শনিবার, ০৮ আগষ্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

July 6, 2020, 11:56 p.m.

রাষ্ট্রীয় পাটকলের মৃত্যু ঘটাতেই এই উদ্যোগ?
রাষ্ট্রীয় পাটকলের মৃত্যু ঘটাতেই এই উদ্যোগ?
ভোরের আলো। - ছবি:

গোটা পৃথিবীর ইতিহাস বলে রাস্ট্রয়াত্ত সব প্রতিষ্ঠান লাভবান হয়। বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশের যত সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে সবগুলোই লোকসান গুনছে এমন অভিযোগ। অথচ একই ধরণের প্রতিষ্ঠান বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তারা লাভ করছে এবং শ্রমিকদের মজুরী দিয়েও ফুলে ফেপে উঠছে। কেবল লোকসান এবং নানা অজুহাতে আমাদের দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে বললে ভুল হবে, মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানের মৃত্যুর সুবিধা নিচ্ছে একদল তথাকথিত ব্যবসায়ী। যুগে যুগে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয় আসছে সরকার। এই প্রতিষ্ঠানগুলো মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যখন যারা ক্ষমতায় থাকেন তখন তারাই মূখ্য ভূমিকা নেন। এবারে বর্তমান সরকার দেশের ২৬ সরকারি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এরই মধ্যে ওইসব পাটকলের শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যা-সেকের নামে ছটাই করা হচ্ছে। এঘটনায় তীব্র আন্দোলন শুরু হলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করার জন্য ওই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একটা জানা গল্প স্মরণ করিয়ে দেই। এক অন্ধ লোকের হাতি দেখতে ইচ্ছে করেছে। তিনি তার এক একান্ত কাছের বন্ধুকে বললো ভাই, আমাকে একটু হাতি দেখাতে নিয়ে যাবে? বন্ধু বললো তুমি তো চোখে দেখো না, তাহলে হাতি দেখবে কিভাবে? অন্ধ বন্ধু বললো, তুমি হাতি দেখে আমাকে বর্ণনা করলে আমি বুঝতে পারবো। অগত্যা বন্ধু রাজী হলো। অন্ধ বন্ধুকে হাতি দেখাতে নিয়ে গেল। এবার শুরু হলো হাতির বর্ণনা। অন্ধ বন্ধুকে হাতির শুর বলে এমন একটি জিনিষ ধরিয়ে দিলেন। অন্ধ বন্ধু সেটাই হাতির  শুর বলে বিশ^াস করলো। বন্ধু হাতির কাছে না গিয়ে তার মতো করে এক একটি জিনিষ ধরিয়ে দিয়ে হাতির বর্ণনা দিচ্ছিল। সেই গল্পের রহস্য আপনাদের জানা। সরকারি পাটকলগুলো আধুনিকায়নের নামে বন্ধের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তা ওই অন্ধ লোককে হাতি দেখানোর মতোই। কোন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে আধুনিকায়ন! আবার একটি নয়, দুটি নয় সরকারি সবকটি পাটকল বন্ধ করে আধুনিকায়ন! এটা তো পাগলেও বিশ্বাস করবে না। যদি সত্যিকার সদিচ্ছা থাকতো তাহলে তো প্রতিষ্ঠান চালু রেখেই আধুনিকায়ন করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। 

আমাদের দেশে পাটশিল্পের উজ্জল ইতিহাস রয়েছে।  ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই বাংলাদেশে পাটের চাষ শুরু হয়। ১৯৫১ সালের মাঝামাঝিতে নারায়ণগঞ্জে প্রথম পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয়। বেসরকারি পরিচালনায় প্রতিষ্ঠিত এই মিলটির নাম ছিলো বাওয়া পাটকল। পরবর্তী সময় একই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়এশিয়ার বৃহত্তম আদমজী পাটকল। ১৯৬০ সালে যার সংখ্যা ১৬টি এবং ১৯৭১ সালে ৭৫ টিতে। পাটশিল্পের প্রসার ঘটাতে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির এক আদেশে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পাটশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে।সোনার সঙ্গে আমাদের পাটকে তুলনা করা হতো। বৈদেশিক অর্থ আসতো আমাদের পাটশিল্পের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু স্বাধীনতার কয়েক দশকে আমাদের সোনালী আঁশ কালো ছায়ায় ঢেকে যেতে থাকে। কমতে থাকে সরকারি পাটকলের সংখ্যা। ১৯৮২ সালের পর বিরাষ্ট্রীয়করণ ও পাটশিল্প থেকে পুঁজি প্রত্যাহার শুরু হলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হওয়া শুরু হয়। ২০০২ সালে বন্ধ করা হয় আদমজী। বর্তমানে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) এর অধীনে মোট মাত্র ২৬টি পাটবল রয়েছে। সেই পাটকলও বন্ধের নতুন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। দেশের মানুষ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চক্রান্ত বলে মনে করছে।

