শুক্রবার, ০৭ আগষ্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

July 2, 2020, 1:10 a.m.

কেরানীর নির্দেশে চলে নৌযান!
কেরানীর নির্দেশে চলে নৌযান!
লঞ্চ দুর্ঘটনা - ছবি:

সারা দেশে অদক্ষ নৌযান চালকদের হাতে যাত্রীদের জীবন যাচ্ছে। একজন কেরানী আর একজন সুকানী মিলেই নৌযান পরিচালনা করে। কেরানী যাত্রীদের টিকেট কেটে মাস্টার ব্রীজে এসে সুকানীকে নির্দেশনা দেয়। টাকার বিনিময় বেশিরভাগ নৌযান মাস্টার-সুকানীর সার্টিফিকেট হওয়ায় ঘটছে বিপর্য। একই সঙ্গে নৌযান দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিচার না হওয়ায়ও বাড়ছে দুর্ঘটনা।

নৌযান পরিচালনায় সাধারণত মাস্টার নির্দেশনা দেন। সুকানী নৌযান পরিচালনা করেন। আর ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণ করেন ড্রাইভার। এই ৩জনের সমন্বয়ের মাধ্যমেই চলে বড়-ছোট নৌযান। কিন্তু প্রশিক্ষণবিহীন অদক্ষ মাস্টার, সুকানী এবং ড্রাইভারের সমন্বয় না হওয়ায় প্রায়ই ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা। এতে প্রানহানী হচ্ছে, চিরতরে পঙ্গু হচ্ছে অনেকে। ক্ষতি হচ্ছে বিপুল সম্পদের।

প্রথম শ্রেণির নৌযান মাস্টার মো. নুরুল ইসলাম মোল্লা জানান, দূরপাল্লা রুটের বেশিরভাগ লঞ্চে ২জন করে প্রথম শ্রেণির মাস্টার থাকেন। কিন্তু স্থানীয় রুটের লঞ্চগুলোতে কোন প্রশিক্ষিত মাস্টার নিয়োগ দেওয়া হয় না। একজন কেরানী আর একজন সুকানী মিলেই নৌযান পরিচালনা করে। কেরানী যাত্রীদের টিকেট কেটে মাস্টার ব্রীজে এসে সুকানীকে নির্দেশনা দেয়। কিন্তু সুকানীও প্রশিক্ষত না হওয়ায় প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। প্রানহানী হয়।

এসব অনিয়ম যাদের দেখার দায়িত্ব সেই বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রয়েছে দায়িত্বে অবহেলা আর সার্টিফিকেট বিক্রির বিস্তর অভিযোগ। যদিও এমন অভিযোগ অমূলক বলে দাবি করেছেন বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) আজমল হুদা মিঠু সরকার।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখো গেছে, বরিশাল নদী বন্দর থেকে ছেড়ে যাচ্ছিল এমভি  সোহেলী। নিয়ম অনুযায়ী একটি নৌযান গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়ার আগে সেটির জন্য প্রযোজ্য মাস্টার, সুকানী এবং ড্রাইভার আছে কিনা সেটি তদারক করার কথা বিআইডব্লিউটিএর একজন ট্রাফিক পরিদর্শকের। কিন্তু ওই নৌযানটি গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে এসব তদারক করতে দেখা যায়নি কোন ট্রাফিক পরিদর্শককে। কেবল সোহেলী নয়, বরিশাল নদী বন্দর থেকে ঢাকাসহ স্থানীয় রুটগুলোতে ছেড়ে যাওয়া কোন লঞ্চের মাস্টার, সুকানী ও ড্রাইভার যথাযথভাবে আছ কিনা সেটি তদারক করা হয় না বলে জানিয়েছেন একটি লঞ্চের মাস্টার মো. মিলন। তদারকী না থাকায় অদক্ষদের দিয়ে নৌযান চালানোয় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।

বরিশাল নদী বন্দরে হুমায়ুন কবির নামে একজন যাত্রী জানান, ঢাকার দুর্ঘটনার চিত্র দেখলে যে কেউ বুঝতে পারে যে, অদক্ষদের দিয়ে ময়ুরী-২ লঞ্চটি চালানো হচ্ছিলো। তাদের জীবন-সম্পদ রক্ষায় অভিজ্ঞ মাস্টার, সুকানী ও ড্রাইভার দিয়ে যাত্রীবাহি নৌযান চালানোর দাবি জানান তিনি।
এদিকে প্রশিক্ষণ বিহীন অদক্ষরা লঞ্চ চালানোর দায়িত্ব পাবার জন্য টাকার বিনিময়ে মাস্টার, সুকানী ও ড্রাইভার সার্টিফিকেট কিনছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিজ্ঞ নৌযান মাস্টাররা। তাদের দাবি বিগত সময়ে (নৌ পরিবহন মন্ত্রী মো. শাজাহান খানের আমলে) টাকার বিনিময়ে ৯০ ভাগ সার্টিফিকেট এসেছে।

