মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বার ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সাইফুর রহমান মিরণ

Oct. 22, 2020, 10:57 p.m.

দুর্গোৎসব বন্ধের দাবি, সম্প্রীতির দেশে এ কোন আলামত!
দুর্গোৎসব বন্ধের দাবি, সম্প্রীতির দেশে এ কোন আলামত!
সম্পাদকীয় । - ছবি: ভোরের আলো।

গতকাল লিখেছিলাম ‘দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মের অংশ নয়’। করোনা সচেতনতায় দুর্গাপূজায় সম্মিলন ঘটুক। কিন্তু আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক) ঢাকার একটি আভিজাত্য এলাকায় ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাত তুলে বন্ধের দাবি করা হয়েছে। দাবি তুলে ২১ অক্টোবর থানায় জিডিও করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের মূল শ্লোগন ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখা। তার ভিত্তিতেই দেশ স্বাধীন হয়। গোটা দুনিয়ায় বাংলাদেশ সম্প্রীতির বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান সরকারের মূল ঘোষণা ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ আবার ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। পৃথিবী জুড়ে যখন করোনা জয়ের মন্ত্রে বিশ্ব মানবতার কথা বলা হচ্ছে, সেই সময় শারদীয় দুর্গোৎসব বন্ধে থানায় ডায়রী করার ঘটনা আমাদের হতবাক করেছে। সম্প্রীতির বাংলাদেশে এ কোন আলামত! ইসলাম ধর্মের নাম ব্যবহার করে কারা এমন সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দেওয়ার জন্য মাঠে নামছে। 

বৈশ্যিক মহামারি করোনা বাঙালির উৎসবগুলোও ম্লান করে দিয়েছে। বাংলা নববর্ষ, মুসলিম ধর্মের সর্ববৃহত উৎসব দুই ঈদ পালন হয়েছে করোনা সচেতনার মধ্যে। এরই ধারাবাহিকতায় সনাতন ধর্মের প্রধান উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা এসেছে। গতকালের লেখায় লিখেছিলাম, ‘আমরা মনে করি দুর্গাপূজা কেবল সনাতন ধর্মের অংশ নয়। গোটা জাতি এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ এই শ্লোগানে পালিত হবে এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। তবে এবার পূজায় করোনা সচেতনতায় সবার সম্মিলন ঘটবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই সবাই সনাতন ধর্মের এই উৎসব পালন করুক।’

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল নৃগোষ্ঠী বাস করছে। যার যার ধর্ম অনুযায়ী তারা উৎসব পালন করছে। রাষ্ট্র এবং সংবাধিন আমাদের সেই অধিকার দিয়েছে। সেখানে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের দোহাই দিয়ে যদি কোন ধর্মীয় উৎসব বন্ধের জন্য রাস্ট্রীয় সহযোগিতা চাওয়া হয় সেটা অশুভ চিন্তার ফসল। যারা এই কাজে নেমেছেন তারা ইসলামের দোহাই দিলেও কোনভাবেই ইসলামকে সমৃদ্ধ করছেন না। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামের দোহাই দিয়ে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা যারা করবে তাদের দৃঢ়তার সঙ্গে থামিয়ে দিতে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও সুন্দরের আরাধনা শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দুর্গাপূজা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসবই নয়, এটি আজ পুরো মানব জাতির কল্যাণে সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।’ শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী সকল নাগরিককে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই আহ্বান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ সত্যিকার সোনার বাংলায় রূপ নেবে এটা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

‘বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের নিরাপদ আবাসভূমি। দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা  ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’- এ মন্ত্রে উজ্জীবীত হয়ে আমরা সবাই এক সঙ্গে উৎসব পালন করব।’ তিনি বলেছেন, ‘সকলে মিলে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। তাই এই দেশ আমাদের সকলের। আমাদের সংবিধানে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমান অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবো।’ আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই বাণীর প্রতি বিশ্বাস এবং আস্থা রাখতে চাই।

প্রধানমন্ত্রীর এমন আহ্বানের পরই যখন শুনি ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে শারদীয় দুর্গা উৎসব বন্ধ করার জন্য একদল মানুষ জোট বাঁধছে। এটা অশনি সংকেত। যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্য ধর্মের উৎসব বন্ধ করতে চান তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রশ্নের মুখে পড়বে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই এব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সর্বত্মক সহযোগিতা দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন করবে এমন বিশ্বাস আমাদের আছে। আমরা চাই আমাদের সম্প্রীতি জেন অটুট থাকে।

যেভাবে রাজশাহীতে একই প্রাঙ্গনে পূজা মণ্ডপ এবং মসজিদ নির্মাণ হলেও কোন ধরণের ধর্মীয় অনুভূতি বিনষ্ট হয়নি। যার যার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সেখানের ধর্মপ্রাণ মানুষ মসজিদে নামাজ আদায় করছেন আবার মন্দিরে পূজা করছেন। বৃহৎ দুই ধর্মের মানুষের সেখানে কোন ধরণের সমস্যা হচ্ছে না। তারা ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ নীতিতে বিশ্বাস করে যার যার ধর্ম পালন করছেন। তাহলে ঢাকার উত্তরাতে ক্লাব মাঠে পূজার আয়োজনে কেন সমস্যা হবে? এটা ধর্মীয় সমস্যা, না কি সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর চেষ্টা। সেবিষয়টি অবশ্যই ক্ষতিয়ে দেখতে হবে। 

আমরা আবারো বলছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উচ্চারিত বাণী ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ সেটা তো অনেকাংশে সবার হয়ে উঠতে পারছে না। এজন্য সরকারি দলের দায়িত্ব বেশি। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ইতিবাচক ভূমিকা দেখতে চাই। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এবং ‘ধর্ম যার যার, রাস্ট্র সবার’ এই বাণী যেন কেবল কথার কথা না হয়।

আসুন শারদীয় দুর্গাপূজা আমাদের যেন সেই মন্ত্রে উজ্জীবীত করে। আমরা সবাই মিলে যেন বিশ্ব ধর্ম, বিশ্ব মানবতার জয়গান গাইতে পারি। তাহলেই বাস্তব রূপ নেবে সম্প্রীতি। তাহলেই ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ কিংবা ‘ ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। ‘অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও সুন্দর প্রতিষ্ঠা হোক শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ধর্মীয় বিচারের আগে যেন আমরা বিশ্ব মানবতার জয়গান গাইতে পারি সেই প্রত্যাশা করছি।