবিসর্গ কোন ফলাফল দেখানো গেলই না। সব শেষে দেশব্যাপী সামাজিক সাংস্কৃতিক মানুষদের দাবি ছিলো অন্তত শুক্রবারকে কোচিংমুক্ত করার। না হয়নি সম্ভব! 

আমরা যেন বুঝতেই চাইছি না যে, বাঁচার জন্য অক্সিজেন দরকার। সারাদিন শুধু পড় পড়, ফার্স্ট হও। জিপিএ-৫,৬,৭,৮,৯,০ পাও। সম্ভব হলে আরো বেশি। জ্ঞান-জীবনের এই ম্যারাথন দৌড়ে সবাই ফার্স্ট হবে! সম্ভব? মাঝে মাঝে মনে হয় পাগলের মতো বলি। ‘শিক্ষিতদের শিক্ষা নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব বন্ধ করে এবার সে দায়িত্ব অশিক্ষিতদের হাতে দাও’। দেখি ওরা শিশুদের শারীরিক ও মানুষিক বৃদ্ধি ঘটাতে পারে কি না। দেখি ওদের অশিক্ষার বুদ্ধি শিশুদের পিঠ থেকে বইয়ের বোঝা নামাতে পারে কি না। দেখি ওরা শিক্ষককে ক্লাসে পাঠদানের উপযোগী করে তুলতে পারেন কি না। দেখি স্কুল শেষে একই শিক্ষক আবার স্কুলে বসেই ওই শিক্ষার্থীদের কোচিং এর বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিতে পারেন কি না। তা যদি না পারে তবে ওই অশিক্ষিতরা শিক্ষিতদের বলতে পারবে তোমরা অন্তত একটা কাজ করো, এক নীতি গ্রহণ করে জাতিকে আশ্বস্ত করো, তা হলো আগামীকাল থেকে কোথাও কোন বিদ্যালয় নামে কিছু থাকবে না। সকল বিদ্যালয়গুলোকে কোচিং সেন্টার করা হলো। তবে হয়তো দারুন জ্ঞানী মানুষেরা বুঝবে, বলবে, ওরা অশিক্ষিত তাই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে শিক্ষিত হলে পারতো না। আমরা শিক্ষিত, জ্ঞানী, তাই একই সময়ে একই স্থানে স্কুল এবং কোচিং এ দুটোই একসঙ্গে চালাতে জানি।

আজকে এই সীমাহীন এক দুঃসময়ে দাঁড়িয়ে এমন একটি অতি বাস্তব কঠিন এবং সত্য বিষয়ের আলোচনা নিতান্তই অন্তঃস্বারশুন্যতায় পর্যবসিত হয়েছে। কে পারলো, কে পারলো না,এই সময়ে এসে শতভাগ কোচিং বন্ধ করতে, যা রাষ্ট্রের পক্ষেও সম্ভব হলো না এতো দিনে? আজ স্কুলের সেই ছাত্র-ছাত্রীরা কোথায়? কোথায় সেই সকল অর্বাচিন অভিভাবকরা অর্থাৎ আমরা, যাদের প্রত্যাশা কেবলই সন্তানদের প্রথম স্থান অধিকার? আজ কোথায় সেই শিক্ষককুল যারা স্কুলের পরেও আবার পুনরায় কোচিং করতে বাধ্য করাতেন শিক্ষার্থীদের? আজ এই করোনাকালে তারা কোথায়? এই সময়ে যখন যে কেউ করোনার বাহক হতে পারে। আপনি, আমি, সে এবং তারা। তারপরেও ঘরে ঘরে মাস্টার মশাইরা ছাত্র-ছাত্রী পড়াচ্ছেন। কোন, শিক্ষার মান বাড়াতে। কার, ছাত্রের না শিক্ষকের? অতি জরুরী সময়ের এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই আমাদের কারো। একেবারেই জানা নেই দেশের শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের। তবু চলছে দেশ। যেন সবাই মিলে গাদাগাদি করে এক পারাপারের ফেরিতে চড়ে নদীতে ভাসছি। না মুখে মাস্ক, না হাতে গ্লভস, না বসনে প্রতিকারের বস্ত্র, না শারীরিক দুরত্ব! হাসছে পৃথিবী, হাসছে করোনা। আজকে করোনা মৃত্যু নিশ্চিত করেছে ২২ জনের। কাল যদি আমাদেরই আচরণে অখুশি হয়ে ২ হাজার ২০০ মারতে শুরু করে? তখন আমাদের চোপার জোর, স্বার্থ হাসিলের জোর কোথায় থাকবে! সবাই সবাইকে দোষারোপ করে ঘর ছেড়ে বাইরে। নিজেরা ভীড়ের মধ্যে ঘুরে ঘুরে সংখ্যাধিক্য ঘটিয়ে সেই ছবি ফেইসবুকে আপলোড দিয়ে প্রশ্ন ‘এরা কি মানুষ’? কেমন করে বলি শালার এই দেশে কোনটা মানুষ, আর কোনটা খাটাশ? 