সারা দেশে রাস্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে মানুষ। এটাকে তারা গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দিচ্ছেন। কোনভাবেই দেশের পাটশিল্পকে ধ্বংস না করে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের কাছে উদাত্ত আহ্বানও জানাচ্ছেন তারা। গত প্রায় সাড়ে চার দশকে রাষ্ট্রীয় পাটকলের ইতিহাস ক্রমাগত লোকসানের ইতিহাস এই কথা উচ্চকণ্ঠে বলছেন কর্তাব্যক্তিরা। বারবারই সরকারের পক্ষ থেকে লোকসানের খতিয়ান তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু কাদের কারণে লোকসানে পড়তে হচ্ছে সেটা পরিষ্কার করা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ মনে করে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ মাফ করা হয়েছে। অথচ পাটশিল্পকে আধুনিকায়ন করা যায়নি। কি করলে লোকসানকে লাভে পরিণত করা যেত সেসব নিয়ে যত প্রশ্ন এবং প্রস্তাবনা কোনোটিরই উত্তর পাওয়া যায়নি ওই সাড়ে চার দশকে।

সারা দেশে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে দাবি করা হয়েছে, ৪০/৫০ বছরের পুরনো যন্ত্রপাতির বদলে আধুনিক মেশিন স্থাপন করলে খরচ হতো ১২০০ কোটি টাকা। তাতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেত তিনগুণ। শ্রমিক ছাঁটাই না করে উল্টো শ্রমিকদে ২৫ হাজার টাকা মজুরি দিয়েও কারখানা লাভজনক করা যেত। সেই টাকা বরাদ্দ হলো না। অথচ ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলো কারখানা বন্ধ করার জন্য। এটা কোনভাবেই কাম্য নয়। বৈশ্যিক করোনা মহামারীর সময় শ্রমিকদের কর্মহীন করা এবং সরকারি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পাটকল চালু রেখে আধুনিকায়ন করার দাবি করছেন তারা।

যখন বাংলাদেশের সরকারি সব প্রতিষ্ঠান লোকসানে জীর্ণশীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সেই সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থবিত্তে মহীরুহ হচ্ছে। এটা কিভাবে সম্ভব? সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধের সুযোগ নিয়ে তারা সাদা-কালো নানা পথে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে যাচ্ছেন। সেই অর্থ দেশে বিনিয়োগ করছেন না। তারা আমাদের দেশের শ্রমিকদের শোষণ করে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে সেখানে গড়ে তুলছেন শিল্পকারখানা। আর আমার দেশের শ্রমিকরা চাকুরী হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বির্যস্ত অবস্থা তাদের।

আমাদের দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একই ধরণের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চিত্র তুলে ধরলে বুঝিতে পারবেন আমরা কোথায় অবস্থান করছি। বাংলাদেশ বিমান সরকারি সকল সুবিধা থাকার পরও লোকসানী প্রতিষ্ঠানের নাম। অথচ একই সময় বেসরকারি বিমান বাংলাদেশ বিমানের সামনে হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করছে। এটা কিভাবে সম্ভব? তাহলে বোঝাই যাচ্ছে বিমানের এই লোকসান মূলত বেসরকারি বিমানকে উৎসাহিত করা। আমাদের সরকারি মুঠোফোন কোম্পানী টেলিটক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দেশে অতি নগন্য। কেন? টেলিটকে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না, টেলিটকে অন্যান্য মুঠোফোন কোম্পানীর মতো সুবিধা পাওয়া যায় না। মজার ব্যাপার হলো আমাদের সরকার নিয়ন্ত্রিত বিটিআরসির কাছ থেকে সেবা কিনে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর যাদের হাতে মূল নেটওয়ার্ক সেই সরকারের মুঠোফোন ধুকে মরছে। আমাদের তো খুঁজে দেখা উচিত কারা আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে অবৈধ সুবিধা নিচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষা করুন।

এরপর বিআরটিসি আরেক লোকসানী প্রতিষ্ঠানের নাম। প্রতিদিন এই প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য বাস নিলাম হচ্ছে। আর সেগুলো কিনে নিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে চালিয়ে তারা কোটি কোটি টাকা লাভ করছে। বিআইডব্লিউটিসি লোকসান গুনতে গুনতে এখন প্রায় মৃত প্রতিষ্ঠান। বিআইডব্লিউটিসির একটি করে জাহাজ বন্ধ হচ্ছে আর বেসরকারিভাবে একাধিক জাহাজ নির্মাণ হচ্ছে। তারা প্রত্যেকে হাজার কোট টাকার মালিক হচ্ছেন। এরকম অসংখ্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের তালিকা পাওয়া যাবে। কিন্তু সরকারি এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেন লোকসান গুনছে, কেন এগুলোর সেবা বাড়ছে না সেব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ নেই। কেবল লোকসানের অজুহাত তুলে একটির পর একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি রাঘব বোয়ালদের হাতে চলে যাচ্ছে। সব শেষে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মারক পাটকলগুলোর অবস্থাও সেরকম হতে যাচ্ছে।

সারা দেশ এবং পাশ^বর্তী দেশ ভারতে আমাদের দেশের পাট নিয়ে পন্য তৈরি করছে। সেই পন্য আমরা বেশি দামে কিনছি। অথচ আমাদের সরকারি পাটকলগুলো লোকসানের অজুহাত দিয়ে বন্ধ করা হচ্ছে। পাট নিয়ে লুটপাট ও পাটের সম্ভাবনার পথ বন্ধ করছে যারা তাদের বিচার হওয়া দরকার। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার নামে আমদের যেন শ্রমিকদের আহাজারী দেখতে না হয়। সারা দেশের সাধারণ মানুষের দাবি সরকারি ২৬ পাটকল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত বাতিল করে, পাটকলগুলোকে আধুনিকায়নের দিকে নজর দিন। তাহলে পাটশিল্প আমাদের আবার সম্ভাবনার দ্বারে নিয়ে যাবে।