শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

June 29, 2020, 11:14 p.m.

বাবা আমি এত তাড়াতাড়ি মারা যাবো?
বাবা আমি এত তাড়াতাড়ি মারা যাবো?
সংগৃহীত। - ছবি:


১৪ জুন রাত আড়াইটা। বড় কন্যার তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট সহ্য করতে পারছিলা না। কষ্টে বাবা বাবা বলে চিৎকার করছিল। করোনা সময়ের কথা চিন্তা করে এবং কষ্ট দূর হবে ভেবে দ্রুত লেবুজল, লবঙ্গ ও গোলমরিচের চা করে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুতে কিছু হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে যায়। দম নিতে না পেরে কন্যা বলে ওঠে বাবা ‘আমি কি এতো তাড়াতাড়ি মারা যাবো?’ বলেই আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে বিছানার ওপর পড়ে যায়। বাবা ভাবে সত্যিই কি অন্তিম সময়ের দ্বারে?  তারপরও মাথা এবং শরীরে হাত বুলাতে থাকি। দেখি কপাল ঠাণ্ডা। তার মধ্যেও ঘামছে। আর জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু শ্বাস নিতেই পারছে না। মনে হয় গলায় আটকে যাচ্ছে।

বাবার সামনে কন্যার এমন আর্তির সময় বাবার মনের অবস্থাটা কি হয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টার সঙ্গে আর্তনাদ করে বারবার বলছিল, ‘বাবা তোমার তো এতো ডাক্তার পরিচিত, কাউকে একটু ফোন দিতে পারছো না? আমি মনে হয় বাঁচবো না। আমি শ^াস নিতে পারছি না। আমকে অক্সিজেন দাও। তুমি অন্তত মনিষা আন্ডিকে তো একটা ফোন দিতে পারো। আমি... শ্বাস... পারছি না’। ততক্ষণে চোখমুখ দিয়ে পানি ঝরছে। পুরো শরীর শীতল হয়ে যাচ্ছে। হাত-পা আমার হাত দিয়ে সজোরে ঘসে উষ্ণ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছি। আমি তখন কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়ি। কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। ওই রাতে কাকে ফোন দেবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এদিকে সময়ও নষ্ট হচ্ছে। করোনার কারণে পরিচিত অপরিচিত সব ডাক্তার সন্ত্রস্ত। দিনের বেলা ফোন দিলে পাওয়া গেলেও গভীর রাতে পাওয়া কঠিন। সে বিষয়টি আমার জানা। বারবার তাকাচ্ছিলাম কন্যার মুখের দিকে। নিজের ভেতরে কষ্ট হলেও কন্যাকে বুঝতে দিচ্ছিলাম না। অথচ ভেতরটা খাক হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছিল এবং অপরাধীও মনে হচ্ছিল। তাহলে কি আমার কিছুই করার নাই? চোখের সামনে কন্যার এই অবস্থা, বাবা হয়ে আমি কিছুই করতে পারবো না?

এমন নানান ভাবনার মধ্যেই রাত তিনটায় মুঠোফোনের বাটন চাপি ডা. মণিষাকে পাওয়ার জন্য। কিন্তু না, মণিষা ফোন তোলেনি। এরপর ফোন দেই বেঙ্গল ক্লিনিকে। সেখানেও ফোন তুললা না। ততোক্ষণে শ^াসকষ্ট আরো তীব্র হয়েছে। ফোন দেই আমার পরিবারের পরামর্শক সুদীপ কুমার নাথকে। সুদীপও তখন অসুস্থ্য। তার মধ্যেই সুদীপ ফোন তুলল। বললাম আমার অক্সিজেন দরকার। বড় কন্যার অবস্থা ভালো না। ফোনের মধ্যেই সুদীপ কিছু পরামর্শ দিল। পরে আবার সুদীপকে ফোন দিয়ে বলি এখনই অক্সিজেন লাগবে, তুমি বেঙ্গল ক্লিনিকের হাসানকে বলো অক্সিজেন নিয়ে প্রস্তুত থাকতে। আমি গিয়ে নিয়ে আসবো। এরপর অপেক্ষা না করে বেঙ্গলের পরিচালক নেজারুল বাবুকে ফোন করি। বাবু ঘুমের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে ফোন ধরে জানতে চায় কি হয়েছে? বাবুকে বললাম, বড় কন্যার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। দ্রুত হাসানকে অক্সিজেন নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলো। এতো কিছুর মধ্যেও আমি মনোবল না হারিয়ে দৃঢ় থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছি। বারবার সেই চেষ্টা অনেকটাই ব্যর্থ হয়ে করে দিচ্ছে। কন্যাকে বললাম, বাবা একটু সহ্য করো, আমি অক্সিজেন নিয়ে আসছি। এই বলে ওর রুম থেকে বের হই।

