শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বার ২০২০, ৩ আশ্বিন ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

Aug. 12, 2020, 12:11 a.m.

পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ, নাগরিক নিরাপত্তায় আস্থা ফেরাতে হবে
পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ, নাগরিক নিরাপত্তায় আস্থা ফেরাতে হবে
খবর প্রতীকী। - ছবি: ভোরের আলো |

গত ৩১ জুলাই কক্সবাজারে অবসরপ্রাপ্ত মেজার সিনহা রাসেদুল ইসলাম খান পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে পুলিশের দুই কর্মকর্তা নির্মমভাবে গুলি করে তাঁকে হত্যা করেছে। যদিও পুলিশ এটাকে তথাকথিত ক্রসফায়ার বলে দাবি করেছে। কিন্তু মেজর সিনহা নিহত হওয়ার পর টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাস তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে যেভাবে ফোনালাপ করেছেন, তাতে এটা নিশ্চিত যে পুলিশ পরিকল্পিতভাবে সিনহাকে হত্যা করেছে। টেকনাফ থানার ওসির বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ, আগেভাগে এলাকার সাধারণ মানুষদের জড়ো করে মিথ্যা ডাকাত বলে হট্টোগোল সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া হত্যা জায়েজ করতে নীরিহ মানুষদের জোর করে থানায় নিয়ে গিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছ। পরবর্তী সময় পরিকল্পিতভাবে মেজর সিনহা গাড়ি থেকে হাত উঁচু করে নামার সঙ্গে সঙ্গে চার রাউন্ড গুলি করা হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ওসি নিজে এসে আরও ২ রাউ- গুলি করে মৃত্যু নিশ্চত করেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যার এমন অভিযোগ কোনভাবেই স্বস্তিকর নয়। যে অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে উাঠেছে তাতে গোটা পুলিশ প্রশাসন আস্থা সংকটে পড়বে। অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কাও বাড়বে।

করোনাকালে গোটা দেশের মানুষ যখন স্বজনদের ফেলে পালিয়েছে, সেসময় পুলিশ এসে সহযোগী হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। করোনা মোকাবেলায় পুলিশের ভূমিকাই পুলিশকে অনন্য উচ্চাতায় নিয়ে গেছে। মানবিক পুলিশ বলতে যা বোঝায় তার প্রমাণ রেখেছে পুলিশ। এই অর্জনের পর যখন সাধারণ মানুষ জানতে পারে পুলিশের গুলিতে অহরহ মানুষ মরছে। কক্সবাজার-টেকনাফের ম্যারিন ড্রাইভওয়েতে ২২ মাসে পুলিশের গুলিতে ৭৮ কিংবা ৮০ জন মারা গেছেন। সবগুলোই পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ক্রসফায়ার বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে ওসব মৃত্যুর ঘটনায় আর কোন অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা যায়নি। কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ একই কাহিনী নির্মাণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পুলিশ-আইনপরামর্শকের কথোপকথন ফাঁস হলে ঘটনার সঠিক চিত্র বের হয়ে আসে। একজন ওসির লোভ মানুষ মারার যন্ত্রে পরিণত করে দিয়েছে। করোনার এতো অর্জন ম্লান করে দিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত মেজার সিনহা রাসেদুল ইসলাম পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর।

