শনিবার, ২৮ নভেম্বার ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

Oct. 4, 2020, 11:58 p.m.

কেবল ৫ অক্টোর নয়, শিক্ষকদের পায়ে শ্রদ্ধা প্রতিদিনের হোক
কেবল ৫ অক্টোর নয়, শিক্ষকদের পায়ে শ্রদ্ধা প্রতিদিনের হোক
খবর প্রতীকী। - ছবি: ভোরের আলো।

শিক্ষক। তিন অক্ষরের একটি শব্দ। এই শব্দের সঙ্গে মিশে আছে একধরণের আভিজাত্য। এই শব্দ শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। শিক্ষক মানে জ্ঞান দানের আধার। শিক্ষক মানে অভিভাবক। শিক্ষক মানে অন্ধজনে দেহ আলো। শিক্ষকরা অন্ধকে চোখ দান করেন। সত্যিকার মানুষ হয়ে ওঠার পেছনের কারিগর শিক্ষক। সেই শিক্ষকদের জন্য একটি দিন ধার্য করা হয়েছে। আজ ৫ অক্টোবর সেই দিন। এই দিনটা একটা উপলক্ষ্যমাত্র। তারপরও ৫ অক্টোবর এলে শিক্ষকদের কথা একটু হলেও বিশ^জুড়ে আলোচিত হয়। কেবল ৫ অক্টোর নয়, আমরা বিশে^র সকল শিক্ষকদের প্রতি দিন দিন প্রতিদিন শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চাই। তারপরও বিশ^ শিক্ষক দিবসেও শিক্ষদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

শিক্ষকদের প্রতি শদ্ধা জানাতে গিয়ে একটি ঘটনা মনে পড়ে যায়। কয়েক বছর আগে একটি খবরের সত্যতা নিশ্চিত করতে পুলিশের এক কর্তা ব্যক্তিকে ফোন দেই। ওই কর্তা ব্যক্তি তথ্য জানার জন্য মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে অনুরোধ করেন। ওই কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে তথ্য চাইলে তিনি ক্ষেপে যান। বলেন, ‘আপনারা জেলা প্রশাসককে স্যার বলে সম্বোধন করেন। আমদের কেন বলেন না? স্যার না বললে তথ্য দেবো না।’ এই বলে তিনি ফোনটি রেখে দেন। অগত্যা কি করা, তথ্য তো লাগবেই। তাই আবার ফোন দিয়ে স্যার বলে তথ্য নিয়েছি। তারপর তাকে বলেছিলাম, ‘আপনি কি কোন স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক? আপনাকে স্যার বলতে হবে কেন? আপনাকে স্যার বলবে আপনার অধিনস্ত কনস্টেবল, এসআই কিংবা অন্য কেউ। আমরা তো এর কোনটির মধ্যে পরি না।’

তারপর লিখেছিলাম, আমরা শিক্ষক শুনলেই তাকে স্যার বলে সম্বোধন করি। কিন্তু কোন শিক্ষক তাকে স্যার বলতে হবে এমন নির্দেশ দেন না। শিক্ষক আমাদের বলে দেন না যে তিনি শিক্ষক। তারপরও আমরা মাথা নত করে তাঁকে স্যার বলি। তা যদি শুনি শিক্ষক কোন পাঠশালা কিংবা হাতেখড়ির স্কুলের। তাহলেও তাকেও স্যার বলতে কুণ্ঠাবোধ করি না। হাতেখড়ি থেকে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত যারাই পাঠদান করেন তাদের সবাইকে আমরা এমনভাবেই সম্মান জানাই। তারা সম্মান কিংবা মর্যাদা চেয়ে নেন না। যারা শিক্ষকের মতো স্যার শুনতে চান, তারাও শিক্ষকের আদর্শ অনুসরণ করুন, দেখবেন আপনাকেও স্যার বলবে। সেজন্য আপনাকে নির্দেশ দিতে হবে না। আমরা এমন শিক্ষকই দেখতে চাই, সব পেশায়।

আজ সারা বিশে^ শিক্ষকের অবস্থান সবার ওপরে। কিন্তু আমাদের এই উপমহাদেশে এখনো শিক্ষকদের মর্যাদা অনেকটা নিচেই রয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষকরা নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই বৈষম্যের কারণেই আজ শিক্ষা ব্যবস্থায়ও বৈষম্য দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে শিক্ষকরাও নানা চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। কখনো রাজনীতি, কখনো অর্থবিত্তের পেছনে ছুটতে গিয়ে তাঁদের মর্যাদা এবং নৈতিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছেন। এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরে শিক্ষকরা কোন না কোন লেজুড়বৃত্তির আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন। দলীয় সুযোগ নিতে গিয়ে শিক্ষকরা নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন।

শিক্ষকদের এই লেজুরবৃত্তি তাঁদের মর্যাদা ও সম্মানহানি করছে। উচ্চতর শিক্ষায়তনের একজন সম্মানিত শিক্ষককে রাজনীতির নেতার দ্বারে দ্বারে ঘুরতে দেখে আমরা বিব্রত হই। বিব্রত হই, যখন দেখি ওইসব নেতারা শিক্ষককে ঘন্টারপর ঘন্টা বসিয়ে রাখেন। তারপরও নেতার সঙ্গে দেখা করতে পারেন না অনেক শিক্ষকক। একবুক কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফেরেন আর নিজের অদৃষ্টকে দোষারোপ করেন। আমাদের তখন কষ্ট লাগে। এই কি আমাদের শিক্ষক? এই শিক্ষক কি আমরা চেয়েছিলাম?

কেন এমন হয়? এটা কি কেবল রাজনীতির কারণে ঘটে? আমরা মনে করি কেবল রাজনীতি নয়। শিক্ষকদের নেতা বনে যাওয়ার আকাঙ্খা এবং বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নেবার তাড়না এই অমর্যাদার জন্য দায়ি। এর বাইরে শিক্ষা বাণিজ্যিকিকরণের কারণেও শিক্ষকরা মর্যাদা হারাচ্ছেন। আমরা এটাও দেখি, রাজনীতির সুযোগ নেয় গুটিকয়েক শিক্ষক, আর কালিমা লাগে শিক্ষক সমাজের গায়ে। সেজন্য আজ ছাত্রও শিক্ষককে সম্মান ও মর্যাদা করে না। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার।

আমরা চাই, শিক্ষকদের সম্মানি এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হোক, যাতে শিক্ষকরা আর শিক্ষা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হবেন না। সরকার শিক্ষকদের বেতন এমনভাবে নির্ধারণ করুক যাতে শিক্ষকদের আর মানবেতর জীবনযাপন করতে হবে না। বেতন নিয়ে বৈষম্য দূর হোক। একই সঙ্গে শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় পাঠদানের বাইরে রাজনীতির লেজুরবৃত্তি বন্ধ হওয়া দরকার। শিক্ষকদের রাজনৈতিক শ্লোগান দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তাদের শ্লোগান হবে কেবল পাঠদান। তাহলে কোন রাজনীতির মানুষ তাদের অসম্মান করার সাহস দেখাবে না। বিশে^র সব শিক্ষক যেন পাঠদানেই তৃপ্ত থাকেন। তাঁদের জীবনের নিশ্চয়তা যেন পাঠদানের মধ্যেই থাকে সেই প্রত্যাশা করছি। আবারো বিশে^র সকল শিক্ষদের পদতলে বিনম্র শ্রদ্ধা।