বরিশাল-ঢাকা রুটের এমভি সুন্দরবন-১১ লঞ্চের মাস্টার মো. আলমগীর হোসেন অভিযোগ করেন, লঞ্চ চালোনায় যারা ২০ থেকে ৩০ বছরের অভিজ্ঞ কিন্তু লেখাপড়া কম বা অশিক্ষিত তাদের সার্টিফিকেট দেওয়া হয় না। নৌ সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম দুর্নীতি চলে আসছে। যত বার দুর্ঘটনা ঘটে, ততবার তদন্ত কমিটি হয়, অথচ যারা সার্টিফিকেট বাণিজ্যের জন্য দায়ী তারাই থাকেন তদন্ত কমিটির দায়িত্বে। এ কারণে কোন দুর্ঘটনায় আজ পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক বিচার কিংবা সুপারিশ কার্যকর হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশাল নদী বন্দরের একজন প্রবীণ নৌযান শ্রমিক বলেন, তিনি গত ৩০ বছরে অন্তত ৪ বার মাস্টার হওয়ার পরীক্ষা দিয়েছেন। চাকুরী করেন বাংলাদেশের নৌযানে, অথচ পরীক্ষায় জিজ্ঞাসা করা হয় ভারত, লন্ডন ও সিঙ্গাপুরের নৌ মাকিং। কারণ তিনি টাকা দিতে পারেন না, এ কারণে তিনি মাস্টারও হতে পারেননি। দালালের মাধ্যমে না যাওয়ার কারণে অনেকে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম শ্রেণির মাস্টারে উন্নীত হওয়ার পরীক্ষা দিলেও বারবার তাদের ফেল করিয়ে দেয়া হয়।

আরেকজন প্রথম শ্রেণির মাস্টার জালাল আহমেদ বলেন, বেশী বেতন দিতে হবে এই ভয়ে ছোট লঞ্চলোতে অভিজ্ঞ মাস্টার নিয়োগ দেওয়া হয় না। ফলে কেরানীরা কিকেট কাটে, তারাই আবার লঞ্চ চালায়। এ কারণে দুর্ঘটনা অনিবার্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাকার বিনিময়ে নৌযান চালানোর সার্টিফিকেট পাওয়া যায় বলে জোর দিয়ে বলেন অভিজ্ঞ মাস্টার জালাল আহমেদ।  

তৃতীয় শ্রেণির মাস্টার মো. সবুজ জানান, চোখের সামনে যাদের কেবিন বয় কিংবা লস্করের চাকুরী করতে দেখেছেন, কোন ধরণের প্রশিক্ষক ছাড়াই হঠাৎ দেখেন তারা মাস্টার হয়ে গেছেন। কিভাবে জানতে চাইলে সবুজসহ দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির অন্যান্য মাস্টাররা জানান, দালালের মাধ্যমে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দিলে যে কেউ মাস্টারের সার্টিফিকেট আনতে পারবে। এতে কোন দক্ষতা কিংবা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। এটা নৌ সেক্টরে ওপেন সিক্রেট। ঢাকার দুর্ঘটনার জন্য দুই লঞ্চের অদক্ষ মাস্টাররা দায়ী। বিআইডব্লিউটিএ কোনভাবে এই দায় এড়াতে পারেন না।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ যাত্রী কল্যান সংস্থার পরিচালক ও বরিশাল জেলা লঞ্চ মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আজিজুল হক আক্কাস বলেন, দুই একটি লঞ্চ ফাঁকে জোকে অভিজ্ঞ মাস্টার, সুকানী কিংবা ড্রাইভার ছাড়া চলতে পারে। বেশীরভাগ লঞ্চ অভিজ্ঞদের দিয়ে পরিচালনা করা হয়। তবে টাকার বিনিময়ে মাস্টার-সুকানী-ড্রাইভার সার্টিফিকেট পাওয়ার কথা সঠিক নয়। তারা বলুক কাকে তারা টাকা দিয়েছে, ‘দে আর লায়ার’।

বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) আজমল হুদা মিটু সরকার বলেন, কোন নৌযান গন্তব্যে যাওয়ার আগে সেটির মাস্টার, সুকানী আছে কিনা পরীক্ষা করে তবেই তাকে ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকে। বিশেষ ক্ষেত্রে দুই একটি লঞ্চে মাস্টার না থাকতে পারে। তবে সেসব লঞ্চ সুকানীরাই চালাতে পারে। ঢালাওভাবে অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিতদের মাস্টার সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে, এটা বাহুল্য কথা। নৌ দুর্ঘটনা রোধে বিআইডব্লিউটিএ বরিশালের মাস্টারদের প্রতি ৩ মাস পর পর মোটিভেশনাল স্পিস দিয়ে থাকে। তাদের নৌযান চালানোর জন্য নানা পরামর্শমূলক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। এ কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বরিশালে নৌ দুর্ঘটনা কম বলে জানান নদী বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা।