শনিবার, ০৮ আগষ্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭

বদিউর রহমান

July 15, 2020, 11:13 p.m.

কর্মবীর অশ্বিনীকুমার দত্ত
কর্মবীর অশ্বিনীকুমার দত্ত
অশ্বিনীকুমার দত্ত। - ছবি: ভোরের আলো।

আজকের যে বরিশাল আমরা দেখিছি, সেই বরিশালের রূপকারের নাম হচ্ছে মহাত্ম অশ্বিনী কুমার দত্ত। মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ অশ্বিনী কুমার। আজন্ম মানুষের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন তিনি। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে লিখেছেন সাংবাদিক ও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সহসভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান।

১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর অশ্বিনী কুমার দত্ত এবং আরও কয়েকজন নেতার যৌথ স্বাক্ষরে একটি প্রচারপত্র সারা বরিশাল জেলায় প্রচার করা হয়। এই প্রচারপত্রের মূল বক্তব্য ছিল বিদেশী বর্জন, স্বদেশী গ্রহণ। এতে বলা হয়, এ দেশের সুতা বিদেশে নিয়ে কাপড় তৈরি করে তৈরি কাপড় এদেশের বাজারে বিক্রি করলে কাপড়ের দাম বেশি পড়ে। লাভের টাকা চলে যায় বিলেতের শ্রমিক ও মিল মালিকদের পকেটে। তাই বিদেশী কাপড় বর্জন করে দেশী কাপড় কিনতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিদেশী বর্জন আন্দোলনে কোনো প্রকার জোর-জুলুম না করে সকলকে বুঝিয়ে আন্দোলনে শামিল করতে হবে। এরপরও যদি কেউ বিদেশী জিনিস ক্রয় করে তাহলে তাকে ‘একঘরে’ করা হবে অর্থাৎ তার সঙ্গে কোনো প্রকার ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ক রাখা চলবে না। এই আন্দোলন বাস্তবায়ন করতে জেলার প্রতিটি গ্রামে ‘জনসমিতি’র শাখা গঠন করতে হবে।

এই প্রচারপত্রে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হলো ব্রিটিশ-বেণিয়া শাসকদের মধ্যে। ছোটো লাট ব্যামফিল্ড ফুলার একে সরাসরি বিদ্রোহ বলে অভিহিত করল। কারণ এমন ঘোষণা বা Proclamation করার অধিকারী কেবলমাত্র রাজা বা তার প্রতিনিধি। এমন ‘সমিতি’ বা সংগঠন গড়ে তোলা অসঙ্গত, অন্যায় এবং স্পর্ধার। ফুলার অবিলম্বে এই প্রচারপত্র প্রত্যাহারের আদেশ দিলেন। বরিশালের শান্তিপ্রিয় মানুষ সংঘাতে না গিয়ে অশ্বিনীকুমার দত্ত’র নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ফুলারের সঙ্গে দেখা করে তাদের বক্তব্য ব্যাখ্যা করতে চাইলে ফুলার কোনো কথাই শুনতে চাইলেন না। 

‘বরিশালের নাগরিকগণ ফিরিয়া আসিয়া একখানি পত্রে লিখিলেন, যেহেতু লেফটেন্যান্ট গভর্ণর মনে করেন যে আবেদনপত্রখানির কোনো কোনো অংশে এমন কথা আছে যাহার ফলে লোকেরা উত্তেজিত হইয়া শান্তিভঙ্গ করিতে পারে, সেই জন্য আমরা আবেদনপত্রের ঐ অংশ প্রত্যাহার করিলাম’। এই চিঠি পাওয়ামাত্র জিলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ জ্যাক একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করলেন। তাতে লেখা ছিল, ‘বাবু অশ্বিনীকুমার দত্ত এবং তাহার সহযোগীরা আবেদনপত্রখানি প্রত্যাহার করিয়াছেন, কারণ তাহারা বুঝিতে পারিয়াছেন যে আবেদনপত্রখানি বিদ্রোহাত্মক এবং উহা শান্তিভঙ্গের উদ্রেক করিতে পারে।’ অশ্বিনী বাবু তৎক্ষণাৎ জ্যাক সাহেবকে লিখিলেন, ‘লাট সাহেবের সম্মান রক্ষার্থে আমরা আবেদনপত্র হইতে কয়েকটি শব্দমাত্র বাদ দিয়াছি, কিন্তু তাহা প্রত্যাহার করি নাই। সুতরাং আপনার বিজ্ঞপ্তিটি যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিয়াছে তাহা সংশোধন করুন। উত্তর না পাইয়া অশ্বিনী বাবু জ্যাক সাহেবের বিরুদ্ধে আদালতে মানহানির নালিশ করিলেন। জ্যাক সাহেব হারিয়া গেলেন এবং তাহার ১২০ টাকা জরিমানা হইল।’(রমেশচন্দ্র মজুমদার: বাংলাদেশের ইতিহাস: ৪র্থ খ-: জেনারেল কলকাতা: দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৮২ পৃ: ৬৩)

