শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বার ২০২০, ৪ আশ্বিন ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

Aug. 4, 2020, 11:11 p.m.

তোমার জন্ম শতবর্ষেও আমরা শোকে মুহ্যমান
তোমার জন্ম শতবর্ষেও আমরা শোকে মুহ্যমান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। - ছবি: সংগৃহীত।

১ আগস্ট দৈনিক ভোরের আলো জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে শোকের মাস শুরু করতে চেয়েছিল। কিন্তু গত ১ আগস্ট পবিত্র ঈদ-উল-আযহা থাকায় আজ আমরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। পুরো মাস জুড়ে আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সংগ্রম, রাজনীতি ও জীবনকর্ম প্রকাশের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চাই। থাকবে বিশেষ প্রতিবেদন। আমরা চাই, লেখা দিয়ে আমাদের পাঠক-সুভানুধ্যায়ীরা আমাদের এই উদ্যোগের সঙ্গে থাকবেন। শোকের মাস আাগস্ট যেমন আমাদের ব্যথিত করছে। তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ আমাদের উজ্জীবীতও করেছে। শোকের মাস আগস্ট এবং মুজিব বর্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমাদের আয়োজন ‘তোমার জন্ম শতবর্ষেও আমরা শোকে মুহ্যমান’।
-সম্পাদক, ভোরের আলো


‘আজি শুভক্ষণে পিতার ভবনে অমৃত সদনে চলো যাই’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বপিতার উদ্দেশ্যে এই গানের কথা লিখেছিলেন। আমরা আজ আমাদের জাতির পিতা, স্বাধীন বাংলাদেশ মহান স্থপতির কথা বলছি। যাঁকে বাঙালি জাতির কাণ্ডারী বলা হয়। যিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। যাঁর দিকনির্দেশনায় বাঙালি মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পরাধীন জাতিকে মুক্তর স্বাদ দিয়েছিলেন যিনি। তিনি বাঙালির রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ থেকে ১০০ বছর আগে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তখনকার অবিভক্ত ভারতের গোপালগঞ্জ জেলার অজপাড়া গাঁ টুঙ্গিপাড়ায় জন্মেছিলেন তিনি। ২০২০ সাল তাঁর জন্ম শতবর্ষ। গোটা জাতি জন্মশতবর্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করে চলেছে।

জন্মদিন মানেই আনন্দ উৎসব। আনন্দ আয়োজন। বর্ণিল আয়োজনে জন্মদিনকে স্মরণীয় করতে চায় সবাই। কেক কাটা, হইহুল্লোর করা, আতশবাজী আরো কত কিছু। আর যদি সেই জন্মদিন হয় জাতির পিতার, তার রোশনাই তো একটু ভিন্নমাত্রার হওয়াই স্বাভাবিক। একদিকে জাতির পিতার জন্মদিন, তার ওপর  ১০০ বছর পূর্তির জন্মদিন। সবকিছু মিলিয়ে এক মাহেন্দ্রক্ষণ বা মায়েন্দ্রযোগ বলা যায়। এটা এক চরম শুভক্ষণ। কিন্তু জাতির পিতার শতবর্ষের আনন্দ আমাদের ম্লান করে দিয়েছে তাঁর অযাচিত মৃত্যু। তাই আমরা শোকে মুহ্যমান। কারণ, আগস্ট মাস আমাদের শোকে বিহ্বল করে তোলে। আজ সাড়ম্বরে জাতির পিতার জন্ম শতবর্ষ উদযাপন করার কথা। কিন্তু আমরা তা করতে পারছি না। ক্ষণজন্মা বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ ১৫ আগস্ট কালি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। সেই কালির দাগ গোটা জাতিকে কালো ছায়ায় আচ্ছাদিত করেছে। তাই তো আমরা গাইতে পারছি না ‘এই শতবর্ষের জন্মদিনে শতহরষের গানে, এই গঙ্গাধারার জলাঞ্জলি গঙ্গা জলের টানে। জে¦লে দিক, জেলে দিক অনন্তকালে আলো’।