ত্রাণ না দিলে মানুষ বাঁচবে কেমন করে? ব্যাস দারুন জনপ্রিয়তা পেল ত্রাণ। ছবি আর ত্রাণ সমানে সমান। কে কি দিচ্ছে তেমন নেই তার অনুসন্ধান! কতো অদ্ভুত খবর ছাপালো পত্রিকায়। ‘ত্রাণ দিয়ে ছবি তোলা শেষে ত্রাণ কেড়ে নেওয়া হলো’! তারপর ত্রাণ চুরি? না এগুলো এখন আর কোন খবর নয়। আমাদের রাষ্ট্র এবং রাজনীতির ব্যবস্থাপনায় চুরির বিরুদ্ধাচারণ নিতান্তই অর্থহীন এক রুচি। 

আজ পৃথিবীব্যাপী যাদের সকল ব্যবস্থাপনা আছে। তারাই করোনার আঘাতে মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে। সেখানে আমরা কেবল চোপায় ভর দিয়ে কি করে বাঁচবো? কথা ছিলো সবাই ঘরে থাকবো। ঘোষণা হলো লকডাউন। শুরুটা বেশ ভালোই শুরু হয়েছিলো। মানুষ ঘরবন্দী হয়ে ছিলো। ত্রাণ আমাদের ঘরে থাকতে দিলো না। কারখানা বন্ধ হলে অর্থনীতি মাটি স্পর্শ করবে। ঘরছাড়া হলো শ্রমিক। দোকান পসরা না খুললে মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। অতএব খুললো দোকান। সঙ্গে ছুটলো ক্রেতা। মুহূর্তেই লকডাউন উপেক্ষিত হলো। সাবেক দৃশ্য দেশময়। এ তো গেল রুটি রুজি আর পেটের কথা। এ পথেই প্রতিবাদী হলো উপাসনালয়গুলো। ‘সবাই সব খুলতে পারলো উপাসনালয় কেন খুলবে না’? মনে হলো অন্যান্য সকলের মতোই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রতিবাদ। নিশ্চয়ই এখানেও রুটি রুজির প্রশ্ন জড়িত। তবে খুলবে না কেন? খুলে দেওয়া হলো সব। এখন সর্বত্রই বুদ্ধি আর দুর্বুদ্ধির সহাবস্থান।

সামনে ঈদ। একবার যারা ঘরে ফিরেছিলো করোনা থেকে বাঁচতে, সেই মানুষেরাই জীবন জীবিকার প্রয়োজনে করোনার-বাংলাদেশ, কেন্দ্রস্থলে উপস্থিত হয়ে দেশের অর্থনীতিকে আকাশে তুলে দিয়ে ফের ফিরতে শুরু করেছে ঘরে, দেশে, গ্রামে। উপায়হীন এই দুর্বিসহ সময়ে তাদের সঙ্গী হবে করোনা। পথে-ঘাটে কোথাও সম্ভব হবে না করোনা বিরোধী নিয়মগুলো মেনে চলা। সুতরাং করোনা সহজতর বিস্তার অবশ্যম্ভবী। 

জানি না, এবার ঈদের নামাজ কেমন নিয়মে চলবে। আমি যার পাশে, আমার পাশে যিনি, আমরা উভয়েই যখন সেজ্দায় ‘সোবাহানা রাব্বিয়াল আলা’ বলবো তখন শ্বাস প্রশ্বাসে সংক্রমিত হবে কি না করোনা? লেগে যাবে কিনা কার্পেটে কিংবা মেঝেতে করোনার ভাইরাস? জানি না এর যথার্থ উত্তর, কেউ জানে সে অনুমানও এখন আর করছি না। জেনেছি সৌদি সরকার ঈদের একদিন আগে থেকে ঈদ পরবর্তী পাঁচ দিন সারা দেশব্যাপী কঠোর কারফিউ জারির নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কাবাশরীফ এবং মসজিদে নবমিতে এখনো সাধারণের প্রবেশ সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ। কঠোর নিয়ম মেনে চলছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং তারাবি। তাদের আজকের এই কঠোরতা যদি আগামী দিনের পবিত্র হজ¦ব্রত পালনের নির্বিঘ্ন তার নিশ্চয়তা দেয়, তা হলে এই কঠোরতা মুসলিম উম্মার জন্য অবশ্যই করণীয় হওয়া উচিত।

জানি না তেমনটা আদৌ সম্ভব হবে কি না অন্ধ অনুকরণীয়দের এই দেশে? পবিত্র রমজান মাস এ বছরের মত ধীরে ধীরে রহমত, মাগফিরাত, নাজাতের পথে। গত রাত ছিল লাইলাতুল ক্বদরের। মহান আলাহ রাব্বুল আল-আমীন যেন এই মর্তবাময় রাতে ক্বদরে পৃথিবীর কল্যাণকামী সকল মানুষের জন্য সর্বাধিক কল্যাণ নিশ্চিত করেন। ধ্বংস হয়ে যাক মহামারী করোনার উৎপত্তিস্থল। তার আবাস, তার বিচরণের ক্ষেত্র। আপাতত প্রাসঙ্গিক দুরত্বে থেকেই এই প্রত্যাশা করছি। ঈদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি- ঈদ মোবারক।