এইসব ঘটনায় বরিশালে শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের দমন-পীড়ন শতগুণ বেড়ে গেল। গুর্খা সৈন্য ও পুলিশ বরিশালবাসীর ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালালো। নানা অত্যাচারের কাহিনি সেই সময়ের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। একটি বাড়ির বেড়ায় ‘বন্দেমাতরম’ লেখা থাকার অপরাধে সেই বাড়িটি ভেঙে মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হয়। বাড়ির রান্নাঘরে বসে ‘বন্দেমাতরম’ উচ্চারণের অপরাধে ১০ বছরের ছোট্ট ছেলেকে পর্যন্ত রেহাই দেয়নি। তাকে টেনে-হিঁচড়ে কাচারিতে নিয়ে গিয়ে হাত-পা বেঁধে  নির্মমভাবে বেত দিয়ে পেটায়। গুর্খারা স্থানীয় দোকান থেকে জোর করে মালামাল নিয়ে যেত ইত্যাদি। 

এই অত্যাচার সম্বন্ধে ঐতিহাসিকের মন্তব্য ‘এই সময় লন্ডনের প্রসিদ্ধ Daily News পত্রিকার বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে নেভিনসন নামে একজন সাহেব বাংলাদেশের নানা স্থানে ভ্রমণ করিয়া যে বিবরণী পাঠাইয়া ছিলেন তাহা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হইয়াছে। অশ্বিনীবাবু ও অন্য কয়েকজন নেতার প্রতি পূর্বোক্ত ফুলারের আচরণ বিবৃত করিয়া তিনি লিখিয়াছেন: ‘কিন্তু’ বরিশালের দুর্ভোগ ইহাতেই শেষ হয় নাই। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার অপরাধে বহুসংখ্যক পদস্থ ব্যক্তিকে ১৫ দিনের মধ্যে বরিশাল শহর ছাড়িয়া যাইতে আদেশ করা হইয়াছে। গুর্খা সৈন্যদল নানা স্থানে ঘাঁটি বসাইয়াছে এবং সর্বত্র লোকের বাড়ীতে ঢুকিয়া যে অত্যাচার করিতেছে ভারতের অন্য কোন প্রদেশে হইলে গুরুতর মারামারি (rioting) ঘটিত’। (প্রাগুক্ত: পৃ: ৬৪-৬৫)

এমন রাজনৈতিক অগ্রগামী পরিস্থিতির স্বীকৃতিস্বরূপ কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলন বরিশালে অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কোনো মফস্বল শহরে এমন সম্মেলন আয়োজন এই-ই প্রথম। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে বরিশালে অনুষ্ঠিত হয় কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন। বিশাল আয়োজন। আয়োজন দেখে হতচকিত হয়ে ব্রিটিশ রাজ আইনজারি করে: ‘রাস্তায় এক ইঞ্চির চেয়ে মোটা লাঠি নিয়ে চলা নিষিদ্ধ আর বন্দেমাতরম ধ্বনি করা যাবে না’। অশ্বিনীকুমার দত্ত’র নেতৃত্বে প্রস্তুতি প্রায় শেষ। প্রতিনিধিদের স্বাগত জানানোর জন্য তিনশত ছাত্র নিয়ে গঠিত হলো স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। অভ্যাগতদের আবাসন, আহার সব প্রস্তুতি শেষ।

