শনিবার, ০৮ আগষ্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

সেলিম জাহান

June 6, 2020, 11:28 p.m.

হারিয়ে যাওয়া স্কুল
হারিয়ে যাওয়া স্কুল
সেলিম জাহান। - ছবি: ভোরের আলো।

ভবনটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে- বয়স আমার পাঁচের মতো তখন। আমার সরকারি চাকুরে মাতামহ বরিশালে এলেন বদলী হয়ে, বাড়ি নিলেন ‘ব্রাউন কম্পাউন্ডে’। আমার একমাত্র মাতুল তখন অষ্টম কিংবা নবম শ্রেণিতে পড়েন, তাঁকে ভর্তি করে দেয়া হল বরিশাল জিলা স্কুলে- হেঁটে গেলে বাড়ি থেকে দু’মিনিট লাগে। জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের আবাস-ভবনের সামনের ছোট্ট পুকুরের কোনায় স্কুল সীমানার বাইরেই ‘ছানার নানা বাড়ির’ মতো আমার মাতুলালয়-সাদা একতলা দালান। ঐ বাড়ির সামনে দিয়ে ইট-বিছানো সরু পথ পরেশ সাগরের দিকে চলে গেছে।

এক পড়ন্ত বিকেলে আমার কিশোর মামা তাঁর শিশু ভাগ্নেকে তাঁর নতুন স্কুল দেখাতে চল্লেন। বাড়ি থেকে বেরিয়েই মিনিট খানেকের মধ্যেই প্রধান শিক্ষকের আবাসনকে ডানে আর বাঁধানো ঘাটওয়ালা ছোট্ট পুকুরকে বাঁয়ে রেখে বিশ পা এগুতেই মুখোমুখি হওয়া গেল। একচিলতে মাঠের ওপারের ছিমছাম হলুদ রঙ্গের একতলা দালানটি বঙ মায়াময়- কিন্তু না, এ বাড়ি চোখ ঠারায় না। মাঠের এপারে চোখ ফেরাতেই হতবাক হয়ে গেলাম।

একটি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হর্ম্য- গম্ভীর, রাশভারী, কিন্তু তার একটি নিজস্ব চরিত্র আছে। তার গঠন, ব্যপ্তি, বিশালত্ব আমার শিশু হৃদয়কে অবাক বিস্ময়ে ভরে দিল। মামা আমার হাত ধরে জামরুল গাছ আর টিউবয়েল তলা পার করে নওয়াবজাদা ফজলে রাব্বীর বাড়ির (তারিক ভাইদের বাড়ি) পেছনের পুকুরকে ডান হাতে ফেলে বাঁয়ে মোঙ নিয়ে হাজির হলেন স্কুল বাড়িটির একদম সম্মুখভাগে। সামনের বাগানের অজস্র মৌসুমী ফুল, নানান ফুলের গাছ, নারকেল গাছ, প্রশস্ত সিঁড়ির দু’পাশের দুই বিশাল দেবদারু গাছ আমাকে হতবাক করে দিল। সামনের বারান্দার বিশাল ৬টি থাম আর ওপরের দিকের স্কুলের নামাঙ্কিত একটি ত্রিভুজাকৃতির খিলানের দিকে বিস্ফারিত চেখে তাকিয়ে থাকলাম। প্রথম দর্শনেই আমি ভবনটির প্রেমে পড়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলাম, এ স্কুলে আমাকে পড়তেই হবে।

কিন্তু আজকে সেই স্কুলে পড়ার গল্প নয়, আজকের গল্পটি হলুদ রঙের সেই অতুলনীয় মূল হর্ম্যটিকে নিয়েই। আয়তাক্ষেত্রিক ভবনটির মধ্যমণি ছিল তার ঠিক মাঝখানের বিশাল হলঘরটি। সে হলঘরটির সামনের দিকে (দক্ষিণে) ও পেছনের দিকে (উত্তরে) বিরাট থামওয়ালা বারান্দা থেকে নেমে গেছে প্রশস্ত সিঁড়ি। সে সিঁড়ির দু’পাশেই ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত মসৃণ সিমেন্টের এক চিলতে চাতালের অতিভুজ। আমরা তার মাঝামাঝি জায়গায় একটি ছোট্ট বৃত্ত এঁকে তার মাঝখানে ছোট্ট একটি চারা রাখতাম। তারপর উচ্চতম সিঁড়ির মাথায় বসে আর একটি চারা ছেড়ে দিতাম। বড় চারাটি ছোট চারাটিকে স্পর্শ (ছুঁলেই) এক পয়েন্ট। মাঝে মাঝে নিজেরাও পিছলে যেতাম সেই চাতালে।

