বুধবার, ২১ অক্টোবার ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭

সৌরভ মাহমুদ

Sept. 18, 2020, 10:44 p.m.

ধলাগলা ছাতাঘুরোনি পক্ষি
ধলাগলা ছাতাঘুরোনি পক্ষি
ধলাগলা ছাতাঘুরোনি পাখির ছবিটি বরিশালের রুইয়া থেকে ২০১৪ সালে তুলেছেন লেখক। - ছবি: সৌরভ মাহমুদ।

ছেলেবেলায় একদিন নানা বাড়ির পশ্চিম পুহুইর (পুকুর) পাড় ধরে ঘরের দিকে হেঁটে আসছি। সামনে দিয়ে একটি পাখি উড়ে গেল সুন্দর মিষ্টি সুরে ডাক দিয়ে। ঠিক তার পিছনেই সোজা বরাবর আরও একটি পাখি। উড়ে গিয়ে বসল পুকুরের পশ্চিম-দক্ষিণ কোন লাগোয়া হাররা গাছে (শেওড়া)। শেওড়া গাছ ঝোপালো, পানির কাছেও জন্মে।

একটি পাখির ঠোঁটে খড়। একটু পরই দেখলাম সে গিয়ে বসেছে ছোট গোলাকার একটি বাসায়। এ পাখি আমি সেদিনই প্রথম দেখলাম। সারা দেহ কালো, চোখের উপরে এবং গলায় সাদা রঙের পালক আছে। ভারি চঞ্চল। প্রতি  তিন সেকেন্ড পরপর লেজ নাড়ায় এবং পাখা বা ছাতার মতো মেলে ধরে, সেই সঙ্গে ডাকাডাকি। মিষ্টি গলার সেই গান আজও ভুলিনি। বাসাটি দেখার পর শুরু হলো আমার পর্যবেক্ষণ। গ্রীষ্মের দিনে গাছের ছায়ায় বসে লুকিয়ে লুকিয়ে ওদরে বাসা বানানোর পদ্ধতি দেখলাম। একটি পাখি সবসময় বাসা তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করে বাসা বানায়। অন্যটি তার পিছনে সবসময় উড়তে থাকে, ডালে বসে গান গায় এবং লেজ দোলায়। বাসার উপকরণ মাকড়শার জাল, নারকেল, তাল ও খেজুরের আঁশ। তবে আমি বহুবার দেখেছি গরুর লেজ থেকে লোম নিয়ে আসতে। 

বাসা বানাতে প্রায় সপ্তাহখানেক লাগে। একবারে খড় সংগ্রহ করে বাসা বানায়, দিনের মধ্যে মাঝে মাঝে বিরতি দেয় বাসা বানানোর কাজ করে। সকাল থেকে বোন (খড়) সংগ্রহ শুরু হয়। বাসা বানানো সম্পন্ন হলে মেয়ে পাখি বাসায় ডিম দেয়, মোট তিনটি ডিম পাড়তে দেখেছি। কখনো একদিন পরপর, কখনো দুদিন পরপর ডিম পাড়ে। বাসাটি ভূমি থেকে কম উঁচুতে থাকার কারণে আমার গাছে উঠতে হয়নি। প্রতি বছরই এই গাছে এক জোড়া ধলাগলা ছাতাঘুরোনি বাসা করতো। দুটি পাখিই পালা করে ডিমে তা দিতো। ছানাদের খাবার খাওয়াতো। সাধারণত এরা বাঁশঝার, ছোট-বড় গাছের ঝোপ, কম আলো পড়ে এমন বসতিতে বেশি বিচরণ করতো। গাছের দুটি বা তিনটি  চিকন ডালের  সংযোগে ও বাঁশের কঞ্চির সংযোগে বাসা বানাতো।

গাঁয়ের ছেলেদের এ পাখির নাম জিজ্ঞস করেছি, তবে কেউ একজন বলেছে দোয়েল, কিন্তু এটি দোয়েল পাখি থেকে ভিন্ন তখনই মনে হয়েছিল।  এ পাখি শিষ দিয়েও গান গায়। যে একবার শুনেছে তার হয়তো কখনো ভোলার নয়। নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে গ্রামে দেখা সুন্দর এ ধলাগলা ছাতাঘুরোনি পাখির স্মৃতি প্রায়ই মনে পড়ে।


লেখক: সৌরভ মাহমুদ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পাখি বিশেষজ্ঞ।