বাসা থেকে বের হয়ে ছুটি বেঙ্গল ক্লিনিকের দিকে। সেখানে আগে বলে রাখায় দারোয়ান গেট খুলেই রেখেছিল। দোতলায় গিয়ে হাসানকে অক্সিজেন সিলিণ্ডর নিয়ে দ্রুত নামতে বলি। হাসান নিজেই অক্সিজেন সিলিণ্ডর কঁধে নিয়ে আমার সঙ্গে আসে। মটোরসাইকেলে নিয়ে আবার ছুটলাম বাসার দিকে। বাসায় যখন পৌঁছাই তখন দেখি কন্যা উপর হয়ে শুয়ে আছে। অনেকটা নিস্তেজ অবস্থা। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। ভয়ে ভয়ে রুমে প্রবেশ করি। সঙ্গে হাসান অক্সিজেন সিলিণ্ডর নিয়ে। পরে জানতে পারি আমি চলে যাওয়ার পর সুদীপ এবং তন্ময় মুঠোফোনে কন্যাকে সাহস যুগিয়ে চলেছে। তাদের পরামর্শেই উপর হয়ে শুয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পারছিলো না। এরমধ্যেই হাসান দ্রুত অক্সিজেন চালু করে অক্সিজেনমাক্স পড়িয়ে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ৩০ মিনিট অক্সিজেন চলার পর আস্তে আস্তে স্বস্তি ফিরে পায় কন্যা। আমিও যেন অনেকটা আস্বস্ত হই। নিজের অজান্তেই স্বস্তির নিঃশ্বাস বের হয়। এরপর তিনদিন বাসায় অক্সিজেন সিলিণ্ডর ছিলো। পরে অবশ্য নেবুলাইজার মেশিন কিনে ফেলি। জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণের এক বাস্তব চিত্র দেখতে হয়েছে আমাকে। এমন নির্মম অভিজ্ঞতা যেন কারো না হয়।

কয়েক দিন ধরে অবশ্য বড় কন্যার কাশি, জ¦র ও গা ব্যাথা ছিল। আমরা বাড়িতেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছিলাম। কিন্তু এর মধ্যে দুইদিন শ্বাসকষ্ট হলেও কন্যা সেটা চেপে যায়। আমাদের জানায়নি। তৃতীয় দিন গভীর রাতে শ্বাসসকষ্ট যখন সহ্য করতে পারছিল না তখনই আমাকে ডাকে। আর আমাদের ওই পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়। এখন বড় কন্যাসহ আমরা ভালো আছি।

আমরা ভালো আছি বললাম এই কারণে গত ৪ জুন সামান্য গলা ব্যাথা এবং কাশি নিয়ে প্রথম আমি অসুস্থ্য হই। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী কন্যাদের ছেড়ে আলাদা রুমে চলে যাই। আমি আলাদা হওয়াটা বড় কন্যা মানলেও মানতে চাইছিল না ছোট কন্যা। তারপরও তাকে দূরেই রেখেছি। একদিন পর কাশি বাড়ে। তার সঙ্গে ডায়রিয়া দেখা দেয়। চার-পাঁচবার পাতলা পায়খানা হওয়ার পর শরীর নিয়ন্ত্রণ রাখা যাচ্ছিল না। যদিও ডায়রিয়া দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে থাকা এমোডিস-৪০০ খেয়ে ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি। কিন্ত আমার ওই চেষ্টা করে ব্যর্থ করে দেয়। বাধ্য হয়ে চিকিৎসকরে পরামর্শ নিতেই হলো।

চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত জিম্যাক্স-৫০০ খাওয়া শুরু করি। পরের দিন ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে আসলেও শরীরের দুর্বলতা কাটছিল না। এরপর একটানা ৫দিন জিম্যাক্স-৫০০, সঙ্গে নাপা এক্সটেণ্ড এবং ফেক্সো-১২০ খেতে থাকি। একই সঙ্গে বাড়িতে থাকা টোটকা ব্যবস্থাতো ছিলই। গোলমরিচ, আদা, লবঙ্গ, লেবু, চা, গরম ভাপ নেওয়া চলে নিয়ম করে। গরম ভাতে কালোজিরা খাওয়াও নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে যায়। স্ত্রী-সন্তানের সেবায় দ্রুত সুস্থ্য হয়ে যাই। কিন্তু ব্যবস্থাপত্র বন্ধ হয়নি। বাড়ির অন্য সদস্যরা যাতে আক্রান্ত না হয় সেই চেষ্টা চলতেই থাকে সবার।

বাড়ির অন্য সদস্যরাও আমার সঙ্গে একই ব্যবস্থা নিয়েও রক্ষা পায়নি। আমি সুস্থ্য হতে হতেই জ¦র দেখা দেয় ছোট কন্যার। এবার! তাকে আলাদা করবে কে? শেষ পর্যন্ত ছোট কন্যাকে আমার সঙ্গে একই কক্ষে রেখে বড় কন্যা এবং কন্যাদের মাকে রক্ষা করার চেষ্টা করি। দুইজনের আলাদা ব্যবস্থা করতে গিয়ে এবার স্ত্রীর ওপর চাপ বেড়ে গেলো। তবে আমার কাশি হওয়ার আগে থেকেই আমার সঙ্গে বাড়ির বাকি তিন সদস্য গরম ভাপ নেওয়া, একই উপাদানের চা ও অন্যান্য প্রতিশেধক ব্যবস্থা নিতে থাকায় কিছুটা স্বস্তি ছিল। তারপরও কোনভাবেই যাতে করোনা আমাদের কাছ থেকে সুযোগ নিতে না পারে সেই চেষ্টা চলছিল নিরন্তরভাবে। কোন রকম সুযোগ না দিয়ে ছোট কন্যার জ¦র ঠেকাতে নাপা এক্সটেণ্ড এবং ফেক্সো-১২০ এবং ইমিউনিটি বাড়াতে জিংক ট্যাবলেট খাওয়াতে থাকি। সঙ্গে মৌসুমী ফল, কাউ, জাম, লটকা, আমসহ অন্যান ফল। এসব ব্যবস্থার কারণে ছোট কন্যাকেও তেমনভাবে দমাতে পারেনি। চারদিনের মধ্যে সেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

গোল বাধে বড় কন্যা আক্রান্ত হলে। ছোট কন্যা স্বাভাবিক হওয়ার কয়েক দিন পর বড় কন্যা আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেই আইসলেশনে চলে যায়।, থালা-বাটি সব আলাদা করে ফেলে। আমরাও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করি। বেশি দূরে রাখতে চেষ্টা করি কন্যাদের মাকে। কমবেশি আমিই বড় কন্যার পাশে গেছি এবং থেকেছি। তবে একবারের জন্যও মনে হয়নি বড় কন্যা করোনায় আক্রান্ত হতে পারে। এখনও বিশ্বাস করি আমরা কেউই করোনায় আক্রান্ত হইনি। যদিও কন্যারা করোনার পরীক্ষা করাতে চেয়েছিল। আমিই নিরুৎসাহিত করেছি। তীব্র শ্বাসসকষ্ট হওয়ার পর বড় কন্যাকে একটানা চারদিন আমার সঙ্গেই রেখেছি পরম স্নেহে। রাতে শ্বাসকষ্ট হলেই অক্সিজেন কিংবা নেবুলাইজার দিয়েছি। আস্তে আস্তে বড় কন্যাও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। আমার কাশি, ডায়রিয়া, ছোট কন্যার জ¦র এবং বড় কন্যার তীব্র শ্বাসসকষ্ট ও শরীর ব্যাথার মধ্য দিয়ে আমরা একটা অম্লমধুর জার্নি করেছি। এই জার্নিতে আমার স্ত্রী নিরাপদেই ছিলেন। তবে কোন বাবার সামনে যেন কোন সন্তানের এমন ভয়বহ অবস্থা দেখতে না হয়। আমরা সবাই এখন নিরাপদেই আছি।