সেই হলঘরের মাঝখানে দক্ষিণদিকে মুখ করে দাঁড়ালে হাতের ডানদিকে ও বাঁদিকে সারি সারি শ্রেণিকক্ষ ও অন্যান্য কক্ষ- দু’প্রস্থ বারান্দা-পথের দু’পাশে। সেই দু’টো বারান্দা-পথ শেষ হয়েছে আরো দু’টো সিঁড়িগুচ্ছে- একটি পূবে আর একটি পশ্চিমে। অতএব, চারদিক দিক দিয়েই স্কুলভবনে প্রবেশ করা যেত- সামনের দক্ষিণ, পেছনের উত্তর এবং ডানের পশ্চিম আর বাঁয়ের পূবদিক দিয়ে। চলে আসুন, ভবনটিতে প্রবেশ করা যাক।

প্রধান শিক্ষকের আবাসনের উল্টেদিকের পশ্চিমের সিঁড়ির দরজা দিয়ে ঢোকা যাক। সামনে শায়িত বারান্দা-পথের ডানদিকের প্রথম কক্ষটি আমাদের কালে ছিল বিজ্ঞান পরীক্ষাগার। বুনসেন বার্নার সেখানেই আমি প্রথম দেখেছি, অক্সিজেন বানানোও। বানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রীয় শান্তি কর্মসূচিতে আগত তরুণ শিক্ষক কিল্টন বি. সিলি- পরবর্তী কালে যিনি জীবনানন্দ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতিমান হয়েছেন। ক্লিন্টন বর্তমানে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক- এখনও যোগাযোগ আছে তাঁর সঙ্গে। সে পরীক্ষাগারের বাইরে বারান্দার কোনায় ছিল পানীয় জলের ব্যবস্থা। কারণে অকাকরণে আমাদের ঘুরে আসার জায়গা।

বিজ্ঞান পরীক্ষাগারের উল্টোদিকেই ছিল গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারের পাশেই ছিল স্কুল বার্ষিকী ‘সবুজ পাতার’ ঘর। আর একটু এগুলেই হাতের ডানে শিক্ষকদের বিশ্রামাগার। তার গা ঘেঁষে যে কক্ষ, তার এক অংশে বসতেন সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং প্রধান করণিক রশীদ সাহেব। তাঁদের দু’জনের মধ্যে একটি কাঠের বিভাজন ছিল বটে। তার পরের কক্ষটিই ছিল প্রধান শিক্ষকের কক্ষ। ভারী সুন্দর করে সাজানো। সে কক্ষে ঢুকতে হত সহকারী প্রধান শিক্ষকের টেবিলের উল্টেদিকের দরজা দিয়ে। ঐ ঘরের আরেকটি দরজা দিয়ে বেরোলেই দক্ষিণের সামনের বারান্দা। রশীদ সাহেবের টেবিলের পাশের দরজা দিয়েও সে বারান্দায় যাওয়া যেত। হল ঘরে ঢোকার ঠিক আগেই বাঁদিকে প্রথমে ছিল সপ্তম শ্রেণি ‘খ’ শাখার শ্রেণিকক্ষ এবং তার পরেই সপ্তম শ্রেণি ‘ক’ শাখার শ্রেণিকক্ষ- ছোট দালানে ষষ্ঠ শ্রেণি শেষ করে বড় দালানে এটাই ছিল আমার প্রথম আস্তানা। শ্রেণি শিক্ষক ছিলেন মানিকুর রহমান স্যার।

এ শ্রেণিকক্ষ পেরুলেই হলঘরে পড়তে হোত। এ হলঘরের গল্প অনেক- আজ নয়, আরেকদিন করতে হবে। চলুন, আজ হলঘর পেরিয়ে সামনের বারান্দা-পথটিতে পা রাখি। এটিই আমাদের আগের বলা পূবের বারান্দা পথ। সামনের ডানদিকের প্রথম কক্ষটির দরজা বন্ধ, তাই না? কারণ, ওঘরের যাওয়ার আরেকটি দরজা আছে- সামনের দক্ষিণের বারান্দায়। এ কক্ষটি ছিল খেলার সরঞ্জাম, ক্যাডেট কোরের বাজনার নানার সরঞ্জাম। এ কক্ষের একচ্ছত্র সম্রাট ছিলেন মনসুর নানা। তার পাশেই ছিল টিফিন জায়গা তরুন হানিফ ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে। এ কক্ষের প্রবেশ পথও ছিল সামনের বারান্দা দিয়ে।

পূবের বারান্দা-পথের বাঁয়ের প্রথম কক্ষটিই ছিল অষ্টম শ্রেণি ‘ক’ শাখার- অরবিন্দ স্যার (অরবিন্দ দাশ) আমাদের শ্রেণিশিক্ষক। তার গা ঘেঁষে অষ্টম শ্রেণির ‘খ’ শাখা। তার পরেই একই দিকে নবম শ্রেণি ‘ক’ শাখার কক্ষ- আমাদের শ্রেণি শিক্ষক ছিলেন অমূল্য স্যার (অমূল্য সাহা)। তার মুখোমুখি ছিল নবম শ্রেণি ‘খ’ শাখার কক্ষ। সেটার পাশ ঘেঁষে দশম শ্রেণি ‘খ’ শাখার কক্ষ। তার মুখোমুখি দশম শ্রেণি ‘ক’ শাখার কক্ষ- বড় হামিদ স্যার (আবদুল হামিদ) শ্রেণি শিক্ষক। আবদুল হামিদ বলে আরেকজন শিক্ষক ছিলেন বলে ‘বড় হামিদ স্যার’ ও ‘ছোট হামিদ স্যারের’ এ চিহ্নিতকরণ।