বরিশাল শহরে রাজাবাহাদুরের হাবেলি ছিল তখন সভা-সমাবেশের নির্ধারিত স্থান। এই স্থানে পরে নির্মিত হয় অশ্বিনীকুমার হল। শহরের রাজাবাহাদুরের হাভেলিতে (বর্তমানে যেখানে অশ্বিনীকুমার হল অবস্থিত) আয়োজন করা হয়েছিল সম্মেলন। সম্মেলনে যোগ দিতে বরিশালে এসেছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম শ্রেণির নেতৃবৃন্দ। এসেছিলেন সভাপতি ব্যারিস্টার আবদুর রসুল।

‘হঠাৎ পুলিশের তরফ থেকে খবর এল শোভাযাত্রা চলতে পারবে কিন্তু ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি চলবে না’। নেতৃগণ এই আদেশ পালনে অসম্মত হলেন। এর পরে পুলিশের দ্বিতীয় আদেশ এল সংশোধিত আকারে। হাবেলি থেকে কলেজ পর্যন্ত নিঃশব্দ শোভাযাত্রা এবং তারপর সভাম-প পর্যন্ত ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনিসহ শোভাযাত্রা চলতে পারবে। বলা বাহুল্য নেতৃগণ এ প্রস্তাবও অগ্রাহ্য করে সংকল্পিত ধ্বনিসহ শোভাযাত্রার জন্য প্রস্তুত হলেন।

‘বাংলাদেশে এ এক নূতন পরিস্থিতি। বরিশালের ভাগ্য- সরকারি আদেশ সর্বপ্রথম অমান্য করা হবে বরিশালে; উৎসাহ উদ্দীপনায় স্পন্দিত বরিশাল। অনর্থপাত অনিবার্য এবং পুলিশের হস্তে নির্যাতন অবশ্যম্ভাবী জেনেও কেউ ভীত হল না। ১৯০৬ সাল ১৪ এপ্রিল, বাংলা ১৩১৩ সনের ১ বৈশাখ বীরের রক্তে রঞ্জিত হল বরিশালের রাজপথ।’(হীরালাল দাশগুপ্ত: স্বাধীনতা সংগ্রামে বরিশাল: ২য় সংস্করণ পৃ: ৫০-৫১) 

এর প্রতিবাদও হলো বরিশালে। বরিশালের সেই বীরত্বের স্মৃতিতে কবির অনুভূতি প্রকাশ পেল কবিতায়। কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ লিখলেন:
            আজ বরিশাল পুণ্যে বিশাল হলো লাঠির ঘায়
            ঐ যে মায়ের জয় গেয়ে যায়।
                রক্ত বইছে শতধার
                নাইকো শক্তি চলিবার
            এরা, মার খেয়ে কেউ মা ভোলে না,
                সহে শত অত্যাচার!
                এত পড়ছে লাঠি ঝরছে রুধির
                তবু হাত তোলে না কারো গায়।

কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ নিজে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ঘটনার দিনই তিনি এই কবিতাটি রচনা করেন।
সেদিন ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন পুলিশের অত্যাচার-প্রতিরোধে সুরেন্দ্রনাথ স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার বরণ করেছিলেন। পরের দিনই বিচারে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৮৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে দুই শত টাকা জরিমানা করা হয়। আদালতে দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলার অপরাধে আদালত অবমাননার দায়ে আরও দুইশত টাকা জরিমানা। তাৎক্ষণিক জরিমানা পরিশোধ করে আবার সম্মেলনস্থলে যান সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতের মাধ্যমেই সভার কাজ শুরু হয়। পরের দিনও সম্মেলনের অধিবেশন বসে। কিন্তু সেই অধিবেশন আর শেষ হতে পারে না।  জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং দলবল নিয়ে এসে সম্মেলন ভেঙ্গে দেয়। বেপরোয়া লাঠি-পেটা করা হয় সম্মেলনে আগত নেতাকর্মীদের ওপর। 