আমরা জানি পুলিশের কিছু কর্মকর্তা ও সদস্যর জন্য পুরো পুলিশ বাহিনীকে দায়ি করা সঠিক নয়। কিন্তু যে ঘটনা ঘটিয়েছে ওসি প্রদীপ তাতে পুরো পুলিশ বাহিনীকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনেকদিন ধরে কক্সবাজার-টেকনাফের মেরিন ড্রাইভওয়েতে ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা করে আসছিল ওসি প্রদীপ ও তাঁর অনুসারীরা। একজন লোভী ওসি প্রদীপ কুমার দাস এবং পরিদর্শক লিয়াকত অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাসেদকে নির্মমভাবে হত্যা করে পুলিশের গায়ে কালিমা লেপন করেছে। সারা দেশের মেট্রোপলিট এলাকা এবং থানাগুলোতেও ওসি প্রদীপের অনুসারীরা আছে। তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। মানুষের মনে আস্থা ফেরাতে হলে অবশ্যই পুলিশের মধ্যে থাকা দুষ্ট ক্ষত দূর করতে উদ্যোগ নিতে হবে। আর এই কালির দাগ তুলতে পুলিশকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়াসহ উপকূলীয় এলাকায় যে মাদকের রমরমা ব্যবসা চলে তার প্রায় সবগুলোর সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ কোনভাইে পুলিশ এড়িয়ে যেতে পারে না। কি এমন আলাদিনের প্রদীপ পেয়েছে ওসি প্রদীপ? অল্প সময়ে একাধিক বাড়ি, গাড়ি, অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেলেন? দেশের বাইরে বাড়ি করেছেন? বৈধ পথে একজন ওসির এত অর্থ-বিত্ত হওয়ার সুযোগ আছে? মোটাদাগে সবাই বলবেন নাই। ওসির মাদক সা¤্রাজ্য এবং অবৈধ অর্থবিত্তর ভীত নাড়িয়ে দিতে পারেন এমন আশঙ্কায় পরিকল্পিতভাবে ৩৬ বছর বয়সের একজন চৌকস অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদকে হত্যা করা হলো?

পুলিশ যদি কথায় কথায় মানুষ মারার এমন লাইসেন্স পেয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। তাই ক্রসফায়ারের নামে পুলিশ যে হত্যা করছে তার সবগুলো খতিয়ে দেখে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে যেসব পুলিশের কর্মকর্তা এবং সদস্যরা মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। মানবিক পুলিশের মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে হলে পুলিশকে অবশ্যই ঢেলে সাজাতে হবে। মেজর সিনহা রাসেদ হত্যার মাধ্যমে যে আস্থার সংকটে পড়েছে সেখান থেকে উত্তোরণ ঘটাতে হলে দৃঢ়তার সঙ্গে হত্যার সত্যিটা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে মেজর রাসেদের ব্যবহার্য ল্যাপটপ, মেমোরীকার্ডসহ যেগুলো জব্দতালিকায় নেই সেগুলো উদ্ধার করতে হবে। কেন সেগুলো জব্দ তালিকায় আসলোনা তা খতিয়ে দেখে মানুষের মনে আস্থা ফেরাতে উদ্যোগ নিতে হবে।

দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংবিধান অনুযায়ী যেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করে। কোন বাহিনীর কোন কর্মকর্তা কিংবা সদস্যদের কারণে যেন প্রশ্ন ওঠার সুযোগ সৃষ্টি না হয়। আগেভাগেই সেব্যাপারে গোয়েন্দা নজরদারী করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ওই প্রবণতা কমে আসবে।

মানুষের মনে এমন প্রশ্ন উঠছে একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর খুন হওয়ার পর প্রশাসন নড়েচরে বসেছে। এর আগে ৭৮ বা তারো বেশি মানুষ ক্রসফায়ারের নামে হত্যা হলো সেগুলো তদন্ত হয়নি। অনেকগুলো ঘটনা মানুষ জানেই না। ক্রসফায়ারসহ যে কোন ধরণে হত্যার বিচার হওয়া দরকার। বিচার বহির্ভূত হত্যার কারণে মানুষের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারাচ্ছে। তাই অসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাসেদুল ইসলাম খান হত্যাসহ মেরিন ড্রাইভওয়েতে ঘটে যাওয়া সকল ক্রসফায়ারের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। যার মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে আস্থা সংকট থেকে ফেরাতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মনে পুলিশ সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারাণা জন্ম দিয়েছে সেখান থেকে আস্থায় ফেরাতে হবে। সাধারণ মানুষের নিরপত্তাহীনতা আশঙ্কা দূর করতে হবে।