এটাই স্কুল জীবনে আমার শেষ শ্রেণিকক্ষ। এখান থেকেই খাল পেরিয়ে শহরেরে রাস্তা দেখা যেতো, সার্কিট হাউসের একাংশ দেখা যেতো, দেখা যেতো ‘বেয়াইয়ের দোকান’। পেছনের দরজায় দাঁড়ালে দেখা যেতে শরীর শিক্ষাগার, পেছনের ছোট মাঠ পেরিয়ে স্কুলের ছোট দালান। এ ঘর থেকে বেরিয়ে বাঁয়ের সিঁড়ি দিয়ে নামলেই বাড়ির পথ ডাক দিতো।

সব কটি শ্রেণিকক্ষের দুটো করে দরজা থাকত- একটি সামনে বারান্দা-পথের ওপর, অন্যটি কক্ষের পেছনে। প্রথমটি দিয়ে ঢুকতে হত। সব দরজাই ফরাসী জানালার মতো উপর থেকে মেঝে পর্যন্ত। শুধু বারান্দা সংলগ্ন কক্ষগুলোতে তিনটে- একটি বারান্দায় যাবার জন্যে। মজবুত ছিল প্রতি কক্ষের দেয়াল, দরজা আর অন্য সব কিছু। ঘরে ঢুকেই একটি নীচু চৌকির ওপরে একটি চেয়ার- শিক্ষকদের বসার জন্য, তার সামনে সারি সারি উঁচু-নীচু বেঞ্চ শিক্ষার্থীদের বসার জন্যে, কোনায় লেখার বোর্ড।

প্রতিটি ঘরে ছাদ থেকে ঝুলানো পাংখা-ভারী কাঠের কাঠামোয় চাটাই জাতীয় জিনিসের চারধারে লাল সালু মোড়া। শিক্ষার্থীদের মাথার ওপরে দুটো পাঙ্খা- প্রতিটি এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়াল অবধি এবং শিক্ষকের মাথার ওপরে দৈর্ঘ্যে ছোট একটি। সবগুলো দড়ি দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে গ্রন্থিবদ্ধএবং সে দড়ি ব্যাপ্ত কক্ষের পেছন পর্যন্ত। গ্রীষ্মের সময় চাকুরী পেতেন পাঙ্খা-টানিয়েরা। পেছনে একটি আসনো বসে তাঁরা দড়ি টেনে পাঙ্খা নাড়াতেন আর আমরা সবাই বাতাস পেতাম। বড্ড কষ্টকর ছিল সে কাজ। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের কালে শ্রেণিকক্ষে বিজলী পাখা ছিল না।

পুরো ভবনটিই একটু উঁচু এক ভিত্তির ওপরে বানানো ছিল- যার নীচে অন্ধকার শূন্যভূমি। এ শূন্যভূমি আটকানো ছিল লোহার শিক দেয়া অর্ধবৃত্তাকার জানালায়। গজিয়ে ওঠা জঙ্গল, বোতল-ভাঙ্গা, জং ধরা টিন- সবকিছু মিলিয়ে রীতিমতো এক বিপজ্জনক জায়গা। সাপ-খোপ থাকাও বিচিত্র কিছু নয়। কিন্তু নানান গোয়েন্দা কাহিনী পড়া আমাদের রোখে কে? বিজলী বাতি, ছুরি, লাঠি নিয়ে প্রবল উত্তেজনায় আমরা প্রতিদিন বিরতির সময়ে অভিযানে বেরুতাম ঐ বিপজ্জনক জায়গায়। কোন গুপ্তধন না পেয়ে, গায়ে-পায়ে ময়লা লাগার কারনে ক’দিন পরেই ক্ষান্ত দেয়া গেল।

সেই অনিন্দ্যসুন্দর ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। তার জায়গায় স্থাান করে নিয়েছে কসাধারল ক’টি ভবন- পথে ঘাটে যার ননুনা ভুরিভুরি। এ সব ভবনের কোন স্বাতন্ত্র্য থাকে না, কোন ব্যক্তিত্ব থাকে না, কোন চরিত্র থাকে না। বর্তমান ভবনটিকে আমি আমার বরিশাল জিলা স্কুল বলে স্বীকার করি না। আমার স্কুলের প্রাণসংহার করা হয়েছে আমার কাছে- যারা এটা করেছেন, আমার কাছে তারা ক্ষমার অযোগ্য।


লেখক: সেলিম জাহান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অর্থনীতির অধ্যাপক এবং বর্তমানে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন পরিচালক।

ছবি কৃতজ্ঞতা: বরিশাল জিলা স্কুল অবয়বপত্র