ইতিহাসবিদের ভাষায়: 
‘যজ্ঞ ভঙ্গ হল। কিন্তু আগুন নিভল না, জ্বলে উঠল দ্বিগুণ বেগে। জ্বলল ঘরে ঘরে। জ্বলল শুধু বাংলাদেশে নয় ভারতের প্রত্যেক প্রদেশে। পূর্ব থেকে যে সব নেতারা গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রদেশে প্রদেশে গুপ্ত সমিতি গড়ে তুলতে প্রয়াসী ছিলেন তাঁরা দেশময় তীব্র অসন্তোষের আবহাওয়ায় নূতন ইন্ধন পেলেন এবং নূতন উৎসাহে কর্মতৎপর হয়ে উঠলেন।’(প্রাগুক্ত: পৃ: ৫৮-৫৯)

এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন আহবান করা হয়েছিল বরিশালে। এ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীসহ বহু কবি-সাহিত্যিক বরিশাল আসেন। এই সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি মনোনীত হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু রাজনৈতিক সম্মেলন ভেঙ্গে যাওয়ায় সাহিত্য সম্মেলনের অধিবেশন আর হতে পারেনি।  

সে সময় সরকারি স্বেচ্ছাচারিতার হাত থেকে স্কুলের ছাত্ররাও রক্ষা পায়নি। অশ্বিনী কুমার দত্ত’র স্কুল ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের ছাত্র হবার অপরাধে দেবপ্রসাদ ঘোষ প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর এবং জিতেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত বৃত্তিযোগ্য নম্বর পেলেও এদের বৃত্তি দেয়া হয়নি। সরকারি নির্যাতন এবং সম্মেলন করতে না পারার ক্ষোভে, ঘৃণায় বরিশালে স্বদেশী আন্দোলন আরও জোরদার হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই এর নেতৃত্বে ছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্ত। স্বদেশী গ্রহণ এবং বিলাতি বর্জন প্রচার এত ব্যাপক ফলপ্রসূ হয়েছিল যে ‘বরিশাল জিলায় এই আন্দোলনের ফলে তিন কোটি টাকার বিলাতি বস্ত্র বিক্রয় হ্রাস পেয়েছিল এবং বিলাতি মদের বাহান্নটি দোকানের মধ্যে দুইটি দোকানের অস্তিত্ব ছিল’। (প্রাগুক্ত: পৃ: ৬০)

বরিশালবাসীর এই আন্দোলন-দৃঢ়তা বিফল হয়নি। 

‘রয়টারের টেলিগ্রামে জানা গেল পার্লিয়ামেন্টে ভারত সচিব জানিয়েছেন যে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়েছে।(প্রাগুক্ত: পৃ: ৬০)

যে বন্দেমাতরম ধ্বনির জন্য বরিশালে তুলকালাম কা- ঘটে গেল; সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অশ্বিনীকুমার দত্ত অপমানিত হলেন সেই ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে বরিশালবাসী। আয়োজন করা হয় বিশাল শোভাযাত্রার। শোভাযাত্রার পুরোভাগে অশ্বিনীকুমার দত্ত। হাজার কণ্ঠে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি; আর গান-

            বল সিংহনাদে জয় জয় রবে বন্দেমাতরম্।  
            উঠুক ভবে শুনুক সবে মন্ত্র গভীরতম।। 
                    বন্দেমাতরম বন্দেমাতরম।।

‘কিছুদিন পরে সুরেন্দ্রনাথকে সেই বরিশালে সম্মান প্রদর্শনের জন্য আহবান করা হয়েছিল। কাব্যবিশারদ মহাশয় ও মৌলবি দেদার বক্সও এসেছিলেন সুরেন্দ্রনাথের সঙ্গে। পঞ্চদশ সহস্র লোক সেদিন রাজাবাহাদুরের হাবেলিতে, রাস্তায় শোভাযাত্রায়, ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্র¿ উচ্চারণ করে, ‘সুরেন্দ্রনাথ কী জয়’ বলে ধ্বনি করে। প্রাদেশিক কনফারেন্সের সময় থেকে যে ক্ষোভ অন্তরে সঞ্চিত হয়েছিল, সেই ক্ষোভ আজ মিটল।’ (প্রাগুক্ত পৃ: ৬০)

এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান নিয়ে বরিশালে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বাগত জানাতে শহরে অনেকগুলো তোরণ তৈরি করা হয়, ব্যবস্থা করা হয় আলোকসজ্জার। সিদ্ধান্ত হয় মশাল শোভাযাত্রা নিয়ে স্টিমার ঘাটে সংবর্ধিত অতিথিকে স্বাগত জানানো হবে। হঠাৎ স্থানীয় প্রশাসন আদেশ জারি করল ‘স্টিমার ঘাটে মশাল নিয়ে শোভাযাত্রা চলবে না’। রসিক অশ্বিনীকুমার দত্ত ঠিক করলেন মশালের পরিবর্তে ‘হেরিকেন’-এর আলোয় নেতাকে বরণ করা হবে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি চলল। নির্ধারিত সময়ে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষ হাতে হারিকেন নিয়ে স্টিমার ঘাটে উপস্থিত হলেন। সংবর্ধনা জানালেন তাদের প্রিয় নেতাদের। এভাবেই সেদিন ইংরেজ শাসকের অত্যাচারের উত্তর দিয়েছিল বরিশালবাসী। এর নেতৃত্বে ছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্ত। 

এরপর বরিশালবাসীর ওপর নেমে আসে আরেক বিপর্যয়; দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। অনাহারে মারা যায় অনেক মানুষ। প্রতিকার করতে অশ্বিনীকুমার দত্ত’র নেতৃত্বে চলে ত্রাণ কার্যক্রম। গঠিত হয় ‘বরিশাল দুর্ভিক্ষ-নিবারণী সমিতি’। এই সমিতির তৎপরতায় রক্ষা পায় হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষ। দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সমবেদনা জানাতে সে সময়ে বরিশালে এসেছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। দুর্ভিক্ষ-প্রতিরোধে বরিশালবাসীর কার্যক্রমের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে ‘মডার্ণ রিভিউ’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তপ্রদেশ, মধ্যভারত এবং পাঞ্জাবে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সেখানেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন বরিশালের মানুষ। স্থানীয়ভাবে অর্থ-সংগ্রহ করে দুর্ভিক্ষ কবলিত এলাকায় পাঠানো হয়। এর নেতৃত্বেও ছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্ত।

সমসাময়িক সময়ে বরিশালে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। যুবকরাই ছিল এই সংগঠনের মূল শক্তি। এর নাম দেয়া হয় ‘কর্মী সংঘ’। পরে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ৬ আগস্ট এই কর্মী সংঘ রূপান্তরিত হয় ‘স্বদেশ-বান্ধব সমিতি’তে। প্রতিষ্ঠা থেকেই এই সমিতির সভাপতি ছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্ত। বিলাতি বর্জন এবং নিজ দেশে উৎপাদিত পণ্য ব্যবহারের পক্ষে প্রচারণাই ছিল এই সমিতির মূল কাজ। ক্রমে এই আন্দোলন বরিশাল জেলার গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠে। সারা জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘স্বদেশ-বান্ধব সমিতি’র দেড় শতের বেশি শাখা। ‘স্বদেশ-বান্ধব সমিতি’র কর্মকা-কে ব্রিটিশ সরকার কি ভাবে দেখেছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় পূর্ববঙ্গ ও আসাম সরকারের চিফ সেক্রেটারি মি. লায়ন-এর প্রতিবেদনে। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মি. লায়ন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে লেখেন:

‘বাখরগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় যত বিপ্লবী সংগঠন তা প্রদেশের অন্য কোনো জেলায় নেই; যা আগেই ভারত সরকারকে অবহিত করা হয়েছে। বান্ধব সমিতি প্রকাশ্যে যে সব বিস্ময়কর ঘটনা ঘটাচ্ছে তা নিঃসন্দেহে বিপ্লবী কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের হোতা হিসেবে কাজ করছে। সারা প্রদেশে এর দেড় শতের বেশি শাখা আছে। এরা সাধারণত রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডের প্রচার করছে।’ 

এই প্রতিবেদনে এইসব কর্মকাণ্ডের জন্য অশ্বিনীকুমার দত্তকেই দায়ী করা হয়। মি. লায়নের ভাষায়: 