আমরা বলি শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। গত ৪৫ বছর ধরে শোককে শক্তির সূচক হিসেবে ধারণ করেই চলেছে বাংলাদেশ। আস্তে আস্তে শক্তি অর্জন করে আমরা উন্নয়নশীল দেশের সারিতে অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছি। যদিও আমাদের আরো আগে এই অবস্থানে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু ওই যে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের বেশ কিছু বছর আগে অর্থাৎ ৪৫ বছর আগে পাকিস্তানী ভুত আমাদের ঘারে চেপে বসেছিল। স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে চার বছরের মাথায় ৭১-এর পরাজিত শক্তির দোসরা জাতির কান্ডারী হাজার বছরের মহানয়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে। এরপরই থমকে যায় বাংলাদেশ। উন্নয়নের চাকা থামিয়ে দিয়ে ১৬ বছর ভিন্ন ধারায় দেশ চলে। এরপর আবার উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু করলেও গতি ছিল মন্থর। আস্তে আস্তে উন্নয়নের মাইলফলক ছুঁতে দৌড় শুরু করে বাংলাদেশ। কিন্তু ১৬ বছর পেছনে হাঁটার কারণে উন্নয়নশীল দেশের সারিতে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। তা না হলে আমরা এখন বিশ্বের দরবারে উন্নত দেশের কাতারের শ্রেষ্ঠ স্থানে পৌঁছে যেতাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষে আমাদের সেই স্বপ্নপূরণের অভিযাত্রা। বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষ আমাদের অন্য এক আলোকবর্ষে নিয়ে যাবে এটা নিশ্চিত। কিন্তু তাঁর জন্ম শতবর্ষে আজো আমরা আনন্দের পরিবর্তে শোকে বিহ্বল হয়ে যাই।

বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন বলেই দৃঢ়চেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাংলাদেশ একই সূত্রে প্রোথিত। বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ। গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার ছোট্ট শিশু। আমাদের খোকা। খোকা থেকে মুজিব, মুজিব থেকে মুজিব ভাই, মুজিব ভাই থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার ইতিহাস আমাদের অনন্য গৌরব। বাঙালি জাতির মহানয়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমদের মুক্তি সংগ্রামের পথই দেখাননি। একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ দিয়েছেন। কোনদিন তিনি অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। কোন রক্ত চক্ষু তাকে দাবায়ে রাখতে পারেনি। এর কারণ মানুষের অকুণ্ঠ সহযোগিতা। 

৫৬ হাজার বর্গমাইলের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ও পরে ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এর ভেতর দিয়ে তিনি আবির্ভূত হলেন বাঙালি জাতির মহানায়ক।

তিনি আমাদের জাতির পিতা। যাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের ৭ কোটি মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যাঁর বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি বাঙালি। বাঙালি জাতির সেই স্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহামন আমাদের আত্মার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু মানে মুক্তি সংগ্রাম। যে মানুষটির জন্ম না হলে আমরা সোনার বাংলা পেতাম না। যে মনুষটির জন্ম না হলে সোনার বাংলার স্বপ্ন স্বাদ পূরণ হতো না। সেই মানুষটাকে ঘাতকরা কিভাবে খুন করলো। ভাবতেই শিউরে ওঠে। তাই মুজিব বর্ষেও আমাদের আনন্দের অশ্রু শোকের মাতমে পরিণত হয়েছে। আগস্ট মাস আমদের শোকে ডুবিয়ে দিয়েছে।

গভীর দেশপ্রেম, সীমাহীন আত্মত্যাগ ও অতুলনীয় নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। তার বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলার শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে নেতৃত্বের জন্য সেদিন তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনে তার সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, জেল-জুলুম, নির্যাতন-কারাবরণের দীর্ঘ ইতিহাস তাকে জাতির পিতার অভিধায় অভিষিক্ত করেছে।

আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।