মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বার ২০২০, ৮ আশ্বিন ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

Aug. 8, 2020, 11:32 p.m.

দেশে কি করোনা আছে?
দেশে কি করোনা আছে?
বরিশাল লঞ্চ ঘাট। - ছবি: এন আমিন রাসেল, ভোরের আলো।

গত শুক্রবারও দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৭ নাগরিক। এ পর্যন্ত দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৩ হাজার ৩৩৩জন মানুষ। কেবল ২৪ ঘন্টায় নতুন করে ২ হাজার ৮৫১জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত ২ লাখ ৫২ হাজার ৫০২ জনের শরীরে করোনা সনাক্ত হয়েছে। করোনয় প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল বাড়লেও স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় থাকছে না। ঈদ এবং কোরবানীর সময় যথেচ্চার মানুষের চলাচল শঙ্কার কথা মনে করিয়ে দিলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত হচ্ছে। অধিকাংশ মানুষের মুখে মাস্ক নেই। গণপরিবহন বিশেষ করে বাস ও লঞ্চে নামমাত্র জীবানুনাশকের ব্যবস্থা থাকলেও তা ব্যবহার করছে না সাধারণ যাত্রীরা। এই অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে দেশে কি করোনা আছে?

গত ২৫ জুলাই থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ঢাকা-বরিশাল নদীপথে লঞ্চের যাত্রী ভীড় অনেকটা স্বাভাবিক সময়কেও হার মানিয়েছে। ঢাকা থেকে বাড়িতে ঈদ করতে আসা মানুষদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে যেমন অনিহা ছিল। তেমিন ফেরার পথের অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক। মাস্কহীন চলাচল, ঠাঁসাঠাঁসি করে অনেকটা গা ঘেঁসে বসে শুয়ে লঞ্চে যাত্রী হচ্ছেন প্রায় সবাই। বরিশাল ও ঢাকা নৌবন্দরের চিত্র এবং যাত্রীঠাঁসা লঞ্চগুলো দেখলে বোঝার কোন উপায় নাই যে, দেশে করোনা নামের কোন মহামারী চলছে। দুই ঈদে একই চিত্র দেখা গেছে মাওয়া ও আরিচা ফেরিঘাটে। বরিশালের নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল, ঢাকার গাবতলি, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এবং কমলাপুর রেলওয়েস্টেশনে মানুষের মিছিল কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সরকার করোনা মোকাবেলা করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু সেই চেষ্টার সঙ্গে নাগরিকদের সহযোগিতা অনেকটা শূণ্যের কোঠায়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে কিছুটা স্বাস্থ্যবিধি ও শারীরিক দূরত্ব বজায় থাকলেও শহরতলী উপজেলা সদরের বাইরের সব ইউনিয়ন ও গ্রামের চিত্র ভিন্ন। গ্রামে ভীড় জমিয়ে চলছে ফুটবল টুর্নামেন্ট। মাস্ক এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা নেই বললেই চলে। এমন অবস্থায় আমাদের কি হবে সেটা নিয়ে শঙ্কা জাগছে।

আমরা জানি, কেবল ভীড় এড়াতে এবং করোনা প্রকোপ ঠেকাতে সরকার স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ সবধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে, স্কুল কলেজেসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রক্ষায় সরকার এমন ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু যে শিক্ষার্থীদের বাড়িতে থাকার কথা তারাই কিন্তু বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনসহ লঞ্চ, স্টীমার, ফেরিঘাট, রেলস্টেশন ও বাসস্টেশনে ভীড় জমাচ্ছেন। যত ভীড় আমরা লঞ্চ, বাস, ফেরিঘাট এবং গ্রামগঞ্জে দেখছি, তার চেয়ে কি স্কুল কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভীড় বেশি হবে? বাস্তব চিত্র বলছে না। কারণ গতকাল বরিশাল নদী বন্দর থেকে বিলাসবহুল ১৫টি লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। এর প্রায় সবকটি লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঘাট ছেড়েছে। কোন লঞ্চেই সাধারণ মানুষের ভীড়ে পা ফেলার জো ছিল না।
আমরা মনে করি যদি এটাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়, তাহলে আর স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ^বিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার দরকার কি। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা না হওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থী হতাশার মধ্যে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গত প্রায় ৬ মাস ধরে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বাইরে রয়েছে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে না পেরে অনেকেই বিমর্ষ হয়ে পড়েছে। 

আমরা বলতে চাই, করোনা মহামারী থেকে দেশ এবং দেশের মানুষদের রক্ষা করার কোন বিকল্প নেই। করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষার জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য বলবৎ থাকলেই হবে না। জনসমাগম হয় এমন সবক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। বলা হচ্ছে স্বল্প পরিসরে গণপরিবহন চালু হয়েছে। আমাদের দেশের বাস্তব চিত্র কি সে কথা বলে? গতকালও এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে, দুইজনের ভাড়া নিয়ে পাশের সিটে অন্য যাত্রী বসানো হয়েছে। সেটা নিয়ে প্রতিবাদ করায় যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হুমকী দিয়েছে বাস কর্তৃপক্ষ।

যদি স্বাভাবিকভাবে সব চলতে থাকে তাহলে কেন ভাড়া বাড়ানো হলো। ভাড়া বৃদ্ধির দায় টানতে হবে যাত্রীদের, আবার যেতেও হবে স্বাভাবিক সময়ের মতো গাদাগাদি করে। তাহলে করোনা দূর হবে?

আমরা চাই, সরকারের নেওয়া উদ্যোগে বাস্তবায়ন হোক। সেটা কেবল রাজধানী ঢাকা ও জেলা-উপজেলা সদরে নয়, গোটা দেশে। গোটাদেশে শরীরিক দূরত্ব বজায় না থাকলে, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে কেবল স্কুল কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে করোনা ঠেকানো সম্ভব হবে না। তাই করোনা মোকাবেলায় হয় কঠোর অবস্থান নিতে হবে, তা না হলে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতে দিতে হবে। করোনার সঙ্গে থেকে থেকেই জীবন চলায় অভ্যস্ত করতে হবে।

আমরা না কি আধুনিক ও বিজ্ঞানমনষ্ক হয়েছি, এমন অহংকারের কথা এখন প্রায়সই শোনা যায়। কিন্তু এখনো কান পাতলে যা শুনতে পাই তা ভয়ানক। ‘করোনা হইছে মাওয়ার ওপার’। ‘মুখ দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি’। অথবা ‘এগুলা হইছে বালা মছিবত, এগুলার সবার জন্য হয় না’। রোগবালাই সব আল্লাহর দেওয়া তিনি চাইলে মারবেন, চাইলে রাখবেন, এজন্য এতোকিছু মানার দরকার নেই’। আমাদের এই অবস্থা থেকে উত্তোরণ কি আদৌ ঘটবে কিংবা ঘটানো সম্ভব হবে? তারপরও সরকারের সকল ইতিবাচক উদ্যোগের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। চাই, করোনামুক্ত সুন্দর বাংলাদেশ।