‌‌‌‌‌‌'There can be a little doubt that the Bandhab Samiti under the guidance of Babu Aswani Kumar Dutta is doing grievous harm is spreading racial harted among the lower classes and false information as to the Government’s procedings and instructions'. (প্রাগুক্ত পৃ: ৬৭)

এই রিপোর্টে ব্রিটিশ সরকারের টনক নড়ে। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর ব্রিটিশ পুলিশ অশ্বিনীকুমার দত্তকে গ্রেপ্তার করে নির্বাসনে পাঠায়। তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হন অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। একই সময় গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকার পুলিন দাস, বারদির ভূপেশচন্দ্র নাগ, কলকাতার কৃষ্ণকুমার মিত্র, শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, সুবোধচন্দ্র মল্লিক, শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু প্রমুখকে। সেই সঙ্গে বেআইনি ঘোষণা করা হয় ‘স্বাদেশ-বান্ধব সমিতি’। একই সময় নিষিদ্ধ করা হয় বাংলার আরও কয়েকটি সংগঠন। এর মধ্যে ঢাকার ‘অনুশীলন’, ফরিদপুরের ‘সুহৃদ’ এবং ময়মনসিংহের ‘ব্রতী’ উল্লেখযোগ্য। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্ণৌ নির্বাসন থেকে অশ্বিনীকুমার দত্ত মুক্তি পান। মুক্তি পেয়েই চলে আসেন বরিশালে। বরিশালে তাকে ব্যাপক সংবর্ধনা দেয়া হয়। স্বদেশ-বান্ধব সমিতি নিষিদ্ধ হবার পর রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বরিশাল জিলা সমিতি’। বরিশালে ফিরে এসে এই সমিতির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন অশ্বিনীকুমার দত্ত। এরপর থেকে তিনি ক্রমশ শারীরিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন; অসুস্থ হন। তা সত্ত্বেও সরাসরি রাজনীতি থেকে কখনই নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেননি। কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দিতে ছুটে বেড়িয়েছেন ঢাকা, লক্ষ্ণৌসহ ভারতবর্ষেরনা বিভিন্ন স্থানে। ১৯২১ সালের মার্চ মাসে বরিশালে আবার অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন। অসুস্থ অশ্বিনীকুমার দত্তই নির্বাচিত হন সম্মেলনের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে কংগ্রেসের নতুন গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বরিশালে প্রথম জেলা কংগ্রেস কমিটি গঠিত হয়; যার সভাপতি হন অশ্বিনীকুমার দত্ত। 

আগেই বলা হয়েছে মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত প্রতিষ্ঠিত ব্রজমোহন বিদ্যালয় কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না, ছিল সাচ্চা দেশপ্রেমিক, ত্যাগী আদর্শ মানুষ গড়ার কারখানা। এই বিদ্যালয়ের মূলমন্ত্র ‘সত্য প্রেম পবিত্রতা’। 

‘মহাত্মা অশ্বিনীকুমার প্রকৃত শিক্ষা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে দেশে খাঁটি মানুষ তৈরী করিবার জন্য প্রাণপণ সাধনা করিয়াছিলেন। শুধু উপদেশে বা বক্তৃতায় নয়, কার্য্য দ্বারা ছাত্রদের নৈতিক চরিত্র গঠন করিয়া এক অভিনব কৌশল রচনা করিতে বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষার্থীগণ লইয়া তিনি ‘দরিদ্র বান্ধব সমিতি’ (Little brothers of the poor),  ‘আশ্বাসী সম্প্রদায়’ (Band of hope),  ‘কৃপালু সম্প্রদায়’ (Band of marcy),  ‘বান্ধব সমিতি’ (Friendly Union), প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান তৈরী করিয়াছিলেন। এতদ্ভিন্ন ছাত্র শিক্ষক পরিচালিত ‘ছাত্র-বন্ধু’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা তখন মুদ্রিত হইত। এই সকল দ্বারা সমবায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবনের যাবতীয় বিষয় সমূহ আধ্যাত্মিক সূত্রাবলম্বনে প্রতি সপ্তাহে এক নির্দিষ্ট দিনে আলোচিত হইত। সেই সকল প্রতিষ্ঠান বা আলোচনার মূলমন্ত্র ছিল সত্য, প্রেম, পবিত্রতা। ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের মধ্য দিয়া অশ্বিনীকুমারের সর্ববিষয়ী দৃষ্টি কর্মানুষ্ঠানের ভিতর দিয়া সমগ্র দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। মোট কথা, ছাত্রদের আক্ষরিক জ্ঞানার্জন প্রসঙ্গে চারিত্রিক সর্ববিধ উন্নতির পরিপূর্ণ বিকাশক্ষেত্র ছিল এই বিদ্যালয়টি। (প্রবন্ধ: ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের ইতিকথা: জয়ন্তকুমার দাশগুপ্ত; ব্রজমোহন বিদ্যালয় শতবার্ষিকী স্মারক পুস্তিকা, বরিশাল: ১৯৮৪)

এমন বিদ্যালয়ের ছাত্র যজ্ঞেশ্বর দে তথা মুকুন্দদাস। এই বিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবেই মুকুন্দদাসের প্রতিভার স্ফুরণ। ১৮৮২ খিৃস্টাব্দ থেকে ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে প্রতিবছর পূজা উপলক্ষে ব্যাপক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। প্রতি বৎসর কবিতা ও সঙ্গীত রচিত হয়ে ‘শারদীয়োপহার’ শীর্ষক সুদৃশ্য কাগজে ছাপানো গতো এবং তা ছাত্র ও নিমন্ত্রিতদের মধ্যে বিলি করা হতো। এইসব গানের অধিকাংশই ছিল কবি মনোমোহন চক্রবর্তীর রচনা। ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের শারদোৎসব উপলক্ষে বিশাল শোভাযাত্রা শহর প্রদক্ষিণ করতো। শোভাযাত্রার সামনে থাকত পতাকাবাহী গানের দল। গলায় হারমোনিয়াম বেঁধে গান গাওয়া হতো। এর নেতৃত্বে থাকত পতাকা হাতে দলপ্রধান। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের শারদোৎসব শোভাযাত্রায় পরিবেশিত গানটি ছিল: 

        কাঁপায়ে মেদিনী     কর জয়ধ্বনি,
            জাগিয়া উঠুক মৃত প্রাণ
        জীবন-রণে           জীবন দানে
            সবারে করহে আগুয়ান।
        হাতে হাতে ধরি ধরি   দাঁড়াইব সারি সারি
            প্রাণে বাঁধিবে তবে প্রাণ,
        আলস্য জড়তা,      নিরাশা বারতা
            দূর করিবে প্রয়াণ। 
        তরুণ তপনে,      মধুর কিরণে
            সদা কি হাসিবে প্রাণ?
        সুখের কোলে,     ভাবেতে গ’লে
            কে রবে কে রবে শয়ান?
        সাধিতে বীরের কাজ   পরহে বীরের সাজ
            করে ধর সাহস-কৃপাণ,
        জীবন ব্রত           সাধ অবিরত,
            এ নহে বিরামের স্থান।     

অশ্বিনীকুমার দত্তর জীবনীকার সুরেশচন্দ্র গুপ্ত গানটির উল্লেখ করে এর পাদটীকায় লিখেছেন, 
‘অধুনা প্রসিদ্ধ স্বদেশী যাত্রা গায়ক শ্রীযুক্ত মুকুন্দনাথ দাস মহাশয় এই বৎসর ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তিনি পতাকা হস্তে এই সঙ্গীতটি গাহিয়াছিলেন।’(পৃ: ১৭৪) 

যজ্ঞেশ্বর দে বা মুকুন্দদাসের সিংগীতশিল্পী হিসেবে জনসমক্ষে এই প্রথম আবির্ভাব। ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের আদর্শ সত্য-প্রেম-পবিত্রতা, প্রচলিত শিক্ষার বাইরে নানা মানবতাবাদী কার্যক্রম, জনসমক্ষে পরিবেশিত বা উপস্থাপিত প্রথম গান মুকুন্দদাসের জীবনে গভীর রেখাপাত করেছিল। পরবর্তীকালে তাঁর রচিত একাধিক যাত্রাপালা এবং বহু গানে তার প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর সৃষ্ট কোনো চরিত্রের মধ্যে অশ্বিনীকুমার দত্ত-র প্রতীভূ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।